যেথা ক্ষুদ্র আচারের মরু বালুরাশি
বিচারের স্রোতঃপথ ফেলে নাই গ্রাসি--
সমাজমাধ্যম-- ইংরেজি ' ফেসবুকে' র এই বাংলা প্রতিশব্দটা এখন খবরের কাগজের দৌলতে বেশ জলচল হয়ে গেছে। সেই ফেসবুককে এখন প্রায় সব প্রজন্মের মানুষ ই নিজের একাকীত্ব কাটাবার একটা উপকরণ হিশেবে বুঝে নিতে শুরু করেছে।
একটা সময় ছিল ,যখন মানুষের কাছে সময় ও অঢেল ছিল। আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়েছিল বিনোদনের উপকরণ। সেসব দিনে বিনোদনের উপকরণের মধ্যে একটা মেধার চর্চা-- এই বিষয়টা সমুচিত গুরুত্ব ছিল।
মেধাহীন বিনোদন --এই ব্যাপারটা আজ থেকে তিরিশ - চল্লিশ বছর আগেও কেবলমাত্র বাঙালি সমাজ বা ভারতীয় সমাজ কেন , গোটা বিশ্বের মানব সমাজের কাছে অদেখা, অচেনা ছিল ।বাংলার এঁদো গ্রামেও যে মেয়েলি আড্ডা বসত , পুকুর ঘাটে-- সকালের বাসন মাজা ,কাপড় কাঁচা বা দুপুরের স্নানের আনুষঙ্গিক হিসেবে , সেখানেও কিন্তু নানা ধরনের রসিকতার মাঝে এমন এমন কিছু বিষয় আলোচিত হতো, যেখান থেকে বাড়ির মেয়েরা কিছু না কিছু ভাবে আলোকিত হতেন। তা সেই আলোকিত হওয়ার ধারাটা রান্নাবান্নার নতুন কোন উপকরণ ই হোক, কিংবা কিভাবে সাশ্রয়কারী ভূমিকা নিলে, সংসারের দুটো পয়সা বাজে খরচ বন্ধ হয় তা নিয়ে কিছু ভাবনা চিন্তাই হোক ,আর কথায় কথায় ডাক্তার - বদ্দির কাছে যেতে না পারা, গরিব গুর্বো মানুষ, কোনো না কোনো প্রয়োজনে, বাড়ির মানুষদের অসুখ-বিসুখ করলে, কিভাবে একটুখানি উপকার পেতে পারে, তার টিপস সেখানেই পেয়ে যেত।
সেই বিনোদনের মধ্যে এই ধরনের বিষয়গুলি, অর্থাৎ ; শিক্ষামূলক বিষয়গুলি ছিল একটা গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। আজকে আমজনতার ' চন্ডীমন্ডপ' , ফেসবুকে এমনধারা চর্চা হয় না বললে বাজে কথা বলা হবে।কিন্তু এই ধরণের চর্চার থেকে ধর্ম কে , মানুষের ধর্মের প্রতি বিশ্বাস কে, একটা অদ্ভূত উপকরণ হিশেবে পরিচালিত করবার দিকেই দেখতে পাওয়া যায় সবথেকে বেশি ঝোঁক।
আর সেই ঝোঁক থেকেই তৈরি হয় এমন কিছু প্রবণতা ,যে প্রবণতা মানুষকে ,ইতিবাচক কোনো ধারণার দিকে পরিচালিত করতে পারে না ।
ধর্ম ঘিরে মানুষের বিশ্বাস, সেটা তার ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু একটা সময় ইউরোপ হোক ভারত হোক বা অন্য যেকোনো জায়গায়ই হোক, ধর্মকে যখন শাসনের একটা অঙ্গ হিসেবে ব্যবহার করা হতো ,তখন ধর্মকে ব্যবহার করে, মানুষকে ভয় দেখিয়ে ,এক ধরনের পরিবেশ তৈরি করা হতো ।যে পরিবেশ শাসক কে শাসকের সহায়ক শক্তি এবং ধর্মগুরুকে নানা ধরনের সুবিধে এনে দিত ।
