বৃহস্পতিবার ০৩ এপ্রিল ২০২৫
সম্পূর্ণ খবর

Uddalak | ০৬ মার্চ ২০২৫ ১৪ : ২০Riya Patra
উদ্দালক
আজ থেকে ভারত-বাংলাদেশের নদীর জলবণ্টন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা সারছেন বাংলাদেশের জয়েন্ট রিভার কমিশনের ১১ প্রতিনিধি। গত সোম ও মঙ্গলবার এই নিয়ে ফরাক্কা ব্যারাজ প্রজেক্ট অথরিটির সঙ্গে তাঁরা প্রথমে গিয়েছিলেন। সেখানেও বিস্তারিত আলোচনা হয়। উল্লেখ্য, ১৯৭২ সালে জয়েন্ট রিভার অথরিটি তৈরি হয়েছিল। ভারত বাংলাদেশের মধ্যে দিয়ে ৫৪টি নদী বয়ে চলেছে। নদীমাতৃক দুই দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকশক্তি এইগুলি। দেশের কৃষি ব্যবস্থা থেকে শুরু করে জল পরিবহণ, মৎস্য বাণিজ্য নির্ভর করে এই নদীগুলির উপর। তবে নদী নিয়ে বিতর্কেরও শেষ নেই।
তিস্তার জলবণ্টন নিয়ে বারংবার আলোচনা হয়েছে শীর্ষ প্রশাসনিক স্তরে। কখনও-কখনও নরম গরম কথা চালাচালিও হয়েছে। কিন্তু তখনও বাংলাদেশের পরিস্থিতি একেবারে অন্যরকম ছিল। তারপর গঙ্গা-পদ্মা দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে। শেখ হাসিনার বিতাড়ন বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি একেবারে পাল্টে দিয়েছে। সে দেশে সরকার গড়েছে প্রতিবাদীরা। সরকারে শীর্ষপদে বসেছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মহম্মদ ইউনূস। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদল হওয়ার পরে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আরও অবনতি হয়েছে। শেখ হাসিনা পরবর্তী সরকারের সমর্থকরা প্রকাশ্যে, গোপনে, গোচরে-অগোচরে ভারতকে কুৎসিততম আক্রমণ করতে ছাড়েননি। কিন্তু, বাংলাদেশের অগত্যা মধুসূদন, ভারত। তাই, শেষ পর্যন্ত এই দেশে আসা।
সংবাদমাধ্যমের সামনে এই আলোচনার শেষে ফরাক্কা ব্যারাজ কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে জেনারেল ম্যানেজার আর ডি দেশপাণ্ডে জানিয়েছেন, ''বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল ফরাক্কা ব্যারাজে এসেছেন। গঙ্গার প্রবাহপথ ও জলবণ্টন নিয়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।'' উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালে গঙ্গার জলবণ্টন নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, সেখানে গঙ্গার জলবণ্টন নিয়ে স্পষ্ট নির্দেশিকা ছিল। কিন্তু সেই চুক্তির মেয়াদ ছিল ৩০ বছর। আগামী বছর সেই চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। তার আগেই এই আলোচনা আসলে চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধির ভিত তৈরি, এমন মনে করছেন অনেকেই।
বিদেশনীতি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শেখ হাসিনা পরবর্তী বাংলাদেশ প্রশাসন সে দেশের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নীতি পরিবর্তন করার চেষ্টা করছে। ইউনূস সরকারের সময়ে ভারত বাংলাদেশ জলবণ্টন-সহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে বেশি করে। সম্প্রতি তিস্তা জলবণ্টন প্রক্রিয়া নিয়েও ভারতের উপর চাপ বৃদ্ধি করতে উঠে পড়ে লেগেছে ইউনূস সরকার। একটি