ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত:‌  রাশভারি ট্রাকে রীতিমত বেসামাল অনভ্যস্ত নাগরিক জীবন। এই জীবনের মাঝপথে এসে এতটা ঝুঁকি নেওয়া ঠিক হল কিনা এনিয়ে নিজের সঙ্গে বোঝাপনা হচ্ছিল না। চা বাগান ছাড়িয়ে পাথুরে জমি। সঙ্গী মূলত ৮ থেকে ২৪ বছরের পড়ুয়ারা। রয়েছেন জনা কয়েক মধ্যবয়স্ক। পরে জানলাম অন্য ট্রাকে ক্ষুদে সর্বকনিষ্ঠ অভিযাত্রীর বয়স আড়াই বছর। ট্রাক লিস নদীর পাশ ধরে আমাদের নিয়ে যাচ্ছে। চোখে পড়ল খরস্রোতা নদী নেশার মত যেন জড়িয়ে রেখেছে কালিম্পঙের চুনাভাটিকে। জলপাইগুড়ি জেলার ছোট্ট হাফ শহর ওদলাবাড়ি। সেখান থেকেই ট্রেকিংয়ের পথে যাচ্ছি চুনাভাটি। না আছে এনসিসির ট্রেনিং, না আছে ট্রেকিংয়ের কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা। সম্বল বলতে পকেটে পড়ে আছে খানিকটা সাহস।
নেচার এন্ড অ্যাডভেঞ্চার সোসাইটি, সংক্ষেপে ‌এনএএস। ১৭ বছর ধরে হাতে কলমে প্রকৃতির পাঠ সঙ্গে একগুচ্ছ শিরদাঁড়ায় হিমস্রোত বইয়ে দেওয়া অভিযান হাতে কলমে শেখাচ্ছে সংগঠনটি। কোন শৈলশহরে ছুটি না কাটিয়ে শহর ছেড়ে এবার শীতে সঙ্গী হয়েছিলাম এনএএসের। চুনাভাটির এদিকটা লোয়ার হিমালয়। জনমানবহীন। লেপার্ড জোন। শ্বাপদের নিঃশব্দ পদচারণা। রাত বাড়তে না বাড়তেই কেমন যেন ভয় ভয় করে। তবে অন্ধকার ঠেলে প্রয়োজনে ক্যাম্পের বাইরে পা রাখতেই, মশাল হাতে অজানা বন্ধু দাঁড়িয়ে বললেন, কোন দরকার ম্যা’‌ম?‌ কোথাও যাবেন?‌ বলুন এগিয়ে দিচ্ছি। আমি মাথা নেড়ে আবার ক্যাম্পে ঢুকে পড়লাম। সকাল পৌনে ৬ টা বাজতে না বাজতেই শুরু হয়ে গেল ষাটের দশকের দেশপ্রেমের গান।