আজ দুর্ভাগ্যজনকভাবে হলেও এই সত্যটা উচ্চারণ করতে হয় যে ,সমাজমাধ্যম ,অর্থাৎ; ফেসবুকের মাধ্যমে ধর্মের রাজনৈতিক এবং সামাজিক ব্যবহার এমন একটা জায়গায় এসে পৌঁছে গেছে যে ,ধর্মকে কেন্দ্র করে মানুষকে ভয় দেখানো একটা নতুন মাত্রা পেয়েছে। সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে প্রথাগত শিক্ষার সুযোগ যে মানুষদের খুব একটা জোটেনি, সেই মানুষরা যাতে ধর্মের বিকৃত ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে কোন মো ধর্মগুরু বা কোনো দেব-দেবতার প্রতি এতটাই ভীত হয়ে ওঠে ,যাতে তার শেষ সম্বল টুকুও ওই দেবদেবতা বা ধর্মগুরুর উদ্দেশ্যে খরচ করবার বাসনা তার মধ্যে জেগে ওঠে, সেদিকেই খুব উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে আজ সমাজ মাধ্যমকে ব্যবহার করা হচ্ছে।
সমাজমাধ্যমের প্রচলনের মধ্যে দিয়ে আধুনিকতা, বিজ্ঞানমনস্কতা ,সমাজসংস্কার মূলক ধারণা, নানা ধরনের প্রগতিশীল চিন্তাধারা প্রসার লাভ ঘটে। সেই ধারা গুলিকে একপাশে সরিয়ে রেখে একটা ভয়ংকর ভাবে ধর্মকে কেন্দ্র করে মানুষকে ভয় দেখিয়ে, মানুষের অসহায়তাকে ব্যবহার ,করে সমাজ মাধ্যমে চলেছে এক অদ্ভুত জঘন্য কর্মকাণ্ড ।
ফেসবুক খুললেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে ,এমন কিছু চেনা অচেনা দেব-দেবতার ছবি সম্বলিত পোস্টার যেখানে সংশ্লিষ্ট দেব-দেবতার ছবিগুলিকে যতটা সম্ভব আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে ভয়ার্ত করে তোলা হচ্ছে ।সাধারণ মানুষ যাতে সেই দেবতার উষ্মা ইত্যাদি সম্পর্কে খুব ভয়ান্নিত হতে পারে ,সেজন্য আধুনিক প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে, শান্ত স্নিগ্ধ দেবতার ছবিগুলিকে গড়ে তোলা হচ্ছে বীভৎস। সাধারণ মানুষের মধ্যে আর্থ- সামাজিক- পারিবারিক নানা বিষয়কে ঘিরে যে ধরনের সুখ, দুঃখ ,হাসি, কান্না আছে ,সেগুলিকে ব্যবহার করে ,ওইসব ভীষণ দর্শন দেবদেবতার ছবিকে সামনে রেখে ,মানুষকে বলা হচ্ছে ; অমুক দেবতার ছবি শেয়ার না করলে তমুক বিপদ ঘটবে। অমুক দেবতার পুজো না দিলে তমুক বিপদ ঘটবে।
এমনভাবে এই ধরনের প্রচারগুলো চলছে যাতে সাধারণ মানুষের একটা অংশের মনে হয়, বোধহয় দেবতার আদেশেই এই ধরনের পোস্টার নির্মিত হয়েছে । তেমন আদেশবলেই আর কোন না কোন ভক্ত এই ধরনের পোস্ট তৈরি করেছে। আর দেবতাদের আদেশেই তারা এইসব পোস্টার গুলি সমাজ মাধ্যমে আনছে।দেবতাই যেন তাদেরকে দিয়ে অসহায় মানুষদের উদ্ধার করবার উদ্দেশ্যে এইসব পোস্টার গুলিকে সাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছে।
সাতের দশকে যখন দেবী সন্তোষীকে ঘিরে একটা উচ্ছাস তৈরি হল একটি ফিল্ম তৈরি হবার পর, তখন ছিল পোস্টকার্ডের যুগ। প্রায় বহু বাড়িতে চিঠি আসতে লাগলো দেবীর সন্তোষীর মহিমা সম্বলিত বিষয়গুলি নিয়ে।বলা হলো , এতজন মানুষকে এই চিঠি লেখো, প্রচার করো। দেবীর প্রচার করলে ভালো।আর তোমারা যদি সেটা না করো তাহলে তোমাদের এই এই খারাপ হবে।