গণশুনানিতে সে দেশের সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ভারত কথা না শুনলে চিনের সাহায্যে তিস্তা নদীর উপর একটি বাঁধ ও জলাধার তৈরির প্রকল্প শুরু করবে। পাশাপাশি, ঘাড়ের উপর গঙ্গা জলবণ্টন চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়টিও রয়েছে। সব মিলিয়ে কৃষি ও মৎস্যচাষ প্রধান বাংলাদেশের নতুন প্রশাসন চাইছে না শাসনকালের শুরুর দিকে বৈদেশিক নীতি নিয়ে কোনও সমস্যায় না পড়তে। পাশাপাশি, চাইছে না এমন কোনও অবস্থা, যেখানে দেশের মানুষ ভাবতে শুরু করে নতুন সরকার দুর্বল। বিশেষত ভারতের সামনে তো নয়ই। যেখানে সে দেশের মানুষ ভারতকে গালি দিতে পারলেই নিজেকে সার্থক মনে করে।
কিন্তু আন্দোলন আর প্রশাসন সমার্থক নয়। বিদেশনীতির সঙ্গে জনপ্রিয়তার সম্পর্ক নেই। 'পপুলার পলিটিক্স'-এর দিকে তাকিয়ে বিদেশনীতি ঠিক করলে, এতদিনে পাকিস্তান ভারতের যুদ্ধে লাখো-লাখো প্রাণহানী হওয়ার কথা। আমেরিকার উচিত ম্যাক্সিকোকে ধ্বংস করে দেওয়া। এশিয়া-মাইনরের দেশগুলিতে ইসলাম মৌলবাদকে সামনে রেখে পৃথিবীশুদ্ধ সমস্ত দেশের উচিত তেড়ে বোমবর্ষণ করা। কিন্তু আবেগ আর বিদেশনীতি এক নয়। ফলে সেদেশের ফেসবুক ট্রোলারদের আর সাধারণ, গণ-চেতনার অজ্ঞানতাকে সামনে রেখে যদি ভারতের দিকে চোখ রাঙানোর চেষ্টা করে বাংলাদেশ, তাতে অন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে বই কমবে না।
বিভিন্ন সূত্রের খবর, আজ, অর্থাৎ বৃহস্পতিবারের বৈঠকে বেশ কয়েকটি প্রস্তাব দেওয়া হতে পারে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের তরফ থেকে। বাংলাদেশের তরফ থেকে মোট ১৪টি নদীর জলবণ্টনের প্রস্তাব দেওয়া হতে পারে। সেই তালিকায় থাকতে পারে, ধরলা দুধকুমার, গুমতি, খোয়াই, মানু ও মহুরি। এছাড়াও বাকিগুলি নিয়ে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কাজ চলছে। এ ছাড়াও, দুই দেশের যৌথ বন্যা পূর্বাভাস মডেল তৈরির করার প্রস্তাবও দেওয়া হবে। এ ছাড়াও, বন্যার কারণে নষ্ট হয়ে যাওয়া মোট ৭৫টি ছোট-বড় বাঁধ, জলাধার সংস্কার করার প্রস্তাবও দেওয়া হতে পারে। মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের কুশিয়ারা নদী গরমকালের অন্যতম জলের উৎস। এই বিষয় নিয়েও আলোচনা হতে পারে, যাতে গ্রীস্মকালে ১৫৩ কিউসেক করে জল দুই দেশই নিজেদের কাজে ব্যবহার করতে পারে।
যে কূটনৈতিক সুস্থ সম্পর্কের আবেদন বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা করবেন, তা যে কোনও প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে থাকা উচিত। কিন্তু কোনও শত্রুতা না করেও বাংলাদেশের থেকে যে ব্যবহার ভারত পেয়েছে, তারপর? হাসিনা পরবর্তী বাংলাদেশের চরম অরাজকতার খবর এদেশের সংবাদ মাধ্যম দেখানোয় দিনের পর দিন তীব্র হুমকি, কটুক্তি ভেসে এসেছে, কুকথা বলা হয়েছে সকলকেই। সেই পরিস্থিতিতে সুস্থ সম্পর্কের আশা করা কি উচিত? ইতিহাসে দেখা গিয়েছে, ভারত চিরকাল গ্রহণ ও আতিথেয়তার দেশ। ফলে ভারতের উপর চূড়ান্ত নির্ভরশীল বাংলাদেশকে ভারত ফেরাবে না। এখন দেখার, এই দু'দিনের বৈঠকের নির্যাস কোন দিকে ইঙ্গিত করে।