ডঃ‌ সঞ্জীব রায়: নরওয়ের ট্রমসো শহর থেকে সকাল সাড়ে ন’টায় রওনা হয়ে লেভি পৌঁছলাম বিকেল সাড়ে পাঁচটায়। সড়কপথে দূরত্ব ৪৫০ কিমি। পথের দৃশ্য অসাধারণ। অত্যাধুনিক ব্যবস্থাযুক্ত বাসে বসে অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখতে দেখতে নিজের মধ্যেই নিজেকে হারিয়ে ফেলা। লেভি পৌঁছনোর পথে দু’বার টয়লেট ব্রেক দেওয়া হল। ইউরোপে নিয়মই আছে একনাগাড়ে দু’‌ঘণ্টার বেশি বাস চালানো যাবে না। দু’‌ঘণ্টা অন্তর ব্রেক নিতেই হবে। শ্বেতশুভ্র বরফের রাজ্যে হঠাৎ এসে পড়ল ছোট্ট গ্রাম কারেসুভান্তো। গ্রামের লোকসংখ্যা শ–চারেকের মতো। ফিনল্যান্ডের পশ্চিমঘেঁষা সুইডেন সীমান্তবর্তী এই গ্রাম মুওনিও নদীর ধারে। গ্রামের কিছুটা অংশ নদীর যে দিকটা সুইডেনের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে, সেখানে পড়েছে। গ্রামবাসীরা মূলত সামি সম্প্রদায়ের। এই সামি সম্প্রদায়ের মূল উপজীবিকা বল্গা হরিণ পালন। সুইডেনের একেবারেই নিকটবর্তী এই গ্রামের আচার–ব্যবহার ও সংস্কৃতি কিন্তু সুইডিশদের থেকে একেবারেই ভিন্ন। এরা ভীষণভাবে ফিনিশঘেঁষা। ১৯৪৪ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান সৈন্যবাহিনীর হাতে গ্রাম সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছিল। পরবর্তিকালে ধীরে ধীরে সেখানে আবার গড়ে ওঠে জনবসতি। ফিনল্যান্ডের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সড়কপথ ‘‌ই এইট’‌ ছেড়ে বেশ ভেতরের দিকে গেলে গ্রামের মূল অংশটি চোখে পড়ে। বাস থেকে নেমে দেখলাম তাপমান হিমাঙ্কের ৭ ডিগ্রি নীচে। নির্জন, ঠান্ডা, ক্রমাগত তুষারপাত হচ্ছে, ছোট ছোট বাড়ির মাথায় ফুট তিনেক করে বরফ জমেছে, রাস্তা খুঁজে পাওয়া মুশকিল। যেদিকে দৃষ্টি যায় শুধু বরফ আর বরফ। স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে এখানকার মানুষজন থাকে কী করে!‌ ডিসেম্বর–জানুয়ারিতে এখানকার তাপমাত্রা নেমে যায় মাইনাস ২৫ ডিগ্রিতে। আসলে এঁরা অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। গ্রামের ভেতরেই স্কুল ও চার্চ। বলাবাহুল্য এখানে চার্চকেন্দ্রিক সভ্যতা গড়ে উঠেছে। এই গ্রামে প্রথম পদার্পণ করেছিলেন ম্যান্স মারটেন্সন কারেসুয়ান্ড। তাঁর হাতেই তৈরি গ্রামের প্রথম বাড়ি এবং তাঁরই নামাঙ্কিত। সময়টা ছিল ১৬৭০ খ্রিস্টাব্দ। গ্রামে ঢোকার মুখে কয়েকটি দোকান থেকে কিছু স্যুভেনির কিনলাম। এবার বাসে উঠে সোজা গন্তব্য ‘লেভি’। সুমেরু বৃত্ত থেকে মোটামুটি ১৭০ কিমি উত্তরে লেভি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১,৭৪২ ফুট উঁচুতে ছোট্ট শহর