অজন্তা ঘোষ: তোড়জোড় শুরু হয়েছিল বেশ কিছুদিন আগে থেকেই। পাঁচ মাস হয়ে গেল কলকাতা ছেড়েছি। প্রথমে পেনসিলভানিয়ার গোগলুর বর্তমান কর্মস্থান স্ক্র‌্যানটন সমতল থেকে একটু উঁচুতে সুন্দর এক ছোট্ট পাহাড়ি জনপদ— যেন চল্লিশ বছর আগের আমাদের কার্শিয়াং কিংবা কালিম্পং। সেখান থেকে রাতের স্বপনপুরী লাস ভেগাস— ‌সারারাত শুধু হোটেল আর ক্যাসিনো। তার পর সেই ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন‌। দিন পাঁচেকের মধ্যেই ছড়িয়ে–‌ছিটিয়ে থাকা এই বিশাল ক্যানিয়ন–‌এর বিভিন্ন অংশে, যেমন ওয়েস্ট রিম, নর্থ রিম, সাউথ রিম, জিয়ন, ব্রাইস ইত্যাদি সুন্দর গিরিখাতের মধ্যে মনের আনন্দে ঘুরে বেড়িয়েছি। শেষ ক্যানিয়ন ব্রাইস থেকে প্রায় ৬০৪ কিমি দূরে এখন আমরা সেই হলুদ বনে— হলুদ পাথর জাতীয় অরণ্য (ইয়োলো স্টোন ন্যাশনাল পার্ক)। হলুদ নদী, অর্থাৎ ইয়োলো স্টোন নদী থেকেই এই নামকরণ। বর্তমান পার্কের উত্তরাংশে নদীতীরে বিশাল উঁচু হলুদ পাথরের বেশ কিছু সুন্দর চুড়ো রয়েছে— সব মিলিয়েই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা এই হলুদ বন।
ইয়োলো স্টোনের লেক এরিয়ার ‘‌হোটেল লেক লজ’‌–‌এ যখন পৌঁছলাম, তখন রাত ১০টা। আসার সময় ঘন জঙ্গলের মধ্যে অন্ধকারে দেখা হয়েছে কুচকুচে কালো এক বিশাল বাইসনের সঙ্গে।
খুব ভোরেই ঘুম ভেঙে গেল। ঘন জঙ্গলের মধ্যে আমাদের কটেজ দুটো ছিল পাশাপাশি— এইচ ১৭ আর এইচ ১৮। গত রাতে বৃষ্টি হয়েছে— সকাল থেকেই আকাশে মেঘ— বৃষ্টিও পড়েছে টিপ টিপ করে। চারদিকে বিশাল উঁচু উঁচু গাছ— তার ফাঁক দিয়ে এক টুকরো আলো এসে পড়েছে আমাদের কটেজের সামনে ভিজে রাস্তার ওপর। ভোরবেলা এখানে এই নিরালা পরিবেশে একা একা পায়ে হেঁটে ঘুরতে বেশ ভালই লাগছিল।
প্রথমেই গেলাম ওল্ড ফেইথফুল— এখুনি উদ্গীরণ ‌আরম্ভ হবে। এখন শুধু ফগ–‌এর মতো ধোঁয়া উড়ছে— মনে হচ্ছে যেন সামনে কোথাও আগুন লেগেছে। চারদিক থেকে কুণ্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া উঠছে। হঠাৎ উদ্গীরণ আরম্ভ হল। ধোঁয়ার বদলে ফোয়ারার মতো ছিটকে ছিটকে উঠতে লাগল উষ্ণ প্রস্রবণের জল। অনেক উঁচুতে। একেবারে আকাশছোঁয়া ফোয়ারার মতো। একবার নয়, বেশ অনেকবার। এক জায়গায় নয়, একটা বিশাল এলাকা জুড়ে অনেক অনেক জায়গায় কিছুক্ষণের মধ্যেই সারা আকাশ যেন দার্জিলিঙের ফগে ভরে গেল। এ এক অপূর্ব দৃশ্য। এক নতুন অভিজ্ঞতা!‌ আগে তো কখনও দেখিনি, শুনিওনি। ওল্ড ফেইথফুল— মানে বহু পুরনো বিশ্বাসী!‌ কখনও ঠকাবে না। গেলে তুমি দেখতে পাবেই। কাছেই আর একটি গিজার–‌এ উদ্গীরণ আরম্ভ হল। কাছেই একটা বিরাট হলে নানান সামগ্রী নিয়ে গিফট শপ, মানে একটু গরম হওয়ার জায়গা। প্রচণ্ড ঠান্ডা। ওভারকোট, মাঙ্কি ক্যাপ, গ্লাভস ইত্যাদি পরেও সবাই একবার করে এই গিফট শপে ঢুকছে, কিছুই কিনছে না— একটু গরম হয়ে নিচ্ছে। তার পর আবার বেরিয়ে ফোয়ারা দেখছে।
ওল্ড ফেইথফুল ছাড়িয়ে বাঁদিকে একটু এগোলেই বিশাল এলাকা জুড়ে প্রচুর গিজার— একটার পর একটা ফোয়ারা হয়েই চলেছে। সেই মরুতীর্থ হিংলাজের মতো গরম জল টগবগ করে ফুটছে। প্রত্যেকটা গিজারেরই একটা করে নাম আছে। সঙ্গে দেওয়া আছে একটি করে বোর্ড। সেখানে লেখা আছে ওই গিজারের একটু ছোট্ট ইতিহাস। আমরা দেখলাম ক্যাসেল, ক্রেস্টেড পল‌, টরটয়েস সেল‌— এরকম আরও বহু গিজার। আমাদের ভাল লাগল ওল্ড ফেইথফুল। আর পাগল করল মর্নিং গ্লোরি— যেন সব রকম রঙের সামঞ্জস্যপূর্ণ সমন্বয়ে সদ্যপ্রস্ফুটিত একটি অসামান্য সুন্দর ফুল। নীল, সবুজ আর হলদেরই পাঁচ–‌সাত রকমের বিভিন্ন মাত্রা রয়েছে এতে— মাঝখানটা গোল করে ঘন বেগুনি, তার পর ঘন নীল, তার পর নীল, হালকা নীল, তার পর ঘন সবুজ, হালকা সবুজ, হলুদ, হালকা হলুদ— আর মাঝে মাঝে অল্প খয়েরি বা ব্রিক রেড।

