সৌরভ গোস্বামী: ফুটবল দুনিয়ার চিরকালীন এক বিতর্ক— লিওনেল মেসি নাকি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, সর্বকালের সেরা কে? মাঠের যুদ্ধ, ব্যালন ডি’অর কিংবা ট্রফির সংখ্যা দিয়ে এই বিতর্কের মীমাংসা আজও হয়নি। তবে সম্প্রতি সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির (এনটিইউ) নেতৃত্বে হওয়া একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা এই ফুটবল দ্বৈরথকে সম্পূর্ণ এক ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। আমাদের রাজনৈতিক আদর্শ, আত্মমর্যাদাবোধ এবং সোশাল মিডিয়া ব্যবহারের অভ্যাস কীভাবে আমাদের প্রিয় ফুটবলার বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে অবচেতনে প্রভাব ফেলে, তা উঠে এসেছে এই তাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে। ২৬টি দেশের ১০,০০০-এরও বেশি মানুষের ওপর করা এই সমীক্ষা প্রমাণ করেছে যে, ফুটবলারদের ব্যক্তিগত ইমেজ বা ভাবমূর্তি আসলে সাধারণ মানুষের নিজস্ব জীবনবোধ ও দর্শনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
গবেষণার সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হল রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে খেলোয়াড় পছন্দের সংযোগ। দেখা গেছে, যাঁরা তুলনামূলকভাবে উদারপন্থী বা বাম প্রগতিশীল রাজনৈতিক ভাবাদর্শে বিশ্বাসী, তাঁদের পছন্দের তালিকায় এগিয়ে আছেন লিওনেল মেসি। অন্যদিকে, রক্ষণশীল মনোভাবাপন্ন ব্যক্তিরা বেশি পছন্দ করেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোকে। এই পার্থক্যের কারণ লুকিয়ে রয়েছে দুই তারকার জনমানসে তৈরি হওয়া ভিন্ন ব্যক্তিত্বের মধ্যে। মেসি যেখানে শান্ত, প্রচারবিমুখ এবং দলীয় সংহতির প্রতীক; সেখানে রোনাল্ডো অত্যন্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষী, আত্মবিশ্বাসী এবং নিজের ব্যক্তিগত সাফল্যকে প্রকাশ্যেই উদযাপন করতে ভালোবাসেন। মানুষ আসলে নিজের অজান্তেই সেই তারকাকে বেছে নেয়, যাঁর ভাবমূর্তি তার নিজস্ব মানসিক মূল্যবোধের দর্পণ হিসেবে কাজ করে। অবশ্য তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই রাজনৈতিক সংযোগ যতটা স্পষ্ট, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়।
শুধু রাজনীতি নয়, একজন মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং তথ্য গ্রহণের মাধ্যমও এখানে বড় ভূমিকা রাখছে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, যেসব মানুষের আত্মমর্যাদাবোধ বা ‘সেলফ-এস্টিম’ বেশি, তাঁরা রোনাল্ডোকে বেশি পছন্দ করেন। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, উচ্চ আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষরা সাধারণত এমন কোনও প্রভাবশালী ও সফল ব্যক্তিত্বের সঙ্গে নিজেদের মেলাতে ভালোবাসেন, যা তাঁদের নিজেদের প্রতি ইতিবাচক ধারণাকে আরও শক্তিশালী করে। পাশাপাশি, যাঁরা টিকটক বা ইনস্টাগ্রামের মতো শর্ট-ফর্ম ভিডিও প্ল্যাটফর্ম থেকে বেশি খবর সংগ্রহ করেন, তাঁদের মধ্যেও রোনাল্ডো-প্রীতি অনেক বেশি। সোশাল মিডিয়ায় রোনাল্ডোর সুপরিকল্পিত ভিজ্যুয়াল উপস্থিতি ও নজরকাড়া ব্যক্তিত্ব এই মাধ্যমের দর্শকদের সহজেই আকর্ষণ করে।
ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক নিরিখেও এই পছন্দের ভিন্নতা বেশ নজরকাড়া। আর্জেন্টিনা বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশে মেসির রেটিং যেখানে অনেকটাই বেশি, সেখানে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার বেশ কিছু দেশে রোনাল্ডোর জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। মজার বিষয় হল, কোনও দেশের ফিফা র্যাংকিং কেমন বা নিজ দেশের প্রতি আবেগ কতটা, তার সঙ্গে এই তারকা পছন্দের কোনও সম্পর্ক মেলেনি। সব মিলিয়ে এই গবেষণা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে পপ কালচার, বিনোদন কিংবা খেলাধুলা কোনও কিছুই রাজনীতির বাইরে নয়। আমাদের প্রতিদিনের আপাত সাধারণ ভালো লাগাগুলোর গভীরেও আসলে লুকিয়ে থাকে আমাদের মনস্তাত্ত্বিক পরিচয় ও সামাজিক আদর্শের এক অদৃশ্য সমীকরণ।