লেভি স্কি করার উপযোগী। ৪৩টি স্কি–ঢাল আছে। এ ছাড়াও ২টি গন্ডোলা, ১টি চেয়ারলিস্ট, ৫টি স্টিক লিফট ইত্যাদি স্কি করার উদ্দেশ্যেই তৈরি করা হয়েছে। লেভি ‘স্কি সেন্টার’ হিসেবে শুধুমাত্র ফিনল্যান্ডেই নয়, সমগ্র বিশ্বে সমাদৃত। যদিও প্রচণ্ড ঠান্ডার জন্য এই শহরে ডিসেম্বরের শেষ থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্কি করা সম্ভব হয় না। লেভিতে পৌঁছতেই নজরে এল হোটেল লাগোয়া ‘পোরশে’ গাড়ির একটি শোরুম। এখানকার নিয়ম অনুসারে গাড়ি বিক্রি করার আগে গাড়ির মালিককে বাধ্যতামূলকভাবে তিনদিনের ট্রেনিং নিতে হয়। ওই মালিকদের ২–৩ জনের সঙ্গে আলাপ হল। তাঁরা আমাদের হোটেলেই উঠেছেন, থাকেন রোভানিয়েমি সংলগ্ন এলাকায়। ট্রেনিংয়ে মূলত শেখানো হয় বরফের ওপর দিয়ে গাড়ি চালানোর নিয়মকানুন।
ইচ্ছা ছিল লেভিতে হোটেল চেক ইন করে চলে যাব ২৮ কিমি দূরে অবস্থিত লেভির স্নো ভিলেজে। সেখানে কয়েকটি বাড়িঘর, একটি রেস্তোরাঁ রয়েছে, যার সবটাই বরফে তৈরি। যাওয়ার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আমরাও ইতস্তত করছিলাম মূলত দুটি কারণে। প্রথমত, প্রচণ্ড খারাপ আবহাওয়ার কারণে আমাদের সারথি যাওয়ার ব্যাপারে খানিকটা নিমরাজি ছিলেন। দ্বিতীয়ত, কয়েকজন যেতে অস্বীকার করায় অবশিষ্ট ইচ্ছুকজনের খরচের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় শেষমেশ যাওয়ার চিন্তা ত্যাগ করতে হল। যাই হোক, হোটেলের ঘরে বসে যে প্রাকৃতিক দৃশ্য চোখের সামনে এল তা বাস্তবিকই সুন্দর। ডিনার সম্পন্ন হল হোটেলের ডাইনিং হলে। সাজসরঞ্জামের আধিক্য থাকলেও খাবার মোটেই ভাল ছিল না। খাওয়া শেষে প্রচণ্ড ঠান্ডা উপেক্ষা করে বরফের ওপর দিয়ে হেঁটে গিয়েছিলাম কাছেই ভিউ পয়েন্টে যদি অরোরার দেখা মেলে। কিন্তু আকাশে মেঘ থাকায় এবং তুষারপাত হওয়ায় তা আর সম্ভব হল না।
বিদেশে এলে সাধারণত ট্রাভেল কোম্পানির সিডিউল এমনভাবে করা থাকে যে, পরের দিন সকালে ওঠার খুব তাড়া থাকে এবং তাতে স্বভাবতই ঘুম খুব কম হয়। কিন্তু সেদিন সকালে ওঠার তাড়া খুব একটা না থাকায় একটু দেরি করে ঘুম থেকে উঠে, ধীরেসুস্থে প্রাতরাশ সেরে সকাল ১০টা নাগাদ রওনা দিলাম। গন্তব্য রোভানিয়েমি। এখান থেকে দূরত্ব প্রায় ১৫০ কিমি। ফিনল্যান্ডে বাসের মধ্যে ওয়াইফাই খুব ভাল কাজ করে। বাসের প্রতিটি সিটেই মোবাইল চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। ওয়াইফাই–এর সহজলভ্যতার জন্য প্রায় সবাই নিজ পরিচিতদের সঙ্গে ভিডিও কলে কথাবার্তার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের পথের দু’‌পাশের অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ভাগীদার করছিলেন। এটা ছিল এক উপরি পাওনা। রোভানিয়েমির হোটেলে পৌঁছনোর আগে আমাদের ওই শহরে আর্কটিক সার্কেলে নামানো হল। সেখানে বল্গা হরিণ চালিত স্লেজগাড়িতে চড়া হল। ছোট কাঠের বাক্সের মতো গাড়ি। তাঁর ওপরে বল্গা হরিণের চামড়া পাতা আছে। দু’‌জন করে আধশোয়া অবস্থায় চড়তে পারে। বল্গা হরিণের চামড়া খুব গরম। প্রচণ্ড ঠান্ডায় হরিণটানা কাঠের বাক্সে হরিণের চামড়া চাপা দিয়ে আধশোয়া অবস্থায় আকর্টিক সার্কেলে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ঘুরে বেড়ানোর যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হল তা বাস্তবিকই সারা জীবনের সম্পদ। স্লেজগাড়ি করে ঘুরে আসার পর হাত–মুখ গরম করার জন্য কাঠের আগুন জ্বালিয়ে রাখা আছে। গাড়ির সারথি ছিল একজন সামি যুবক, পরনে তাদের সনাতনী পোশাক। যে হরিণগুলি গাড়ি টেনে নিয়ে যায় তারা খুবই স্পর্শকাতর। গায়ে একটু হাত দিলেই নড়েচড়ে বুঝিয়ে দেয় তার না ভাল লাগার কথা। এই রেইন ডিয়ার বা বল্গা হরিণগুলি দেখতে খুবই সুন্দর। তবে গ্রীষ্মকালে এদের গা থেকে লোম ঝরে গেলে একেবারে হতশ্রী অবস্থা। স্লেজ চড়া শেষ করে ইগলু দেখা হল। দেখে আপ্লুত হতে হয়। ছোটবেলায় ভূগোল বইতে পড়া। তবে পার্থক্য হল এই যে, ইগলুর জন্মস্থান গ্রিনল্যান্ডে, আর আমরা প্রত্যক্ষ করলাম ফিনল্যান্ডে। ফেরার পথে দেখলাম বল্গা হরিণের চামড়া বেশ ভালই বিক্রি হচ্ছে। দাম খুব একটা বেশি মনে হল না। একটি প্রমাণ সাইজের চামড়া মোটামুটি ১০০ ইউরোতে পাওয়া যাচ্ছে। এখানে লোক ঠকানোর ব্যাপারটা নেই, নিশ্চিন্ত মনে কেনাকাটা করা যায়। 
রোভানিয়েমি নামের রোভা অংশটির অর্থ স্থানীয় ভাষায় নুড়ি–পাথরের পাহাড়, আর নিয়েমি শব্দের অর্থ গুহা। এ প্রসঙ্গে বলা দরকার যে, ফিনল্যান্ডের বিভিন্ন অঞ্চলে রোভানিয়েমির বানান ও উচ্চারণে তফাত চোখে পড়ে। রোভানিয়েমির প্রাকৃতিক সম্পদ অঢেল। তার মধ্যে খনিজ পদার্থ এবং মূল্যবান কাঠ মানুষজনের কাছে মূল আকর্ষণ ছিল। ফলে ধীরে ধীরে দেশে জনবসতি গড়ে ওঠে এবং অচিরেই রোভানিয়েমি ব্যবসায়িক কেন্দ্র হিসেবে জনপ্রিয়তা অর্জন করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফিনল্যান্ড সোবিয়েত যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে থাকায় প্রত্যক্ষভাবে জার্মানির সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ফলস্বরূপ ১৯৪৪–এর ১৩ অক্টোবর জার্মান সৈন্যরা ওপরওয়ালার নির্দেশ অনুযায়ী রোভানিয়েমির হাসপাতালগুলিকে বাদ রেখে সমস্ত বাড়ি ও ব্যবসাকেন্দ্রগুলির ওপর