ক্যাম্পে প্রথম রাত, অচেনা কিছু মানুষ আর স্লিপিং ব্যাগকে সঙ্গী করে ঠিক মত ঘুম আসেনি। জড়ানো চোখে হিমেল ঝাপটা খেতে খেতে বাইরে এসে দেখি চারদিকে ঘিরে রয়েছে জঙ্গুলে পাহাড়। কোনটি ছায়া ঘেরা, কোনটি থেকে কুয়াশা নেমে আসছে। অন্য পাহাড় ইতিমধ্যেই হয়ত ঝলমলে আলো ছড়িয়ে পড়ছে। আর রয়েছে ‘‌উপল ব্যাথিত গতি’‌–লিস। ক্যাম্পের শিরদাঁড়াও বটে। রান্না থেকে যাবতীয় কাজের জন্য ভরসা এই খরস্রোতা।
সংগঠনটির শিবিরগুলির মূলত যোগনদার সেনাবাহিনী। দেশের গণ্ডী পেরিয়ে এবার আন্তর্জাতিক ছোঁয়া পেয়েছে অভিযান শিবির। সপ্তদশ বছরে, পরিবেশপ্রেমী সংগঠনটির শিবির যোগ দিতে এসেছে নেপাল ও বাংলাদেশের নাগরিকরাও। প্রথম বিদেশ সফর বাংলাদেশের আজিজুল হাকিম প্রাচুর্যেরা। ওর কথায় ৬জন বন্ধু মিলে শিবিরে আশার কথা থাকলেও ভিসার সমস্যায় আমি একা এসেছি। একসঙ্গে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত সপ্তম শ্রেণীর সৌমিক চাকি মনের জোড়ে এনিয়ে তিনবার তার ট্রেনিং হয়ে গেল। সৌমিকের সাফ কথা, আমি বড় হয়ে সালমান কানের মত হব। বড়দের জন্য বরাদ্দ থাকলেও প্রকৃতি পর্যবেক্ষণের ক্লাসগুলি মূলতঃ ছোটদের জন্য সাপ, পাখি, প্রজাপতির বিবর্তন, কুসংস্কার প্রতিরোধ কিম্বা প্রাথমিক চিকিৎসা, খাদ্যশৃঙ্খল ইত্যাদি বিভিন্ন আকর্ষনীয় বিষয় রয়েছে পাঠ্যসূচীতে। ক্যাম্পের কঁচিকাঁাচারা টেলিস্কোপে চোখ রেখে উত্তর খোঁজে– পৃথিবীর মত চাঁদেরও কি মরিয়ান খাত আছে। শিবিরে বসে বাগরাকোটের কয়লা খনির শ্রমিক পরিবারে ছোট্ট মেয়েটি দক্ষিণ কলকাতার অভিজাত স্কুলের ছাত্রীর হাত ধরে ব্রহ্মাণ্ড বহুত্ববাদের উপর তথ্যচিত্র দেখছে।

 
জয়ন্তীতে মূলত টাইগার জোনে কাজ করে নন্দাদেবী ফাউন্ডেশন। আলিপুরদুয়ারের নন্দাদেবী ফাউন্ডেশন এবার ৩২ বছরে পা দিল। জলপাইগুড়ি নেচার অ্যান্ড ট্রেকার্স ক্লাব ২৪ শে পর্দাপন করল। এনএএসের ক্যাম্প কমান্ডার গৌতম ঘোষের কথায় তাদের সংগঠনের ৮ জন সদস্য হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট থেকে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত। এনএএস এবং নন্দাদেবী ফাউন্ডেশনের মূখপাত্র শঙ্খদীপ সমাদ্দার জানান, ‘‌এতকিছু করেও আপশোষ থেকেই যায়। নিজেদের গ্যাঁটের খরচ, সামন্য স্পনসরশিপ এবং অংশগ্রহণকারীদের ডোনেশনে এই ক্যাম্প হয়ে থাকে। এইভাবে শিবিরে খরচ চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে।’‌ তিনি আরও জানান, ‘‌এইসব ক্যাম্পের জন্য চাই সরকারি সাহায্য।’‌ প্রশিক্ষকদের কথায়, শিখর ছোঁতে আসল স্বপ্ন নয়, ভবিষৎয়ের অভিযাত্রীদের ভয়কে জয় করে সাহসের বীজ বপন করা। রক ক্লাইম্বিং, রিবার ক্রসিং ক্যানোপিয়া, জুমারিং, র‌্যাপলিং হাতে কলমে এই ক্যাম্প গুলিতে শেখানো হয়। ছয় দিনে শিবির শেষ। ফেরবার পথে নিজেকেই চিনতে যেন একটু অসুবিধা হয়। কিন্তু অভিযাত্রীরা তো কখনও হেরে যায় না। শতকালীন শিবির শেয় তো কি?‌ মার্চের মাঝামাঝি জঙ্গল বন্ধ হবার আগে আবার হতে চলেছে এনএএসের পরবর্তী শিবির।
রুট ম্যাপ–কলকাতা থেকে কাঞ্চনকন্যয় চেপে নিউ জলপাইগুড়ি হয়ে মালবাজার জংসন নামতে হবে। সেখান থেকে টোটো চেপে ২০ কিলোমিটার দূরে ওদলাবাড়ি স্কুলে জমায়েত হয়ই। ওখান থেকে সেনাবাহিনীর ট্রাকে করে ৯ কিলোমিটার কালিংপঙ জেলার চুনাভাটি ক্যাম্পে পৌছালাম।‌

জনপ্রিয়

Back To Top