অপূর্ব সুন্দর। এই রকম বহুবর্ণরঞ্জিত গিজার আরও রয়েছে। যেমন বেলজিয়াম পুল‌, বিউটি পুল, ‌এমারেল্ড পুল ‌ইত্যাদি। এ ছাড়াও রয়েছে এক বিশাল জায়ান্ট গিজার।
এর পর গাড়ি করে কাছেই আরও দু–‌একটা গিজার দেখতে যাওয়ার পথেই দেখা হল একপাল বাইসনের সঙ্গে। তার ওপর একটা বড় বাইসন রাস্তার ওপরেই— প্রায় ৬/‌৭ ফুটের মধ্যেই। আর একটু এগোতেই আবার রাস্তার ওপরই বিশাল শিংওয়ালা হরিণ— অসম্ভব সুন্দর। 
এর পর যাওয়া হল ফাউন্টেন গিজার, ‌নরিস পোর্সেলিন বেসিন‌, মাড ভলকানো ‌ইত্যাদি। তার পর এখানকার গ্র‌্যান্ড ক্যানিয়ন অফ ইয়োলো স্টোন‌— অর্থাৎ ক্যানিয়ন ভিলেজ— ‌অসাধারণ সুন্দর!‌ দু’‌পাশের গিরিখাতের মাঝখানে অনেক উঁচু থেকে নীচে পড়ছে বিশাল একটি ঝর্না— একেবারে আমাদের দুধসাগরের মতো সাদা ধবধবে। দু’‌ধারে পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে নীচে ইয়োলো স্টোন নদীতে পড়ে কুলকুল করে বয়ে চলেছে— এটাকে বলা হয় ক্যানিয়ন ভিলেজ–‌এর আপার ফলস। এখানে নদীর জল সমুদ্রের মতো নীল আর সবুজের সংমিশ্রণ। যে ভিউ পয়েন্ট থেকে আমরা এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখছি— সেটির নাম গ্র‌্যান্ড ভিউ পয়েন্ট।
ফেরার পথে যথারীতি দেখা পেলাম বেশ কিছু বাইসনের। কিন্তু দেখা হল আরও নতুন একজনের সঙ্গে, সাদা নেকড়ে বাঘ। জলের ধারে একেবারে খোলা মাঠের মধ্যে।
আর কিছু নেই। এবার শুধু ফেরা। ফেরার পথে দেখা হল গ্র‌্যান্ড টেটন ‌আর কোল্টর বে ভিলেজ। ইচ্ছে ছিল ইডাহো ফলস দেখে ফেরার। কিন্তু সময় করা যায়নি।
সন্ধ্যার আগেই দীপেনদের এয়ারপোর্টে নামিয়ে দিয়ে আমরা আবার সেই রাতের স্বপনপুরী লাস ভেগাসে। আবার সেই বেলাজিও— বালি আর আলোর ফোয়ারা। আবার সেই ক্যাসিনো.‌.‌.‌ আবার সেই.‌.‌.‌ চলল মধ্যরাত্রি পর্যন্ত।
বোধহয় সহ্য হল না। সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে হাজির হয়ে গেল ‘‌জয় বাংলা’‌। সেই ‘‌জয় বাংলা’‌–‌কে সঙ্গে নিয়েই বাংলায় ফিরলাম।