প্রচণ্ড আঘাত হানে। জার্মান সৈন্যরা যখন রোভানিয়েমি ধ্বংসলীলায় মত্ত, সেই সময় তাদের ইন্ধন দেওয়ার জন্য আসা আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র সমেত প্রচুর সৈন্য সংবলিত ট্রেনটি রোভানিয়েমি স্টেশনে ঢোকার মুখে আগুন ধরে যায়। আগুন অত্যন্ত দ্রুত পুরো স্টেশনে ছড়িয়ে পড়ে। প্রচণ্ড বিস্ফোরণে স্টেশন–সহ গোটা ট্রেন উড়ে যায়। প্রচুর জার্মান সৈন্য হতাহত হয়। একটি ফিনিশ কমান্ডো ইউনিট এই বিস্ফোরণের দায়ভার স্বীকার করলেও প্রকৃত কারণ আজও অজানা। 
রোভানিয়েমি থেকে পর্যটন বাবদ আয় নিতান্ত মন্দ নয়। ২০১৩ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী রোভানিয়েমিতে ৪,৮১,০০০ জন পর্যটকের আগমন হয়েছিল। 
শহরটিকে প্রথম দর্শনেই ভাল লেগে যায়। এখানকার মানুষজন খুবই শান্ত, ধীর, স্থির। শহরের গা ঘেঁষে চলেছে কোময়াকি নদী। এখন অবশ্য নদীটিকে দেখে বরফে ঢাকা সাদা ফুটবল মাঠ বলে মনে হচ্ছে। রোভানিয়েমিকে বলা হয় ল্যাপল্যান্ডের গেটওয়ে ও রাজধানী। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছাড়াও এই শহরের আরেক আকর্ষণ হল সান্তা ক্লজ ভিলেজ। সান্তার এই গ্রাম সুমেরু বৃত্তরেখাকে ছুঁয়ে গেছে।
পর দিন সকালবেলা হোটেল চেক আউট করে লাগেজ বাসে তুলে রওনা দিলাম সান্তা ক্লজ ভিলেজ অভিমুখে। সান্তা ক্লজের অফিসে ঢুকেই দেখা হল সান্তার অ্যাসিস্ট্যান্টের সঙ্গে। ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকে এগিয়ে যাওয়ার পর একাধিক দরজা অতিক্রম করে অনেকটাই ভেতরে গিয়ে দেখা মিলল বর্তমানে সরকারিভাবে স্বীকৃত সান্তা ক্লজের। বেশ বড় চেহারার সান্তা, প্রকাণ্ড সাদা দাড়িতে সজ্জিত, পরনে চিরাচরিত লাল–সাদা পোশাক। দেখতে দারুণ লাগছিল। আমরা ওনার সঙ্গে করমর্দন করে শুভেচ্ছা বিনিময় করলাম। এর জন্য কোনও ইউরো দিতে হয় না। কিন্তু ওনার সঙ্গে ছবি তুলতে গেলে দক্ষিণা লাগবে ৩০ ইউরো। সান্তা ক্লজের উল্টো দিকে একটি মেয়ে টেলিলেন্স নিয়ে রেডি হয়ে আছে ফটো তোলার জন্য। 
সান্তা ক্লজের নিজস্ব পোস্ট অফিস আছে। ওই পোস্ট অফিস মারফত আপনি বিশ্বের যে কোনও প্রান্তে চিঠি বা শুভেচ্ছাপত্র পাঠাতে পারেন। এখানে ছবি সংবলিত পোস্টকার্ডও পাওয়া যায়, তাতে প্রয়োজনীয় ডাকটিকিট লাগিয়ে পাঠাতে পারেন। দু’‌রকম ডাকবাক্স আছে। একটি শুধুমাত্র ক্রিসমাসের জন্য, অপরটি যে কোনও সময়ের জন্য। ক্রিসমাসের জন্য প্রেরিত চিঠি বা উপহার সামগ্রী সুনির্দিষ্টভাবে ক্রিসমাসের আগের দিন নির্দিষ্ট প্রাপকের হাতে পৌঁছবে। এ ছাড়াও গাইডের কাছে শুনলাম যে, বড়দিনের রাতে বাড়ির ছোটদের জন্য সান্তা ক্লজের