আজকাল ওয়েবডেস্ক: আমেরিকার মাটিতে হচ্ছে ফুটবলের বিশ্বযজ্ঞ। নীল-সাদা জার্সি ঢেউ তুলছে। আর্জেন্টিনা স্বপ্ন দেখছে লিওনেল মেসিকে নিয়ে। তিনিই আলবিসেলেস্তের অগতির গতি, অনাথের নাথ। আজ মেসির জন্মদিন। ক্যালেন্ডারের পাতায় বাড়ল তাঁর বয়স। কিন্তু মাঠে নামলেই মনে হচ্ছে সময় যেন তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি।
আজ ২৪ জুন। ৩৯ বছরে পা দিলেন রোজারিওর বিস্ময়। তবু এখনও তিনি ছুটছেন। গোল করছেন। জাদু দেখাচ্ছেন। সেই জাদুতে মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছে পৃথিবী।
মেসিকে দেখতে দেখতে অনেকেরই মনে পড়ে যাচ্ছে আর এক আর্জেন্টাইনকে। দিয়েগো আর্মান্দো মারাদোনা। ফুটবল যদি ধর্ম হয়, তাহলে তিনি সেই ধর্মের এক বিদ্রোহী দেবতা।
১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপও হয়েছিল এই আমেরিকাতেই। সেই বিশ্বকাপে মারাদোনা এসেছিলেন যেন শেষবারের মতো পৃথিবীকে নিজের মহিমা দেখাতে। গ্রিসের বিরুদ্ধে তাঁর সেই গোল, হাফ টার্ন নিয়ে আগুনে শট। গোল করার পর ক্যামেরার দিকে ছুটে গিয়ে চোখ পাকিয়ে তাকানো, মারাদোনা তখনও মারাদোনাতেই। মাঠজুড়ে আক্রমণের মালা গাঁথছিলেন তিনি। বল পায়ে তাঁর স্পর্শে তৈরি হচ্ছিল কবিতা।
নাইজেরিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচেও দেখা গিয়েছিল সেই পুরনো মারাদোনাকে। ম্যাচের শেষদিকে বিশালদেহী নাইজেরিয়ান ডিফেন্ডারকে পিছনে ফেলে তিনি এমন এক বল বাড়িয়েছিলেন, যার মধ্যে ছিল গোলের গন্ধ। কিন্তু সেখানে পৌঁছতে পারেননি কোনও আর্জেন্টাইন ফুটবলার। পরে অনেকে বলেছিলেন, সেই দৌড়ই নাকি সন্দেহের জন্ম দিয়েছিল। খেলার একেবারে শেষ লগ্নে, ৩৪-এর মারাদোনা কীভাবে এমন দৌড়তে পারেন?

তখন ৩৪-ই ধরা হতো ফুটবলারের ‘বুড়িয়ে যাওয়ার’ বয়স। পৃথিবী এখনকার মতো স্মার্ট হয়নি। এরপর অবশ্য সময় বদলেছে, বদলেছে মানসিকতাও। মেসির মতো ৩৯-এও বিশ্বকাপ খেলা কিংবা রোনাল্ডোর মতো ৪১-এও মাঠে নামার উদাহরণ তখনও তৈরি হয়নি। সেরকম এক সময়ে মারাদোনা আর্জেন্টিনার জার্সিতে ফুল ফোটাচ্ছিলেন। আর্জেন্টিনাও দুদ্দাড়িয়ে ছুটছিল। কিন্তু কী যে হয়ে গেল...!
মহানায়ক কলঙ্কিত হলেন। ডোপ পরীক্ষায় মিলল এফিড্রিনের উপস্থিতি। তার পর নির্বাসন। বিতর্ক। কান্না।
বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল মারাদোনাকে। আর তাঁর সঙ্গে যেন ভেঙে পড়েছিল আর্জেন্টিনার স্বপ্নও। যে মানুষটা মাঠে থাকলে দলটা অন্যরকম হয়ে উঠত, তাঁকে হারিয়ে আর্জেন্টিনার কঙ্কাল বেরিয়ে পড়েছিল সবার সামনে।
মারাদোনা আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদকে ঘৃণা করতেন। প্রকাশ্যে আক্রমণ করতেন ক্ষমতার রাজনীতিকে। বিভিন্ন সময়ে একাধিক মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন। তাঁদের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ও অবস্থান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিত্যনতুন আলোচনার জন্ম দিত। সময়ের সেই আলো-ছায়া পেরিয়ে আজ পৃথিবী যখন নতুন রাস্তা ধরে হাঁটছে, তখন স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে এক ভিন্ন দৃশ্যপট।
ভাগ্যের কী অদ্ভুত পরিহাস! যে আমেরিকার মাটি থেকে চোখের জলে বিদায় নিতে হয়েছিল মারাদোনাকে, সেই আমেরিকার মাটিতেই আজ তাঁর উত্তরসূরি মেসি শিল্পকে নিয়ে যাচ্ছেন এক অন্য উচ্চতায়।
দুই ম্যাচে পাঁচ গোল। মাঠজুড়ে তাঁর অবিশ্বাস্য উপস্থিতি। তিনি ছুটছেন, তাঁর সঙ্গে ছুটছে আর্জেন্টিনা। এমন এক সময়ে, যখন চারপাশে ঘৃণা, বিভাজন, ক্রোধ আর যুদ্ধের গন্ধ ম ম করছে, তখন মেসি যেন ফুটবলের ভাষায় মানুষকে আবার প্রেমে পড়তে শেখাচ্ছেন। তাঁর বাঁ পা ঘাসের উপর আলপনা এঁকে চলেছে। তাঁর ড্রিবলিংয়ে থাকে বিস্ময়। তাঁর পাসে থাকে কবিতার ছন্দ।
ম্যাচের একেবারে শেষ লগ্নে, যখন কমে আসে শক্তি, ঘাটতি পড়ে দমে, তখনও মেসি লিখে যান ফুটবলের মঙ্গলকাব্য।
অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচের শেষদিকে দ্বিতীয় গোলটি যে ভাবে করলেন, তা যেন শুধুই মেসির পক্ষেই করা সম্ভব। মনে হয় তিনি মাঠে নামেন না, মাঠের উপর স্বপ্ন এঁকে দেন। তিনি না থাকলে নীল-সাদা জার্সিধারীদের অনেক সময়ে বিবর্ণ লাগে। গোল করার লোক নেই, সৃজনশীলতার অভাব চোখে পড়ে। কিন্তু তাতে কীই বা আসে যায়? মেসিকে দেখার জন্যই তো রাত জাগা যায়। মেসির একটি গোল দেখার জন্যই তো হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দেওয়া যায়।

ফুটবলের ইতিহাসে কিছু তারিখ কখনও পুরোনো হয় না। ২২ জুন, ১৯৮৬ সেই রকমই এক দিন। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে মারাদোনা করেছিলেন দুটি গোল। একটি হাত দিয়ে, যা পরবর্তীতে 'হ্যান্ড অফ গড' নামে কিংবদন্তি হয়ে যায়।
আর তার তিন মিনিট পরে যে গোলটি করেছিলেন, তা আজও শতাব্দীর সেরা গোল হিসেবে আলোচিত। অর্ধেক মাঠ পেরিয়ে পাঁচ জন ইংরেজ ফুটবলারকে কাটিয়ে গোল, সেটি শুধু একটি গোল নয়, ছিল শিল্প-বিদ্রোহ আর এক জাতির আত্মপ্রকাশ।
কাকতালীয়ভাবে মারাদোনার সেই মহিমান্বিত গোলের দিনেই মেসি জোড়া গোল করেন অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে।
কাতার বিশ্বকাপ দেখেছে, মেসি শুধু ফুটবলার নন। তিনি আবেগের প্রতিনিধি। ইতিহাসের প্রতিনিধি। হল্যান্ডের বিরুদ্ধে গোল করে দু'কানে হাত দিয়ে যে উদযাপন করেছিলেন, তার মধ্যে ছিল প্রতিবাদের ভাষা। সেই ভঙ্গি ছিল হুয়ান রোমান রিকেলমের প্রতি শ্রদ্ধা।
হল্যান্ডের কোচ ভ্যান গালের জন্য রিকলমের বার্সেলোনা-অধ্যায় সুখের হয়নি। ভ্যান গাল স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, ''হি ডিড নট স্কোর, হি ডিড নট রান।'' এখানেই থেমে থাকেননি ভ্যান গাল। আরও কঠোর মন্তব্য করেছিলেন, ''এটা একটি রাজনৈতিক সাইনিং, এর বেশি কিছু নয়।''
কঠিন সেই সময়ে নীরবে-নিভৃতে আড়ালে কি চোখ ভিজেছিল রিকেলমের? মেসি কাতার বিশ্বকাপে রিকলমের হয়ে প্রতিশোধ নিয়েছিলেন।

তাই কখনও কখনও মনে হয়, এই আমেরিকার মাটিতে মেসি শুধু গোল করছেন না। তিনি যেন সময়ের সঙ্গে কথোপকথন চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি যেন মারাদোনার চোখের জলে ভিজে থাকা মাটিতে বিছিয়ে দিচ্ছেন শ্রদ্ধার ফুল।
ইতিহাসের এক অদ্ভুত স্বভাব আছে। কখনও কখনও ইতিহাস একই মাটি, একই দেশে দুই বিপরীত গল্প লিখে রাখে।
১৯৯৪-এর আমেরিকা বিশ্বকাপ দেখেছিল এক কিংবদন্তির নির্বাসন। ২০২৬ সালের আমেরিকা দেখছে আর এক কিংবদন্তির মহিমা।
একদিন এই মাটিতে মারাদোনার চোখ ভিজেছিল অপমানে, আজ সেই মাটিতেই মেসির পা নতুন এক ভোরের জন্ম দিয়ে যাচ্ছে। কেউ বলবেন এ তো প্রতিশোধ। কেউ বলবেন, এ গুরুদক্ষিণা। আবার কেউবা বলবেন, এ হয়তো ইতিহাসেরই আত্মশুদ্ধি। যে ভূমি একদিন গুরুকে কাঁদিয়েছিল, সেই ভূমিতেই শিষ্য আজ আলো জ্বালিয়ে চলেছেন। মারাদোনার অশ্রু আর মেসির হাসি যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে।
ফুটবল তখন আর কেবল ফুটবল থাকে না, তা হয়ে ওঠে স্মৃতি, আবেগ আর প্রতিশোধের এক অপূর্ব আখ্যান।















