বৃহস্পতিবার ২৫ জুলাই ২০২৪

সম্পূর্ণ খবর

গণপিটুনি

AM | ০২ জুলাই ২০২৪ ১৭ : ২৯


শ্যামলী ভট্টাচার্য

গত কয়েকদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গে খবরের শিরোনামে উঠে আসছে,' গণপিটুনি'। গোটা রাজ্যজুড়েই যেন সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ছে এই বিষয়টি ।আজ কলকাতায় হচ্ছে তো কাল কোনো জেলায় ,কোনো প্রত্যন্ত অঞ্চলে-- সর্বত্রই দেখা যাচ্ছে যেন মহামারীর মতই গণপিটুনির ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ছে । আক্রান্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ ।সব থেকে যেটা আশ্চর্য এবং যন্ত্রণাদায়ক বিষয় এই গণপিটুনিকে ঘিরে ঘুরছে সেটি হল; এই ধরনের ঘটনা ঘটবার সময় যে ডিড় তৈরি হয়, সেই ভিড়ের মধ্যে থেকেই মানুষজনেরা, ঘটনাগুলিকে ভিডিও করছে এবং সমাজ মাধ্যমে সেগুলি প্রচার করছে
       কেমন যেন আমরা গোটা উত্তর ভারত জুড়ে যে আনাচে-কানাচে বিভিন্ন সময় মব লিঞ্চিং কথা সংবাদমাধ্যমে পড়ি বা তার ভিডিও দেখি সমাজমাধ্যমে, সেই সব স্মৃতি গুলো যেন আমাদের মধ্যে , রাজ্যের গণপিটুনি ঘিরে একটা আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করছে ।গণপিটুনি- এই রাজ্যেই হোক, অন্য রাজ্যেই হোক বা ভিন্ন দেশেই হোক, কখনো যে আগে ঘটেনি তা নয় ।কিন্তু এভাবে গণপিটুনির ছবি বা ভিডিও সাধারণ মানুষ তুলছেন ,আক্রান্ত মানুষটির প্রতি সেই সাধারণ মানুষের কোনো সহানুভূতি নেই, একটা অদ্ভুত নারকীয় আনন্দের মধ্যে দিয়ে তারা, একটি মানুষ, সে অপরাধী কি অপরাধী নয়, সেটা আদালত কর্তক বিচার্য হওয়ার আগেই, তাকে নৃশংসভাবে খুন করা হচ্ছে, মারধর করা হচ্ছে --এই দৃশ্য গুলি ভিডিওতে ধারণ করছে ।
      এই ব্যাপারটা ভাবতেই যেন কেমন আমাদের শিউরে উঠতে হয়। অন্য রাজ্যগুলির সাধারণ নাগরিকদের মন মানসিকতা আর আমাদের বাঙালির কঠিনে কমলে গড়া অন্তর --এই দুইয়ের মধ্যে আমরা যথেষ্ট ফারাক করে থাকি। বাঙালি যেমন নিজের আত্মসচেতনতা ঘিরে সংযমী এবং দৃঢ়, ঠিক তেমনি ই বাঙালি কিন্তু নারী-পুরুষ- বর্ণ- ধর্ম- জাতি নির্বিশেষে হৃদয়ে একটি কোমল মানসিকতা লালন করে। সেই কোমল মানসিকতা দিয়ে সে প্রতিবেশীর প্রতি একটা ভালবাসার হাত চিরদিন বাড়িয়ে দিয়েছে। ওই হাত কি এখন কোনো কারনে সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে ? 
      এই যে গণপিটুনি দেখা ,কোনরকম প্রতিবাদ না করা ,কখনো দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে, যারা পিটুনি দিচ্ছে ,তাদের উদ্দেশ্যে একটা ও কথা না বলা,  আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না, পুলিশের হাতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, যাকে ঘিরে আপনাদের অভিযোগ, তাকে তুলে দিন। পুলিশ বুঝে নেবে সে সত্যিকারের অপরাধী কি অপরাধী নয় । সেই অনুযায়ী পুলিশ আইন আদালতের মধ্যে দিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিটির বিচার করবে -এ কথা কেউ একক ভাবে বা সম্মিলিতভাবে ওই গণপিটুনিদারদের সামনে বলতে পারছে না।