উপহার সামগ্রী ডাক মারফত পৌঁছনোর উদ্দেশ্যে প্রত্যেক বছর ৩০ লাখের বেশি মানুষ এখানে আগাম টাকা পাঠান। সান্তা ক্লজ ভিলেজে প্রচুর স্যুভেনিরের দোকান। নানান ধরনের স্যুভেনির সাজানো রয়েছে বিক্রির উদ্দেশ্যে। যদিও দাম একটু বেশি তথাপি বিশিষ্ট জায়গার জিনিস সাধ্যমতো তো কিনতেই হয়। সুমেরু বৃত্তের নিকটবর্তী হওয়ার দরুন রোভানিয়েমিতে সাব–আর্কটিক জলবায়ু দেখা যায়। গ্রীষ্মকাল ছোট, কিন্তু আরামদায়ক। অন্যদিকে শীতকাল দীর্ঘ সময় চলে। শীতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য সারা দিনরাত ধরে তুষারপাত। শীতকালে আকাশ মেঘে ঢাকা। ডিসেম্বরে সারাদিনের মধ্যে মাত্র মিনিট দশেকের জন্য দিবাকর আবির্ভূত হন, বাকি সময় অন্তরালেই থাকেন। 
রোভানিয়েমিতে আমাদের হোটেল ‘সান্তা ক্লজ’ শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত। সান্তা ক্লজ ভিলেজ ঘুরে এসে আমাদের হাতে তখনও অনেক সময়, কিছুই করার নেই। বাস আমাদের আবার হোটেলে নামিয়ে দিয়ে গেল। হোটেলের লবিতে বসেই বিভিন্ন ধরনের বোর্ডারদের আসা–যাওয়া দেখতে দেখতে, সেইসঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে সময়টা কেটে গেল। বিকেল ৫টা ১৫ মিনিট নাগাদ বাস ফিরে এল আমাদের নেওয়ার জন্য। সদলবলে আমরা রওনা দিলাম রেল স্টেশনের পথে। যাওয়ার পথে এক জায়গায় বাস থামিয়ে সকলের জন্য প্যাকেট ডিনার নেওয়া হল। হোটেল থেকে স্টেশনের দূরত্ব বেশি নয়। স্টেশনে পৌঁছে আমাদের তো চক্ষু চড়কগাছ। দেখি প্ল্যাটফর্ম ও রেললাইন পুরোটাই বরফে ঢাকা। আমাদের বাস দাঁড়াল প্ল্যাটফর্মের ওপর। ছাদহীন প্ল্যাটফর্ম। ক্রমাগত তুষারপাত হচ্ছে। আমরা লাগেজ নামিয়ে বরফের ওপর দিয়ে স্যুটকেস টানতে টানতে ওয়েটিং রুমে পৌঁছলাম। যথাসময়ে ট্রেন প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করল। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের বগি একেবারে সামনে ইঞ্জিনের সঙ্গে। প্রচণ্ড উদ্বিগ্নের মধ্যে বরফবৃষ্টিকে উপেক্ষা করে সেই বরফ–ঢাকা প্ল্যাটফর্মের ওপর দিয়ে ভারী স্যুটকেস টেনে নিয়ে যাওয়ার কষ্ট বোধকরি বাকি জীবনে ভোলার নয়। সব কষ্টের তো শেষ থাকে! কোনক্রমে পৌঁছনো গেল আমাদের জন্য নির্দিষ্ট কোচে। ট্রেনের সৌন্দর্য ও ব্যবস্থাপনা দেখে শারীরিক কষ্ট নিমেষের মধ্যে উধাও।