ব্যা ক প্যা ক
ইয়েলোস্টোন থেকে মোটামুটি কাছাকাছি আমুদে শহর লস এঞ্জেলেসে প্রচুর কিছু দেখার আর মজা করার জায়গা আছে। তাই কলকাতা থেকে সরাসরি না গিয়ে লস এঞ্জেলেসে দু’‌দিন কাটিয়ে যেতে পারলে ভাল। তাতে নতুন কিছু দেখাও হয় আর কানেকটিং বিমানেরও সুবিধা হয়। বিমানের ভাড়া অবশ্য সবসময়ই ওঠানামা করে। কলকাতা থেকে লস অ্যাঞ্জেলেসের ভাড়া (‌শুধু যাওয়ার)‌ ৪১,০০০। সেখান থেকে লাস ভেগাস (‌শুধু যাওয়ার)‌ যাওয়ার ভাড়া ৪৪,০০০ টাকা। গাড়িতে লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে লাস ভেগাস ২৭৭ মাইল। গাড়িতে প্রায় ৫ ঘণ্টা সময় লাগে। লাস ভেগাস থেকে ইয়েলোস্টোনের দূরত্ব ৭৪১ মাইল। গাড়িতে সময় লাগে প্রায় সাড়ে ১০ ঘণ্টা। 
কলকাতা থেকে সরাসরি ইয়োলোস্টোন যেতে চাইলে সল্টলেক সিটি হয়ে যাওয়াই সুবিধার। বিমানে কলকাতা থেকে সল্টলেক সিটি (‌যাওয়ার ভাড়া)‌ যাওয়ার ভাড়া ৫৪,০০০ টাকা। সল্টলেক সিটি থেকে ইয়োলোস্টোনের দূরত্ব ৩২১ মাইল। গাড়িতে সময় লাগে প্রায় সাড়ে ৫ঘণ্টা। কলকাতা থেকে কাতার, এমিরেটস, এয়ার ইন্ডিয়া ইত্যাদি সংস্থার বিমান রয়েছে।
আরও জানতে ‘‌আজকাল সফর’‌ বিজ্ঞাপনে নজর রাখুন।  
 

 

জনপ্রিয়

Back To Top