এই বিষয়টি সাতের দশকের মধ্যবর্তী সময়ে বাংলার আনাচে-কানাচে বিশেষ রকমের ছড়িয়ে পড়েছিল ।বহু মানুষ যারা ওই দেবীর ভক্ত হয়ে উঠেছিলেন, তাদের মধ্যেও দেবীর অসন্তোষের ভয় ঘিরে নানা ধরনের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে শুরু করেছিল ।যারা দেবীর ভক্ত ছিলেন তারাও কিন্তু এই ধরনের প্রচার পর্ব ঘিরে আদৌ খুশি ছিলেন না ।আরো বহু অংশের মানুষ, যারা যুক্তিবাদী ,ধর্মের কোনোরকম প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবহার ঘিরে যাদের কোনো রকম আকর্ষণ বা প্রশ্রয় বা সীমাহীন আনুগত্য ছিল না ,তারা রীতিমতো ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন, সাধারণ মানুষের আবেগকে নিয়ে বিশ্বাসকে নিয়ে এইভাবে একটা স্বার্থান্বেষী মহলের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কাজকে ঘিরে ।কালক্রমে এই প্রবণতা সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে যায়। সংশ্লিষ্ট দেবীকে ঘিরে এখনো বহু মানুষের আবেগ আছে ।ভক্তি আছে। শ্রদ্ধা আছে। তারা নিয়মিত ওই দেবীর পূজার্চনা করে থাকেন। কিন্তু ওই দেবীর আদেশ বলে যে ধরনের প্রচার পর্ব সে যুগে চলতো ,সেই ঘটনা ধীরে ধীরে কমে যেতে শুরু করে ।
সমাজমাধ্যম বা ফেসবুক, এমন একটি বিষয় বিশেষভাবে জনপ্রিয় হওয়ার পর , সেই অতীতের প্রবণতা সমাজের একটা অংশের বুকে অত্যন্ত জোরদার ভাবে চেপে বসতে শুরু করেছে ।নানাভাবে এমন কিছু পোস্টার এই সমাজমাধ্যমে নিয়মিত প্রচার করা হচ্ছে যা সাধারণ ভাবে আবেগপ্রবণ বা দুর্বল চিত্রের মানুষদের কাছে একটা বড় রকমের সমস্যার বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে
কোনো না কোনো দেবীর ছবি বা তাঁর প্রসাদ ,ভোগ ইত্যাদি পোস্টার দিয়ে বলা হচ্ছে ; যদি দর্শক এটা দেখা মাত্রই অন্যদের শেয়ার করেন ,তবে তার ভাগ্যে খুব সুখবর এক ঘণ্টার মধ্যে আসবে। আর যদি সেটা না করেন তাহলে তার অমুক অমুক ক্ষতি হবে।
স্বাভাবিকভাবেই এই ধরনের পোস্টার দেখবার পর যে সমস্ত মানুষেরা ধর্মে বিশ্বাসী ,তাদের মধ্যে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে শুরু করে ।যারা একটু দুর্বল চিত্তের মানুষ, নানা ধরনের পারিবারিক, সামাজিক সমস্যায় জর্জরিত ,সেই সমস্ত মানুষজনেরা, ওই ধরনের পোস্টার দেখবার পর ,অত্যন্ত দ্বিধা এবং সংকটের মধ্যে পড়ে যান ।তাদের তখন শ্যাম রাখি না কূল রাখি এমন একটা অবস্থা তৈরি হয়।
এই প্রশ্ন তাঁদের মধ্যে তৈরি হয় যে, ওই ধরনের পোস্টারগুলো তো কোনো না কোনো ব্যক্তি বিশেষের তৈরি। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে এই ধরনের পোস্টার যারা তৈরি করছে ,তারা কি করে জানলেন যে, সংশ্লিষ্ট দেবতারা তাঁদের স্ব বিজ্ঞাপন করবার জন্য এইভাবে উঠে পড়ে লেগেছেন?
