বিশ্বনাথ চক্রবর্তী: শুধুমাত্র বায়ু পরিবর্তনের জন্য লোটা কম্বল নিয়ে ভ্রমণের ভাবনা বহুদিন আগেই ফসিল হয়ে গিয়েছে। মানুষের বদলে যাওয়া জীবন, সভ্যতা ও প্রয়োজনের সঙ্গে তাল মেলাতে ভ্রমণ তথা পর্যটনেরও আমূল বিবর্তন ঘটেছে। শিক্ষা–পর্যটন, স্বাস্থ্য–পর্যটন, রোমাঞ্চ পর্যটন, জন্ম–পর্যটন, ক্রীড়া–পর্যটন ইত্যাদি নানা রঙের উজ্জ্বল পালক যুক্ত হয়েছে এর মুকুটে। এর সঙ্গে অনেকের অলক্ষে গর্ভ–পর্যটন ‌নামক আরেকটি পালক জুড়েছে, যা আমরা অনেকেই জানি না।
দা, হানু, দারচিক ও গারকন–লাদাখ হিমালয়ের দূর্গম চারটি গ্রাম। পড়শি দেশ পাকিস্তানের সীমান্তের কাছাকাছিও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ভরপুর। প্রাচীন সভ্যতার ধারক ও বাহক সিন্ধুনদ এখানে বয়ে চলে আপন মনে। ‘‌লে’‌ শহর থেকে প্রায় ১৬৩ কিমি উত্তর–পশ্চিমের এই গ্রামগুলি বছরের অনেকটা সময় প্রাকৃতিক কারণে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকে। এখানকার মূল অধিবাসীরা ‘‌দ্রোকপা’‌ বা ‘‌ব্রোকপা’‌ নামে পরিচিত বা ‘‌দার্দ’‌ জনজাতি ভূক্ত। গৌরবর্ণ, উন্নত নাসিকা, হালকা নীলাভ চোখ, উন্নত গ্রীবা ও আর্কষণীয় লম্বা চেহারার অধিকারী প্রায় ১৮০০ ব্রোকপা পরিবার নিজেদের ‘‌আর্য’‌‌ পরম্পরার প্রকৃত উত্তরসূরী বলে দাবি করেন। প্রবল জাত্যাভিমানে এরা লাদাখের প্রচলিত সভ্যতার স্পর্শ এড়িয়ে নিজস্ব আর্য্য কৌলিন্য, আভিজাত্য, সংস্কৃতি ও বংশধারার স্বাতন্ত্রতা আজও বজায় রেখেছে। মতভেদে প্রকাশ, এরা বহুপূর্বে মধ্য এশিয়া থেকে পাকিস্তানের গিলগিট হয়ে সিন্ধু উপত্যকায় ডেরা বেঁধেছিল। কারও মতে এরা রোম থেকে আসত বা এদেশে থেকে যাওয়া সম্রাট আলেকজান্ডারের পরাক্রমশালী বীর সেনাদের উত্তরসূরী। ঘটনা যাই হোক, এই গ্রামগুলোর বাসিন্দারা লাদাখ হিমালয়ের মঙ্গোলয়েড অধিবাসীদের থেকে চেহারায়, আচার–ব্যবহারে, সংস্কৃতিতে ও ভাষায় সম্পূর্ণ আলাদা। নিজেদের কৌলিন্য বজায় রাখতে বদ্ধ পরিকর এই পরিবারগুলো আজও অন্তঃবিবাহ অর্থাৎ একমাত্র নিজেদের গোষ্ঠীর মধ্যেই বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হয়। একই কারণে বহুবিবাহকে আজও এরা মান্য করে।
লাদাখ সফরকারী পর্যটকদের কাছে সিন্ধুপারের বিন্দু এই গ্রামগুলিই আর্য গ্রাম বলে পরিচিত। এর মধ্যে ‘‌দা’‌ ও ‘‌হানু’‌ লাদাখের লে জেলার আর ‘‌দারচিক’‌ ও ‘‌গারকন’‌ কার্গিল জেলার অন্তগর্ত। দা ও হানু একযোগে ‘‌দাহানু’‌ নামেও পরিচিত। ছড়ানো ছেটানো বাড়ি–ঘর উচ্চ পাহাড়শ্রেণীতে ঘেরা। সবুজ শস্যক্ষেত আর নির্জন দূষণহীন এই প্রকৃতিতে আসা মাত্র কারাকোরাম থেকে ছুটে আসা বাতাস আপনাকে স্বাগত জানাবে। তখন আপনার সঙ্গী শুধু সিন্ধুনদ। সে আপনাকে উপত্যকার গল্প শোনাবেই। চঞ্চল হিমেল হাওয়ায় দীর্ঘ ইতিহাসের পাতা যাবে উল্টে। সেই গল্পে থাকবে এই মানুষের জীবন সংগ্রাম, চাওয়া–পাওয়া, আনন্দ–অশ্রু আর গোপন প্রেমের অজানা কথা। সঙ্গে আরো কত কী?