শুক্রবার ০৪ এপ্রিল ২০২৫
সম্পূর্ণ খবর
UB | ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৫ ১৪ : ৩২Uddalak Bhattacharya
সুরজিৎ সি মুখার্জি
আমরা ভারতীয়রা (যারা বিশেষজ্ঞ নই) ইউরোপকে সমগ্রভাবে জানি না। আমরা এই মহাদেশকে আমাদের ঔপনিবেশিক সম্পর্কের মাধ্যমে, মূলত ইংল্যান্ডের মাধ্যমে চিনি। অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান, অটোমান বা স্পেনে চার শতাধিক বছর ধরে চলা মরক্কোর আধিপত্য সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান সীমিত, স্ক্যান্ডিনেভিয়া বা বলকান অঞ্চল সম্পর্কে তো প্রায় কিছুই জানি না।
আমাদের ঔপনিবেশিক এবং বৃহদার্থে উত্তর-ঔপনিবেশিক জীবন মূলত ব্রিটিশ শাসনের দ্বারাই প্রভাবিত এবং রাঙা – আমাদের আইন, অনেক খেলাধুলা, সংসদীয় রাজনীতির ধারণা ও চর্চা, সাহিত্য এবং আধুনিক বিজ্ঞান, সবটাই ইংরেজ প্রভাবিত। ব্রিটেন তার সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্বের দাবি দিয়ে প্রথম দিকের জাতীয়তাবাদীদের মোহিত করেছিল এবং এই রাজনৈতিক সংগঠন ও চিন্তার মাধ্যমে আমরা ইউরোপের সঙ্গে পরিচিত হই। যখন ব্রিটেন তার গৌরব, সামরিক আড়ম্বর ও শক্তি নিয়ে আমাদের ওপর কার্যত চেপে বসে, সেই সমসাময়িক কালেই এটি ফরাসি, ডাচ, পর্তুগিজ ও স্পেনীয়দের মতো অন্যান্য ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির সঙ্গে মিলে বিশ্বকে দু'টি স্বতন্ত্র বোধগত ক্ষেত্রে বিভক্ত করেছিল – একদিকে ছিল সভ্যদের বিশ্ব এবং অন্যদিকে অসভ্যদের বিশ্ব।
এই আদর্শগত ভিত্তি আমাদের আলোচনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু আমরা একসময় বৈদেশিক শাসনাধীন ছিলাম; এটি বোঝা জরুরি যে আমরা ইউরোপকে কীভাবে গ্রহণ করছি, একদিকে অ্যাকাডেমিকভাবে এবং অন্যদিকে দৈনন্দিন জীবনেও। ইউরোপের সঙ্গে এই মোলাকাতের জটিলতা আজও সমগ্র ঔপনিবেশিক বিশ্বে একটি বৃহত্তর আলোচনার প্রসঙ্গ। আমাদের কি দৈনন্দিন চর্চার মাধ্যমে আমাদের বোধগত কাঠামো, চিন্তার গঠিত পদ্ধতি, সংস্কার ও মৌলিক পরিবর্তনের পাঠ, পশ্চাদগামী ও প্রগতিশীলতার মধ্যেকার বিভাজন—এসব থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভব, যাতে যুক্তি ও আধুনিকতার সুফল না হারিয়ে ফেলি? অন্যভাবে বললে, আমরা আমাদের ঔপনিবেশিক অতীতের মুখোমুখি কী ভাবে হব?
কোয়ামে এনক্রুমাহ, কিংবদন্তি ঘানার নেতা ও প্যান-আফ্রিকানবাদী, তাঁর অফিসের দেওয়ালে আফ্রিকার একটি বিশাল চিত্র আঁকিয়েছিলেন। এতে তিনজন শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তিকে আফ্রিকা থেকে পালিয়ে যেতে দেখা যায় – একজন মিশনারি, একজন ঔপনিবেশিক প্রশাসক এবং একজন পুঁজিপতি, ঘানার স্বাধীনতার পরিপ্রেক্ষিতে। তিনি এই চিত্রের নাম দিয়েছিলেন ‘আফ্রিকার ধর্ষণ’। কিন্তু আমরা সকলেই জানি, এই অনুভূতি কেবলই একটি অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা হয়ে রয়ে গিয়েছে।
তবে এনক্রুমাহর জন্য যে অপূর্ণ রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ছিল, তা আমাদের জন্যও প্রতিধ্বনিত হয়। আমরা ইউরোপকে শুধু সভ্যতা ও আধুনিকতার প্রতীক হিসেবে দেখাতে শুরু করলাম না, বরং এটিকে বিশ্বের রাজনৈতিক ও নৈতিক বিশৃঙ্খলার বহু সমস্যার জন্মদাতা হিসেবেও দেখতে শুরু করলাম। ভারতের জন্য, কিংবা যে কোনও দেশের জন্যই, উপনিবেশমুক্তি (ডিকলোনাইজেশন) মানে এক আদিম বিশুদ্ধ (প্রিস্টাইন) শৃঙ্খলার পুনরুদ্ধার হতে পারে না, কারণ সেটি একেবারেই অসম্ভব। সম্পূর্ণরূপে উপনিবেশমুক্ত এক আদিম সভ্যতার শৃঙ্খলা কেবল আমাদের কল্পনায়ই থাকতে পারে, বা আরও সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, নির্দিষ্ট কিছু কল্পনার জগতে, যা অন্য কল্পনার তুলনায় বেশি গুরুত্ব পায়। কার কল্পনা শেষ পর্যন্ত জয়ী হবে, সেটিই এক বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন। তবে আপাতত সেই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি আমরা স্থগিত রাখছি।