       বাঙালি কি এতটাই আত্ম সংকুচিত হয়ে গেল? এতটাই মেরুদণ্ডহীন হয়ে গেল? সত্যের সামনে দাঁড়াতে সে ভয় পাচ্ছে? বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, খানিকটা মানসিক অসুস্থ লোকেদের উপর নানা ধরনের সামাজিক অপরাধ, চুরি-- ছিনতাই ইত্যাদির অপবাদ এনে ,তাদেরকে হেনস্ত করা একটা সামাজিক ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে মানব সমাজের কাছে। এটা যে কেবলমাত্র বাঙালি সমাজে ঘটছে বা ভারতীয় সমাজে ঘটছে এমনটা মনে করবার কোনো কারণ নেই। আন্তর্জাতিক যদি আমরা দেখি সেখানেও আমরা দেখতে পাবো, এভাবে চোর ইত্যাদি অপবাদে একটু মানসিক অসুস্থ বা সামাজিকভাবে কমজোরি মানুষদের উপরে অত্যাচার করা হয় ।
       প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশের বিভিন্ন ঘটনার কথা আমরা হামেশাই তাদের বিভিন্ন গণমাধ্যমের মধ্যে দিয়ে জানতে পারি। ধর্মের নামে, রাজনীতির নামে ,ব্যক্তিগত শত্রুতার নামে এই ধরনের অভিযোগ তৈরি করে, মানুষের উপরে অত্যাচার-- এটা কোন নতুন ঘটনা নয় ।
অতুল্য ঘোষের' কষ্টকল্পিত নবপর্যায় ', এই গ্রন্থ আমরা দেখেছি ,আমাদের জাতীয় আন্দোলনের কালেও কিভাবে খাপ পঞ্চায়েত বসিয়ে ,অপছন্দের লোককে অপদস্ত করা হতো ।এমন বিবরণ দিয়েছেন অতুল্য ঘোষ যেখানে দেখা যাচ্ছে ,খাপ পঞ্চায়েতে যাকে অপরাধী সাব্যস্ত করা হলো, তার মৃত্যুদণ্ড সাজা দেওয়া হল। কিন্তু সেই সাজাটা দিতে পারা যাচ্ছে না। সেজন্য হয়তো লোকটির টিকি কেটে নেয়া হলো। কিংবা তাকে ন্যাড়া করে দেওয়া হল ।
      এই ধরনের ঘটনা বাংলার বুকে স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় বহু ঘটেছে ।কিন্তু সমস্ত কিছুকে ছাপিয়ে যাচ্ছে আজকের দিনের এই গণধোলাইয়ের ঘটনা । একজন মানুষের বিরুদ্ধে যদি একদল মানুষের কোনো অভিযোগ থাকে, তাহলে সেখানে কেন আইন কে নিজের হাতে তুলে নেওয়া হবে ?কেন পুলিশ প্রশাসনের হাতে সন্দেহ ভাজন ব্যক্তি কে তুলে দেয়া হবে না ?আর আইন যখন মানুষ নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে ,তখন কিছু সহ নাগরিক তা থেকে মজা লুটবার উদ্দেশ্যে বা নাম কেনবার উদ্দেশ্য সেগুলি ভিডিও করছে নিজেদের মোবাইল দিয়ে --- এটাও কম নারকীয়তা নয়। 
      একজন মানুষ উপভোগ করছে আর একজন মানুষের উপর মানুষের ই এই দানবীয় অত্যাচারকে। এই বিকৃত মানসিকতা আমাদের বাংলার বুকে এভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠছে, এটা ভাবতে আমাদের আঁতকে উঠতে হয়।