‌ বহুদিন এই গ্রামগুলিতে বইয়ের পর্যটকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা ছিল। কিন্তু পর্যটন তথা স্থানীয় অর্থনীতি চাঙ্গা করার উদ্দেশ্যে ২০১০ সাল থেকে স্থানীয় প্রশাসন অনুমতি স্বাপেক্ষে এখানে প্রবেশাধিকার দেয়। এরপরেই এই গ্রামগুলো বিশেষত ‘‌দাহানু’‌ গ্রামে পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। বিদেশীদের আনাগোনাও শুরু হয়। এই গ্রামগুলোর মানুষজন খুবই সরল, গরিব ও অতিথি পরায়ন। মূলত চাষ ও পশুপালন করেই এদের দিন গুজরান হয়। এখানে প্রচুর পরিমানে ‘‌‌এপ্রিকট’‌–এর চাষ হয়। প্রধানত নিরামিশাষী এই মানুষদের প্রধান খাদ্য ইয়াকের দুধ, গম (‌এর আটার স্থানীয় নাম পাপা)‌ ও বিভিন্ন সবজি। তবে বিশেষ উৎসবে মাংস খাবার রীতিও আছে। যে কোন উৎসবে নারী–পুরুষ নির্বিশেষে মাথায় ফুলের মুকুট ও অলঙ্কারে সজ্জিত হন এঁরা। প্রধানত ধর্মভীরু ও বিভিন্ন পড় বস্তু যেমন পাথর, মাটি, মৃত আইবেক্স (‌পাহাড়ী বন্য ছাগল বিশেষ)‌‌ এর শিং ইত্যাদি পূজা করেন। তবে বর্তমানে এঁরা বৌদ্ধধর্মকে অনুসরন করেন। এঁদের প্রধান ভাষা ‘‌ব্রোস্কেড’‌ অথবা ‘‌মিনারো’‌ হলেও নতুন প্রজন্ম হিন্দি বলতে পারে।
‌এই ফাঁকে সিন্ধু দিয়ে বহু জল গেছে বয়ে। হাওয়ায় কান পাতলে আজও শোনা যায় এই আর্যদের খাঁটি নীলরক্তের টানে ফি বছর বহু বিদেশী, বিশেষত মহিলারা ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া সহ বিভিন্ন দেশ থেকে এখানে ঘুরতে আসেন। এর মধ্যে ভ্রমণার্থী কিছু মহিলা নাকি স্বেচ্ছায় এখানকার আর্য পুরুষদের সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হন। কারণ, গর্ভধানের ইচ্ছে থাকে তাঁদের। উদ্দেশ্য সিন্ধুনদের খাঁটি নীল–‌রক্ত স্রোত সাগরপারে নিজের পরিবারে প্রবাহিত করা। এই‌ভাবে এরা পরিবারকে উন্নত করতে চান। তবে এসব হয় অতি গোপনে।  স্থানীয় প্রশাসন ও গ্রামবাসীরা এই গোপন অভিসার ও গর্ভাধানের কথা সরাসরি অস্বীকার করেন বা এড়িয়ে যান। না জানি কত শত এমন নীল–‌রক্ত ভ্রুণ আধুনিক সমাজে সবার অলক্ষ্যে বেড়ে উঠছে। এসবের প্রমাণ পাওয়া বা দেওয়া যথেষ্ট কঠিন। হয়তো সমাজ বিজ্ঞানী ও নৃতত্ত্ববিদরা এ ব্যাপারে দৃষ্টি রাখছেন। 
তবে ঘটনা যাই হোক, আপনি অবশ্য লাদাখ ভ্রমণে এই আর্য গ্রাম ‘‌দাহানু’কে জুড়ে নেবেন। কারণ এর অকৃপণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য ও সীমাহীন নির্জনতা। ‘‌লে’‌ থেকে উত্তর–‌পশ্চিমে খালাসি হয়ে ‘‌হানু’‌ ১৩৯ কিমি। ‘‌‌‌দা’‌ আরো ২৪ কিমি‌। যাবার পথে নিমু হয়ে আলচি গ্রাম ‘‌লে’‌ থেকে মাত্র ৬৬ কিমি। নিমুতে জাঁসকার ও সিন্ধুনদের সঙ্গম আপনাকে মুগ্ধ করবেই। কিছু দূরে আলচি গ্রাম ও বহু পুরাতন আলচি মনাস্ট্রিও আপনি ঘুরে দেখতে পারেন।

