আজকাল ওয়েবডেস্ক: সেবাশ্রয় প্রকল্পে চিকিৎসা সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ। তদন্তে আরও তৎপর হল ডায়মন্ড হারবার পুলিশ। তদন্তের স্বার্থে শুক্রবার ডায়মন্ড হারবার ও বজবজ এলাকার একাধিক নার্সিংহোমে একযোগে অভিযান চালায় পুলিশ।
বিষ্ণুপুরের এসডিপিও-র নেতৃত্বে পরিচালিত এই অভিযানে বিশাল পুলিশ বাহিনী অংশ নেয়। অভিযানে কয়েকটি এক্স-রে ও ইউএসজি (আল্ট্রাসোনোগ্রাফি) মেশিন বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে দাবি, বাজেয়াপ্ত হওয়া এই যন্ত্রগুলির মধ্যে কয়েকটি সেবাশ্রয় শিবিরে ব্যবহার করা হয়েছিল। ঘটনার সঙ্গে যুক্ত একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে তদন্তকারী সূত্রে জানা গিয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত ৩ জুলাই বিষ্ণুপুর থানায় বিজেপি নেতা অভিজিৎ দাস (ববি) একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে তিনি দাবি করেন, সেবাশ্রয় শিবিরে ব্যবহৃত এক্স-রে ও ইউএসজি মেশিন ব্যবহারের ক্ষেত্রে একাধিক নিয়ম লঙ্ঘন করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় অনুমোদন, লাইসেন্স এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত বিধি না মেনেই ওই যন্ত্রগুলি ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। অভিযোগ পাওয়ার পরই বিষ্ণুপুর থানার পুলিশ তদন্ত শুরু করে। পরে বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনা করে ডায়মন্ড হারবার পুলিশ জেলার উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের তত্ত্বাবধানে তদন্তের পরিধি আরও বাড়ানো হয়।
তদন্তের সূত্র ধরে শুক্রবার সকাল থেকেই ডায়মন্ড হারবার ও বজবজের একাধিক বেসরকারি নার্সিংহোমে তল্লাশি চালানো হয়। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে মেশিনের লাইসেন্স, নিবন্ধন, ব্যবহার সংক্রান্ত নথি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পরীক্ষা করেন তদন্তকারীরা। পাশাপাশি, মেশিনগুলির উৎস, কোথা থেকে আনা হয়েছিল এবং সেগুলি কোন কোন শিবিরে ব্যবহার করা হয়েছে, তারও বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
পুলিশ সূত্রে খবর, তদন্তে প্রাথমিকভাবে এমন কিছু তথ্য মিলেছে, যা থেকে মনে করা হচ্ছে বাজেয়াপ্ত হওয়া কয়েকটি এক্স-রে ও ইউএসজি মেশিন সেবাশ্রয় শিবিরে ব্যবহৃত হয়েছিল। সেই কারণেই যন্ত্রগুলি পরীক্ষার জন্য বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। এগুলির প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, প্রয়োজনীয় অনুমোদন এবং আইন মেনে ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞদের মতামতও নেওয়া হতে পারে বলে জানা গিয়েছে।
শুধু যন্ত্র বাজেয়াপ্ত করেই থেমে থাকেনি পুলিশ। যেসব নার্সিংহোম থেকে এই মেশিনগুলি উদ্ধার হয়েছে, সেখানকার কর্তৃপক্ষ ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদেরও দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তদন্তকারীরা জানতে চাইছেন, কার নির্দেশে এই মেশিনগুলি শিবিরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, কীভাবে রোগীদের পরীক্ষা করা হয়েছিল এবং সরকারি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়া হয়েছিল কি না। পাশাপাশি মেশিনগুলির ব্যবহার সংক্রান্ত নথি, রোগীর রেকর্ড এবং আর্থিক লেনদেনের বিষয়েও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
পুলিশের দাবি, তদন্ত এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। সমস্ত নথি যাচাই, সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ এবং প্রযুক্তিগত রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পরই পরবর্তী পদক্ষেপ করা হবে। তদন্তে নতুন তথ্য উঠে এলে আরও কয়েকটি নার্সিংহোমে অভিযান চালানো হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তদন্তকারী আধিকারিকরা।
এদিকে, সেবাশ্রয় প্রকল্পকে ঘিরে ওঠা এই অভিযোগ ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে আলোড়ন ফেলেছে। অভিযোগকে কেন্দ্র করে শাসক ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। তবে পুলিশ জানিয়েছে, তদন্ত সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে এগোচ্ছে এবং শুধুমাত্র তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতেই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ করা হবে। তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে আরও নতুন তথ্য সামনে আসতে পারে বলেও পুলিশ সূত্রে ইঙ্গিত মিলেছে।
এই বিষয়ে বিজেপি নেতা অভিজিৎ দাস (ববি) বলেন, “আমি প্রথম থেকেই অভিযোগ করে আসছিলাম যে সেবাশ্রয় শিবিরে চিকিৎসার নামে একাধিক অনিয়ম হয়েছে। রোগীদের জন্য ব্যবহৃত এক্স-রে ও ইউএসজি মেশিনের বৈধতা, অনুমোদন এবং ব্যবহারবিধি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। সেই কারণেই আমি বিষ্ণুপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছিলাম। আজ পুলিশ তদন্তে নেমে বিভিন্ন জায়গা থেকে মেশিন বাজেয়াপ্ত করেছে। এতে স্পষ্ট, অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়েই তদন্ত এগোচ্ছে।"
তিনি আরও বলেন, "আমাদের দাবি, শুধু মেশিন বাজেয়াপ্ত করলেই হবে না। এই অনিয়মের সঙ্গে যাঁরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত, তাঁদের প্রত্যেকের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে হবে। যদি কোনও সরকারি নিয়ম ভঙ্গ হয়ে থাকে বা মানুষের জীবন নিয়ে খেলা হয়ে থাকে, তাহলে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। তদন্ত যেন কোনও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকে এবং প্রকৃত সত্য মানুষের সামনে আসে, সেটাই আমরা চাই। সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য পরিষেবাকে রাজনৈতিক প্রচারের হাতিয়ার করা কখনওই উচিত নয়। স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন। আমরা চাই পুলিশ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত শেষ করে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করুক এবং আইনের আওতায় আনুক।"
