চোখের সামনে একটা খুন হচ্ছে মানুষ। আর একদল মানুষ সেটা উপভোগ শুধু করছে না। তার ভিডিও তুলছে। সেই ভিডিও সমাজ মাধ্যমে দিয়ে একটা বিকৃত সমাজ মনস্কতার পরিচয় রাখছে। 
     এখানে সেই একদম স্কুল জীবনে পড়া বাংলা রচনা,' বিজ্ঞান অভিশাপ, না আশীর্বাদ' এই কথাটাই যেন আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় ।সেই যে সমবেত জনতা, যারা দেখছিল ,রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে নানা ধরনের অভিযোগে মানুষের দ্বারা মানুষকে পিটিয়ে মারা, তার পিছনে রাজনীতি থাক, ব্যক্তিগত হিংসা ,দ্বেষ যাই থাক না কেন ,ওই দর্শকদের মধ্যে কি একজন মানুষও ছিলেন না, যিনি সঙ্গে সঙ্গে ১০০ ডায়াল করে পুলিশকে একটা খবর দিতে পারতেন না? 
       আমরা তো এই সমাজ মাধ্যমেই নানা ধরনের সমাজ মনস্কতার ভিডিও দেখি সেখানে বিপদে পড়লে মানুষ কিভাবে বিপদগ্রস্তকে বাঁচানোর উদ্দেশ্যে পুলিশ প্রশাসনের সাহায্য নেয় ,নামিদামি অভিনেতাদের অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে তা আমরা দেখি। সেই দেখাটা কি দেখাতেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে? সব দোষ পুলিশের উপর চাপিয়ে, প্রশাসনের উপরে চাপিয়ে, এক ধরনের আত্মতৃপ্তি পাওয়ার মানসিকতা অধিকাংশ লোকজনের ভেতরেই দেখতে পাওয়া যায়।
      পুলিশ কেন এলো না ?পুলিশ কেন কিছু করল না ?-- এমন সন্দর্ভে খবরের কাগজের পাতা ভর্তি হয়ে যাবে ।কিন্তু প্রশ্ন হল; নাগরিক সমাজের কোনো দায় নেই? নাগরিক সমাজ কেন আটকালো না ওই ধরনের মব লিঞ্চিং কে ?কেন বলল না, অভিযুক্তকে অবিলম্বে তুলে দেওয়া হোক পুলিশের হাতে ।পুলিশ বিচার করুক অভিযোগের দিকগুলি। তারপর পুলিশ নিরপেক্ষ ভাবে বিবেচনা করে অপরাধের গুরুত্ব অনুসারে অভিযুক্তকে  চালান করুক আদালতে ।
       নাগরিক সমাজ কি এতখানি বিবেকবর্জিত হয়ে গেল ? একজন সহনগরিক, হলই বা সে ,শহুরে ক্রেতা দূরত্ব নয় ।হয়তো বা সে মানসিকভাবে খুব সুস্থ নয়, তবু তার প্রতি কি এতোটুকু ভালোবাসা , আর একজন নাগরিকের থাকতে পারে না? দায় কি সবটাই কেবলমাত্র প্রশাসনের ?দায়িত্ব সবটাই কেবলমাত্র পুলিশের? নাগরিকের দায় নেই?সাধারণ মানুষের দেয় নাই ?আমার, আপনার দায় নেই? এই সমস্ত বিষয়গুলো কি আমরা একটি বারের জন্য ভাববো না? একটাবারের জন্য আমাদের মধ্যে কি যে অসহায় মানুষগুলি আজ বেঘোরে প্রাণ হারাল , তাদের জন্য এতোটুকু ভালোবাসা থাকবে না? আমরা কি একটিবারের জন্য প্রতিজ্ঞা করবো না যে ,আর একজন ও মানুষকে ,এভাবে মানুষের হাতে আমরা খুন হতে দেব না?




বিশেষ খবর

নানান খবর

Advertise with us

সোশ্যাল মিডিয়া