 

 

 

আর্য্য–‌গ্রাম ভ্রমণের কিছু প্রয়োজনীয় কথা:‌
*‌ ‘‌দা’‌ ও হানু ভ্রমণের জন্য প্রয়োজনীয় ইনার লাইন পারমিট লে থেকেই নিতে হবে। এটা খালসে চেক পোস্টে দেখাতে হয়। এ ব্যাপারে গাড়ির ড্রাইভারকে ভরসা করতে পারেন। 
*‌ খালসের পর পথে বিশেষ থাকার বা খাবার জায়গা নেই। তাই শুকনো খাবার ও জল সাথে রাখুন। 
*‌আর্য বসতি ঘোরার জন্য পাহাড়ি পথে অনেকটা হাঁটতে হয়, তাই আরামদায়ক জুতো পরলে ভাল হয়।
*‌ পথে আলচি গ্রামে থাকা বা ভালো খাবার জায়গা আছে। 
*‌‘‌দা’‌ গ্রামে সামান্য দু–‌একটি হোম স্টে আছে। নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন। 
*‌বেশিরভাগ সময় প্রচণ্ড ঠাণ্ডা থাকায় উপযুক্ত গরম পোশাক ও সানগ্লাস সঙ্গে রাখুন। 
*‌আর্য গ্রামগুলিলিতে কারও ফটো তোলার আগে অবশ্যই অনুমতি নেবেন। 
*‌ অতিথিবৎসল গ্রামবাসীরা কিছু খাবার দিয়ে আপ্যায়ন করলে কিছু মূল্য এঁদের হাতে দিন।
*‌উৎসাহের আতিশয্যে এদের সমাজ রীতিনীতি নিয়ে অহেতুক কৌতুহল না দেখানোই ভালো। সহজ–‌সরম গ্রামবাসীদের সাথে ভালো ব্যবহার করুন। 
* সব ব্যাপারে আপনার ড্রাইভারের পরামর্শ গ্রহণ করুন বা আলোচনা করুন। 

ছবি:‌ আর্য গ্রামের বয়স্ক মহিলা (মধুরিমা চক্রবর্তীর তোলা)

জনপ্রিয়

Back To Top