দোতলা ট্রেন। আমাদের কুপও দোতলায়। ছোট্ট কুপের মধ্যে দু’‌জনের জন্য সব ব্যবস্থাই রয়েছে। আমাদের সব লাগেজ চমৎকারভাবে রাখার ব্যবস্থা হয়ে গেল। ট্রেনে ব্যবহারের জন্য উন্নতমানের তোয়ালে, সাদার ওপর সবুজ রঙের বল্গা হরিণের ছাপ দেওয়া বিছানার চাদর, বালিশের ওয়ার সব রাখা আছে। আমাদের দেশের রাজধানী এক্সপ্রেসের প্রথম শ্রেণিতেও এত ভাল তোয়ালে, চাদর দেওয়া হয় না। একটু থিতু হয়ে বসে জানলা দিয়ে প্রাকৃতিক দৃশ্য যতদূর দেখা যায় দেখতে দেখতে চলা। বাইরে অন্ধকার নামার পর খাবারের প্যাকেটের কথা মনে পড়ল। খাবার খুলে আরেকবার চমকানোর পালা। বরফবৃষ্টিতে ও ঠান্ডায় খাবারের অবস্থা অত্যন্ত কাহিল। স্যান্ডউইচ থেকে শুরু করে সব কিছুই ঠান্ডায় চুপসে গেছে। কোনওরকমভাবে খানিকটা গলা দিয়ে নামানো হল। তারপর চমৎকার বিছানায় শুয়ে খানিক পরে বহু কাঙ্ক্ষিত ঘুম। 
পরের দিন ট্রেন হেলসিঙ্কি স্টেশনে পৌঁছল সকাল সাড়ে ছ’‌টায়। স্টেশনে নেমে মালুম হল রোভানিয়েমি অপেক্ষা এখানে ঠান্ডা অনেকটাই কম, কিন্তু ঠান্ডা হাওয়াটা বেশ গায়ে লাগছিল। বাস আসতে দেরি করায় স্টেশনে ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করতে হল। বাস আসার পর লাগেজ তুলে আমরা রওনা হলাম। এবার গন্তব্য প্রথমে হোটেল। যাওয়ার পথে দেখা গেল হেলসিঙ্কিতে বরফের প্রাধান্য কম নেই। হেলসিঙ্কি ছোট শহর, ঝকঝকে পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন। হামেসাই পাখির গুঞ্জন শোনা যায়। পাখিদের মধ্যে সিগাল বেশি। তবে আমাদের চেনা চড়াই, শালিক এবং কাকও দেখা যায়। ফিনল্যান্ডের এই রাজধানী শহর আয়তনে ছোট হলেও সুযোগ–সুবিধা বা স্বাচ্ছন্দ্যের দিক থেকে যে কোনও বড় শহরকে পেছনে ফেলে দেবে। চওড়া রাস্তা, ট্রাম চলেছে অনবরত, কিন্তু লোকসংখ্যা নেহাতই কম। 
প্রথমবার হেলসিঙ্কি আসা সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে দ্রুতগামী ট্রেনে চেপে। বেশ মনে আছে সবুজ গাছপালা, ঘাস, পার্ক, বাল্টিক সাগর দিয়ে দলবেঁধে চলা রংবেরঙের পালতোলা নৌকা। সব আজও স্মৃতিতে উজ্জ্বল রয়েছে, কিন্তু এবারের দেখা হেলসিঙ্কির সঙ্গে পুরনো হেলসিঙ্কিকে কিছুতেই মেলানো গেল না। বাল্টিক সাগর এখন বরফে পাথর হয়ে আছে। এই পাথরের মাঝে আটকে আছে বেশ কয়েকটি জাহাজ। যেদিকে দৃষ্টি যায় শুধু বরফ আর বরফ। 
পূর্বনির্ধারিত নির্ঘণ্ট অনুযায়ী দেখা শুরু ক্যাথিড্রাল অফ হেলসিঙ্কি দিয়ে। তারপরে ক্রমানুসারে এসেছে সেনেট স্কোয়্যার, আলেকজান্ডার সেকেন্ডের স্ট্যাচু, অর্থোডক্স চার্চ, চ্যাপেল অফ সাইলেন্স। চ্যাপেল অফ সাইলেন্সের বাড়িটি একটু অদ্ভুত ধরনের। কাঠের গোলাকার বাড়ি। ভেতরে একটাই আরাধনার ঘর। আগের বার হেলসিঙ্কি এসে এই ঘরটিকে দেখতে পাইনি। চোখে পড়ল স্টেডিয়াম। এখানেই ফিনল্যান্ডের অহঙ্কার পাবলো নুরমি ১৯৫২ সালের অলিম্পিকে একাধিক সোনার পদকের অংশীদার হয়েছিলেন। স্টেডিয়ামের সংস্কারকার্যের