আমার কাছে ইউরোপ এক জটিল বাস্তবতা—এটি মুক্তির ও স্বৈরাচারী প্রবৃত্তির এক সমাহার, এটি বর্ণবাদ ও আধিপত্যের কেন্দ্র, আবার একই সঙ্গে জীবন ও সমাজের নানা ক্ষেত্রে বৃহৎ পরীক্ষাগারেরও ভূমিকা পালন করেছে—ধর্ম থেকে রাজনীতি, ফরাসি ও রুশ বিপ্লবের থেকে থেকে ফ্যাসিবাদ ও নাৎসিবাদের আবির্ভাবের বিচিত্র ঐতিহাসিক যাত্রাপথের মতো। আর এই যুগান্তকারী ঘটনাগুলো কেবল ইউরোপের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তাদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও দার্শনিক প্রভাব সারা বিশ্বে অনুভূত হয়েছিল। এই অদ্ভুত মিশ্রণের মাধ্যমে ইউরোপ, একদিকে ঔপনিবেশিক আধিপত্য ও শোষণের দ্বারা, আর অন্যদিকে বিপ্লব ও পরিবর্তনের বার্তা ছড়িয়ে দিয়ে, আঠারো শতকের মাঝামাঝি থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছিল।
আঠারো শতক ইউরোপের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ ছিল। এই শতাব্দীতে যে গতিময়তা সৃষ্টি হয়েছিল, কালের দিগন্তে যেন উঁকি দিচ্ছিল শিল্পবিপ্লবের লাল আভা, যদিও তখনও তা সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়নি। শতকের প্রথম ও মাঝামাঝি সময়ে ইউরোপের নেতৃত্বে ছিল ইংল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডস। ১৭৬০ সালের মধ্যে ইংল্যান্ডের কিছু অংশ, ফ্রান্সের নির্দিষ্ট অঞ্চল এবং মধ্য ইউরোপের জার্মান-ভাষী এলাকাগুলো শিল্পায়নের স্পর্শ পেয়েছিল। তবু তখনও অধিকাংশ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল ছিল এবং সামন্ততন্ত্র তাদের ভূমির ওপর শক্তিশালী দখল বজায় রেখেছিল। আমরা এটিকে এক অর্থনৈতিক রূপান্তরের যুগ বলতে পারি, যা রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের পরিচিত গণতন্ত্রের বিকাশও শুরু হয়েছিল।
এই রূপান্তরের যুগ এবং ব্যাপক পরিবর্তনের ফলে এক শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, যা অসাধারণ কিছু গুরুত্বপূর্ণ রচনার জন্ম দিয়েছিল। কার্ল মার্কস, যিনি ইংল্যান্ডে বসবাস করছিলেন এবং এসব পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করছিলেন, এই রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটেই তাঁর অমর রচনাগুলো লিখেছিলেন। ইউরোপের পরিবর্তনশীল সমাজ, রাজনীতি ও অর্থনীতি বোঝার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হলো সাহিত্য। ইংরেজি সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক চার্লস ডিকেন্স তাঁর কাহিনির মাধ্যমে ভিক্টোরীয় ইংল্যান্ডের নিপীড়িত শ্রেণির জীবন বাস্তবভাবে তুলে ধরেছিলেন।
যদি আমরা মার্কস ও ডিকেন্সকে পাশাপাশি পড়ি, তাহলে ইউরোপ, বিশেষত ইংল্যান্ড, কীভাবে বাণিজ্যিক পুঁজিবাদ (মার্কেন্টাইলিজম) থেকে শিল্পোৎপাদনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তা পূর্ণাঙ্গভাবে বুঝতে পারব। এই ইতিহাস আমাদের দু'টি বিশ্লেষণমূলক ও কার্যকর ধারণা দিয়েছে, যার মাধ্যমে আমরা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের গতিশীলতা বুঝতে পারি—বুর্জোয়াদের উত্থান এবং সর্বহারার আবির্ভাব। পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থায় আমরা দেখব, এই দুই শ্রেণির সংঘাত ও পারস্পরিক সম্পৃক্ততা, যেখানে সামন্তপ্রভু ও সমান্তপ্রভুর দখলে থাকা কৃষি-দাস অতীতের গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।
(সিস্টার নিবেদিতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ সোশ্যাল সায়েন্সের ডিন, উল্লিখিত মতামত ব্যক্তিগত।)