এই যুক্তিবোধ যারা ধর্মে বিশ্বাস করেন, সেই সমস্ত মানুষদের মধ্যেও তীব্র হয়ে ওঠে। সংশয় তৈরি হয় এবং দেবতাকে ঘিরে তাদের মধ্যে এই ভাবনা বড় হয়ে উঠতে থাকে যে, যাঁদের দিয়ে এই ধরনের পোস্টার দেবতা করাচ্ছেন বলে পোস্টারদাতারা প্রকারান্তে দাবি করছেন, কখন, কবে, কিভাবে-- তাদেরকে এই ধরনের আদেশ ওইসব দেবতারা করলেন ?
আবার এই প্রশ্নটা তীব্র হয়ে ওঠে যে ,যদি এই আদেশ আমি পালন না করি তাহলে তো আমার একটা বড় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। তাহলে আমি কি করবো ?মানুষ তখন এই ধরনের একটা সংশয়ের দোলাচালে দুলতে থাকেন। যে ব্যক্তিটির ঘরে অসুস্থ স্বামী বা পুত্র বা কোন নিকট আত্মীয়-স্বজন রয়েছেন, সেই মানুষটির দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে যারা এই ধরনের দেবতাদের আদেশ প্রাপ্ত বলে নিজেদেরকে দেখানোর চেষ্টা করছে, ধর্মের নাম করে এই ধরনের বুজরুকি --এটা সাধারণ মানুষ আদৌ মন থেকে মেনে নিতে পারেন না।
কিন্তু পরিস্থিতিহেতু তারা একটা আপোষকামী মানসিকতার পরিচয় দিতে অনেক সময় বাধ্য হন। ধর্ম আর ধর্মান্ধতা এক জিনিস নয়। এটা সাধারণ মানুষকে বোঝাবার ক্ষেত্রে সমাজমাধ্যমেরও একটা বড় ভূমিকা আছে ।সমাজমাধ্যমকে যাঁরা নিয়ন্ত্রণ করেন, সেই' মেটা ' সংস্থা ,কোনো ধরনের আপত্তিজনক পোস্ট হলে ,রাজনৈতিক বা সামাজিক হিংসা ছড়াতে পারে, বিদ্বেষ ছড়াতে পারে, এমন কোনো পোস্ট কোনো মানুষ দিলে পরে ,সেই ধরনের পোস্টগুলিকে ঘিরে তাঁদের নিজস্ব কলা কৌশলের মাধ্যমে বিচার বিশ্লেষণ করেন ।প্রয়োজনে তাঁরা সেই ধরনের পোস্টগুলিকে উঠিয়েও নেন। সাধারণ মানুষ যাতে সেগুলি আর দেখতে না পান না। সেজন্য তাঁরা প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা নেন।
ধর্মের নাম করে এইভাবে সাধারণ মানুষকে একটা অন্ধবিশ্বাসের দিকে ঠেলে দেওয়ার এই যে প্রবণতা ,সেই প্রবণতা অবিলম্বে রোখা দরকার ।এই প্রবণতার রুখতে গেলে দরকার ব্যাপক জনসচেতনতা ।সাধারণ মানুষ, তা তিনি ধার্মিক হন ,আর নাস্তিকই হন, ওই ধরনের প্ররোচনামূলক ধর্মীয় পোস্ট দেখলে তাঁদের প্রয়োজনীয় আপত্তি জানানো মেটা সংস্থার কাছে বিশেষ ভাবে দরকার ।আর মেটা কর্তৃপক্ষেরও দরকার স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ,সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ।