দীক্ষা ভুঁইয়া
গুরুতর অভিযোগ নিয়ে চিঠি জমা পড়ল রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর কাছে। পিনকন স্পিরিট লিমিটেডের প্রাক্তন চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর মনোরঞ্জন রায় মুখ্যমন্ত্রীর কাছে একটি বিস্তৃত অভিযোগপত্র জমা দিয়ে দাবি করেছেন, তাঁকে এবং তাঁর সংস্থাকে লক্ষ্য করে পরিকল্পিতভাবে চাঁদাবাজি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রতিহিংসামূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। প্রায় সাত পাতার একটি চিঠি তিনি মুখ্যমন্ত্রীকে পাঠিয়েছেন। যার ছত্রে ছত্রে তাঁর সংস্থাকে 'শেষ' করে দেওয়ার অভিযোগ। অভিযোগ সরকারি আধিকারিক থেকে পুলিশের বিরুদ্ধে!
অভিযোগপত্রে মনোরঞ্জন রায়ের দাবি, মদ প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলির কাছ থেকে প্রতি বোতল উৎপাদনের ভিত্তিতে চাঁদা দাবি করা হত। তিনি সেই দাবি মানতে অস্বীকার করায় তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা সাজানো হয় এবং পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের কয়েকজন আধিকারিক ও এক তৃণমূল নেতার যোগসাজশে তাঁর সংস্থাকে টার্গেট করা হয় বলে অভিযোগ।
চিঠিতে তাঁর অভিযোগ, ২০১৭ সালে তাঁকে ও তাঁর স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করা হয়, পিনকনের একাধিক কারখানা সিল করে দেওয়া হয় এবং এর জেরে শতাধিক শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন। পাশাপাশি রাজ্যের আবগারি রাজস্ব, ব্যাঙ্কগুলির ঋণ এবং সংস্থার হাজার হাজার শেয়ারহোল্ডারের আর্থিক ক্ষতির কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি।
তবে আবগারি দফতর থেকে যে কয়েক'শ কোটি টাকার স্ক্যাম সামনে এসেছে তা বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসতেই সামনে আসতে শুরু করে। অভিযোগ উঠতে শুরু করে বোতল প্রতি তোলাবাজির। পিনকন কোম্পানির প্রাক্তন চেয়ারম্যানের অভিযোগও যে সেই একই বিষয়ে, তা তাঁর চিঠিতে স্পষ্ট। কী তাঁর অভিযোগ?
মনোরঞ্জন রায় অভিযোগ করেছেন, সংস্থার কাছ থেকে বেআইনিভাবে তোলা আদায়ের দাবি প্রত্যাখ্যান করায় তাঁকে, তাঁর পরিবার এবং সংস্থাকে পরিকল্পিতভাবে নিশানা করা হয়। তাঁর অভিযোগ, তৎকালীন রাজ্য প্রশাসনের অপব্যবহার করে একাধিক পুলিশ আধিকারিক ও এক তৃণমূল নেতার যোগসাজশে সংস্থার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়।
মনোরঞ্জন রায়ের মূল অভিযোগ-
. ২০০০ সাল থেকে পিনকন স্পিরিট লিমিটেড মার্কেটে আসে।
. ১ কোটি ১০ লাখ বোতল পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে সরবরাহ করতেন।
. ৬ টি ম্যানুফ্যাকচারিং কারখানা ছিল।
. কয়েক হাজার কোটি এক্সাইজ ডিউটি দিতেন বলে দাবি।
. বোতল পিছু ১ টাকা ( কান্ট্রি লিকার)
. না দিলে ফলস কেস।
. ২০১৬ র সালের শেষ থেকে শুরু সমস্যার।
. মামলার নামে কোটি কোটি টাকা আত্মস্যাৎ
অভিযোগপত্রে প্রাক্তন ডিএসপি প্রিয়ব্রত বক্সী, প্রাক্তন এসডিপিও মিঠুন দে, ডিইও-র প্রাক্তন ডিএসপি প্রভাকর ভট্টাচার্য, তৎকালীন ডেপুটি ডিরেক্টর তন্ময় রায়চৌধুরী এবং তৃণমূল নেতা বিনয় মিশ্রের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও, খেজুরি থানার ২০১৭ সালের একটি মামলার প্রসঙ্গ টেনে মনোরঞ্জন রায়ের দাবি, অভিযোগকারিণী পরবর্তীতে আদালতে হলফনামা দিয়ে জানিয়েছিলেন তিনি বিনিয়োগের সম্পূর্ণ অর্থ ফেরত পেয়েছেন এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তাঁর আর কোনও দাবি নেই। তবুও মামলাটি ষড়যন্ত্রমূলকভাবে দায়ের করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
পিনকন স্পিরিট লিমিটেডের কর্তা অভিযোগ করেছেন, খেজুরি থানার ৪৭/১৭ নম্বর মামলা প্রত্যাহারের উপযুক্ত হওয়া সত্ত্বেও তৎকালীন তদন্তকারী অফিসার প্রিয়ব্রত বক্সি ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে পশ্চিমবঙ্গের PIDFE Act, 2013-এর ৩/২০ ধারায় নতুন মামলা রুজু করেন। তাঁর দাবি, মিঠুন দে ও বিনয় মিশ্রের সঙ্গে যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার করে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, কোনও শুনানির সুযোগ না দিয়েই তাঁকে ও তাঁর স্ত্রী মৌসুমী রায়কে গ্রেপ্তার করা হয় এবং পিনকন স্পিরিট লিমিটেড ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির সমস্ত ব্যবসা কার্যত বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর জেরে পশ্চিমবঙ্গে সংস্থার পাঁচটি চালু মদ উৎপাদন কারখানা বন্ধ হয়ে যায়, শতাধিক শ্রমিক কর্মহীন হন এবং রাজ্য আবগারি দফতরের বছরে প্রায় ১,০০০ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
এছাড়া অভিযোগে বলা হয়েছে, সংস্থার বাজার মূলধন শূন্যে নেমে আসায় ২০ হাজারেরও বেশি শেয়ারহোল্ডার ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং প্রায় ৪০০ কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ অনুৎপাদক সম্পদ (NPA)-তে পরিণত হয়।
তিনি আরও দাবি করেছেন, পিনকন স্পিরিট কখনও চিটফান্ড সংস্থা ছিল না এবং কলকাতা বেঞ্চের NCLT-ও সেই অবস্থান স্বীকার করেছে। পাশাপাশি, কলকাতা হাইকোর্টে দাখিল করা একটি হলফনামার উল্লেখ করে দাবি করা হয়েছে, বিভিন্ন সংস্থা থেকে পিনকন স্পিরিটে ২.০১ কোটি টাকার আর্থিক লেনদেনের তথ্য তদন্তকারী সংস্থাই আদালতে স্বীকার করেছে। আদালতে দাখিল করা আবেদনে তাঁর দাবি, ২০১৩ সালে কথিত ২.০১ কোটি টাকার অর্থ তছরুপের অভিযোগে কারখানা সিল করে দেওয়া হলেও, সেই তদন্তে দীর্ঘ বিলম্বে সংস্থার শত শত কোটি টাকার প্ল্যান্ট ও যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে যায়। পাশাপাশি, প্রায় ৪০০ কোটি টাকার ব্যাঙ্ক ঋণ এনপিএ-তে পরিণত হয়। সঙ্গেই সাফ জানিয়েছেন, তিনি বা তাঁর স্ত্রী মৌসুমী রায়ের সঙ্গে কোনও চিটফান্ড কার্যকলাপের যোগসূত্রের প্রমাণ নেই। স্ত্রী গৃহবধূ হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে এবং সংস্থার চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট অরূপ ঠাকুরকে বিনা নোটিসে গ্রেপ্তার করে দীর্ঘদিন বিচারবিভাগীয় হেফাজতে রাখা হয়েছিল বলেও অভিযোগ।
মনোরঞ্জন রায় আরও একটি গুরুতর অভিযোগ করেছেন। অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের কয়েকজন আধিকারিক বেআইনিভাবে ব্যক্তিগত লাভের উদ্দেশ্যে তাঁর কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করেন। তাঁর অভিযোগ, মিঠুন দে ৩ কোটি টাকা, প্রিয়ব্রত বক্সী ৩ কোটি টাকা এবং পরবর্তীকালে তদন্তভার নেওয়া প্রভাকর ভট্টাচার্য ৭ কোটিরও বেশি টাকা আদায় করেন। দুর্নীতি দমন শাখায় অভিযোগ জানাতে গেলে তাঁর অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেকে অপহরণের হুমকিও দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ।