জন্য সাধারণের প্রবেশ বন্ধ। এরপর হেলসিঙ্কির স্মারক রক চার্চ। সেখান থেকে বেরনোর মুখেই সেই স্যুভেনির দোকানটি কিন্তু ভীষণ নস্টালজিক। মরশুমের সময় কী সাঙ্ঘাতিক ভিড় হয়। এবার অবশ্য অনেকটাই ফাঁকা। সবশেষে দেখা ফিনল্যান্ড পার্লামেন্ট। হোটেলে ফিরতে ফিরতে বিকেল চারটে বেজে গেল। চেক ইন করে ঘরে ঢুকে স্নান সেরে গরম চা, মুড়ি–বাদাম সহযোগে খাওয়া হল। এই খাওয়ার তৃপ্তিই আলাদা। আমাদের ট্যুর একেবারে শেষের দিকে। আগামিকাল রাতে আমরা হেলসিঙ্কি থেকে দোহা অভিমুখে যাত্রা করব।
রাত সাতটা নাগাদ বাসে করে চললাম ডিনার করতে। অনেক দিন পর আজ ভারতীয় খানা। সেজন্যই হয়তো রান্নাগুলোকে একটু সুস্বাদু বলে মনে হল। ডিনার শেষে বাসে ফেরার পথে মনে যেন বিসর্জনের বাজনা বেজে উঠল, কারণ এই পর্বের বিদেশ সফরের অদ্যই শেষ রজনী। বিভিন্ন প্রান্তের অচেনা–অজানা লোকজনের সঙ্গে গড়ে ওঠা অল্পদিনের পরিবারের সঙ্গে ছন্দপতনের সময় আসীন। পরের দিন দেরি করে ঘুম থেকে ওঠা। প্রাতরাশ সেরে রেডি হয়ে সব লাগেজ ক্লকরুমে রেখে বেরিয়ে পড়লাম হেঁটে হেলসিঙ্কিকে শেষ বারের মতো দেখে নিতে এবং তৎসঙ্গে কিছু কেনাকাটাও। 
এই সুযোগে আবার দেখে নেওয়া সিবেলিয়াস মনুমেন্ট। তৈরি করেছেন ফিনিশ শিল্পী ইলা হিল্টুনেন ১৯৬৭ সালে। এই শিল্পকর্মটি  সিবেলিয়াস সোসাইটির দ্বারা প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা অর্জন করে। শিল্পকর্মটি দেখলে মনে হবে অনেকটাই রক চার্চের ভেতরে যে পিয়ানো আছে তারই এক সংস্করণ। এই মনুমেন্ট তৈরি করতে ৬০০টি ফাঁকা স্টিলের পাইপ ব্যবহার করা হয়েছে। বলাবাহুল্য, এই স্থাপত্যের মাধ্যমে শিল্পী সিবেলিয়াসের সঙ্গীত ঐতিহ্যকেই তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছে। একই ধরনের মনুমেন্ট প্যারিসের ইউনেস্কোর হেড কোয়ার্টারে আছে। সেই মনুমেন্টের নকশা করেছিলেন হিল্টুনেন। প্যারিসের হেড কোয়ার্টার ছাড়াও নিউ ইয়র্ক সিটিতে ইউনাইটেড নেশনসের হেড কোয়ার্টারে এই মনুমেন্টের ধাঁচে শিল্পকর্মের সন্ধান পাওয়া যায়। 
অবশেষে বিকেল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ হেলসিঙ্কি বিমানবন্দরের উদ্দেশে আমাদের যাত্রা। এবারের ট্যুরে নেই কোনও আক্ষেপ, নেই না পাওয়ার দুঃখ। প্রকৃতির যে রূপ দেখেছি, তা নিঃসন্দেহে বাকি জীবনের সম্বল হয়ে রইল। প্রকৃতি অকৃপণভাবে তার সব রূপ উপস্থাপিত করেছে। কৃতজ্ঞতা জানাই সেই সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তাকে।‌‌‌‌‌

ব্যা ক প্যা ক
কলকাতা থেকে দিল্লি বা মুম্বই হয়ে উড়ানে সরাসরি পৌঁছে যেতে পারেন সুইডেনের রাজধানী শহর স্টকহোমে অথবা কাতার বিমান সংস্থার বিমানে কলকাতা থেকে দোহা হয়ে অথবা এমিরেটস বিমান সংস্থার বিমানে দুবাই হয়ে পৌঁছে যেতে পারেন স্টকহোম শহরে। অরোরা দেখার উদ্দেশ্য থাকলে সময়টা নির্বাচন করবেন মোটামুটি সেপ্টেম্বর মাসের শেষ থেকে মার্চের মধ্যে। ঠান্ডা একটু বেশি হলেও ওই সময়টাই হল শ্বেতশুভ্র স্ক্যান্ডিনেভিয়া-সহ অরোরা বোরিয়ালিসের অপরূপ মোহময়ী সৌন্দর্য উপভোগ করার আদর্শ সময়।
স্টকহোমে একরাত থেকে পরের দিন রাতের ট্রেন ধরে চলে যান নরওয়ের ট্রমসো শহরে। এই ট্রেন সফর আপনার সারা জীবনের স্মৃতিসঙ্গী হয়ে থাকবে। ট্রমসো থেকে ‘লেভি’ হয়ে চলে যান ‘রোভানিয়েমি’। লেভিতে একরাত্রি কাটিয়ে যাবেন। ওখানে ট্যুরিস্ট কম থাকায় এবং একাধিক হোটেল থাকায় আপনাকে ফিরে যেতে হবে না। ভাগ্য সুপ্রসন্ন থাকলে উপরোক্ত যে কোনও জায়গা থেকেই অরোরা দর্শন হয়ে যেতে পারে। পরের দিন বেলার দিকে রওনা হয়ে সড়কপথে পৌঁছে যান রোভানিয়েমি। সেখানে প্রচুর হোটেল রয়েছে। শহরের প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে সান্তা ক্লজ হোটেল, সিটি হোটেল, আর্কটিক লাইট, ল্যাপল্যান্ড হোটেল ইত্যাদি। ভারতীয় মুদ্রায় খরচ রাতপিছু ৬/৭ হাজার টাকা। রোভানিয়েমি দেখা শেষ করে রাতের ট্রেনে চলে যান ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিঙ্কি। সেখানে অজস্র হোটেল রয়েছে, মোটামুটি ৪-৫ হাজার টাকা থেকে শুরু। 
বাজেটের মধ্যে হোটেল বুকিং-এর জন্য ইন্টারনেটের সাহায্য নিতে পারেন, নচেৎ বিভিন্ন বুকিং এজেন্সির সাহায্য নিতে পারেন। হেলসিঙ্কি দেখা শেষ করে সুখস্মৃতি সঙ্গে নিয়ে একইভাবে কলকাতা ফিরে আসুন।
কেনাকাটা:‌ স্টকহোমের স্যুভেনির শপ থেকে সংগ্রহ করুন সেখানকার বিখ্যাত কাঠের তৈরি ঘোড়া ‘‌সুইডিশ ডালা হর্স’‌। একসময়ে সেটি বাচ্চাদের খেলনা হিসেবে ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে সেটি সুইডেনের প্রতীক। ঘর সাজানোর উপকরণ হিসাবে চমৎকার। ভারতীয় মুদ্রায় দাম মোটামুটি ৭৫০–৮০০ টাকার মতো। হ্যান্ডিক্র‌্যাফট থেকে কিনতে গেলে দাম পড়বে প্রায় আড়াই হাজার টাকার মতো।
সুইডেনের সবচেয় ভাল বেরি হল ক্লাউডবেরি। সাধারণত কালো রঙের বেরি আমরা দেখি, কিন্তু এর রং সোনালি হলুদ রঙের। স্টকহোমে থাকাকালীন এই বেরি অবশ্যই খাবেন এবং বাড়ির জন্যও কিনে আনতে পারেন। দিন পনেরো ঠিক থাকবে। এ ছাড়াও স্টকহোমের বিখ্যাত ব্রেকফাস্ট ব্রেড ‘ন্যাকেব্রড’ কিনতে ভুলবেন না। এককথায় এই ব্রেড অতীব সুস্বাদু। 
আরও জানতে ‘‌আজকাল সফর’‌ বিজ্ঞাপনে নজর রাখুন।

সব ছবি:‌ ডঃ সঞ্জীব রায়
 

জনপ্রিয়

Back To Top