কৌশিক ভট্টাচার্য: পাহাড় সব সময়ই রহস্যময়। আর সেটা হিমালয় হলে তো কথাই নেই। আসলে হিমালয় মানেই যেন প্রাচীন ভারত, মুনি-ঋষি, তাঁদের সাধনার এক সুপ্রাচীন ঐতিহ্য। অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সহজ সরল মানুষ। উত্তরাখণ্ডের কুকুছিনায় এ সব বৈশিষ্ট্য বোধ হ্য় একটু বেশি মাত্রায় আছে।
বেড়ানোর জায়গা হিসেবে কুকুছিনা এখনও অতটা জনপ্রিয় নয়। কুকুছিনার যত নামডাক আধ্যাত্মিকতার জন্য। হিমালয়ের রহস্য আর আধ্যাত্মিকতা‌— এই দুইয়ের টানেই পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে ভ্রমণার্থীরা আসেন এখানে। 
অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। পাহাড়–জঙ্গল–ঝরনা–ফুল–পাখি। সব যেন কোনও শিল্পীর হাতে আঁকা। সভ্যতার কলুষ লাগেনি এর গায়ে। কুকুছিনা এখনও প্রাচীন, অনাঘ্রাত। ঠিক যতটা ছিল আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগে। 
‘কুকুছিনা’ নামের একটা ইতিহাস আছে। পাণ্ডবরা তখন অজ্ঞাতবাসে। তাঁদের খুঁজে বের করতে চতুর্দিকে ছুটে বেড়াচ্ছে কৌরবরা। এখনকার উত্তরাখণ্ডের যে গ্রামে পাণ্ডবদের অবস্থানের শেষ খবর পাওয়া গিয়েছিল সেখানেও ধাওয়া করেছিল তারা। কিন্তু ওই ধাওয়া করাই সার— কোথায় কী? পথ এসে শেষ এই গ্রামে। এর পরে শুধু দুর্গম পাহাড় আর গভীর অরণ্য। রহস্যমাখা প্রকৃতির বুকে আত্মগোপন করল পাণ্ডবরা। ছাউনি বানিয়ে তন্ন তন্ন করে পাহাড়–জঙ্গল চষেও কৌরবরা হদিশ পেলেন না তাঁদের। সেই কৌরব ছাউনি থেকেই গ্রামটির এখনকার নাম ‘কুকুছিনা।’ 
প্রচলিত জনপ্রিয় ভ্রমণের পাশাপাশি অন্য রকম শান্তির অবকাশ যাপন করতে চাইলে আসতে হবে কুকুছিনা। কলকাতা থেকে কাঠ গুদামের পথে হলদুয়ানি স্টেশনে নেমে রানিখেত। কলকাতা থেকে ট্রেন আছে হলদুয়ানি পর্যন্ত। কাছাকাছি পন্থনগর বিমানবন্দরেও প্লেন ওঠানামা করে। সেখান থেকেও হলদুয়ানি আসা যায়। এর পর পাহাড় যাত্রা। হলদুয়ানি থেকে রানিখেত ৫৭ কিলোমিটার। রানিখেত থেকে দ্বারাহাট ৩২ কিলোমিটার। দ্বারাহাট থেকে কুকুছিনার দূরত্ব প্রায় ১৪ কিলোমিটার। সব মিলিয়ে ১০৩ কিলোমিটার রাস্তা। সরাসরি বাস যায় দিনে একবার। গাড়িও ভাড়া নেওয়া যায়। কিন্তু অর্থের সাশ্রয় ও আকর্ষণীয় ভ্রমণের অভিজ্ঞতা পেতে চাইলে তিন খেপে তিন বার বদল করতে হবে জিপ। অথবা রানিখেত পর্যন্ত বাস, তার পর দু’খেপে জিপ বদল। এই ভাবে বদলে বদলে পথ চলার সময় কিছুটা বেশি লাগলেও মাঝে মধ্যে বিশ্রাম মন্দ লাগবে না মোটেই।
চার পাশের পাহড়ি গ্রামের কেন্দ্রস্থল দ্বারাহাট। স্থানীয়দের ভাষায় ‘বাজার’। আসতে হয় পাহাড় ডিঙিয়ে প্রায় ১৮-২০ কিলোমিটার পথ। নিজেদের প্রয়োজনীয় দৈনন্দিন জিনিসপত্র কিনতে এখানেই আসেন আশপাশের গ্রামের মানুষ। ইচ্ছে করলে এই পাহাড়ি গঞ্জে এক রাত কাটিয়ে নেওয়া যায়। হোটেল আছে। আগে থেকে যোগাযোগ থাকলে আশ্রয় মিলতে পারে যোগানন্দ আশ্রমে। ‘অটোবায়োগ্রাফি অফ যোগী’ বইটা যাঁদের পড়া অথবা পরমহংস যোগানন্দ সম্পর্কে কিংবা ‘ক্রিয়াযোগ’ বিষয়ে যাঁরা অবগত, তাঁরা এই আশ্রম বিষয়ে অপরিচিত নন। ‘মহাবতার বাবা’র কথাও তাঁদের জানা। আপাতত যাওয়া যাক কুকুছিনার পথে।
দ্বারাহাট থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে ধুধৌলিতে একটি সরকারি অতিথিশালা একা একা দাঁড়িয়ে আছে পুজো–না–পাওয়া কার্তিক ঠাকুরের মতো। এই নিঃসঙ্গ অতিথি নিবাসে এক দিন বাতি জ্বালালে মন্দ হয় না। কুকুছিনা থেকে মাত্র ৪ কিলোমিটার দূরে দুনা গিরি মাতার মন্দির। রাস্তা থেকে উঁচুতে। নীচ থেকে ওপর পর্যন্ত নানা মাপের শয়ে শয়ে ঘণ্টা বাঁধা। দেখতে দেখতে ৫০০ সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠুন। এখানকার মানুষের কাছে দুনা গিরিমা অত্যন্ত জাগ্রত। দেবদেবীতে ভক্তি, বিশ্বাস থাকলে পুজো দিতে পারেন। না থাকলেও ৫০০ সিঁড়ি ভেঙে ওপরে ওঠার পরিশ্রম বিফলে যাবে না। প্রথমত, অত উঁচু থেকে প্রকৃতির রূপ চাক্ষুষ করার অভিজ্ঞতা ঈশ্বর দর্শনের মতোই দুর্লভ। দ্বিতীয়ত, মন্দির লাগোয়া হলঘরে দিনভর চলছে ভাণ্ডারা। আপনি যাওয়ামাত্র এখানকার সেবকরা আপনাকে যত্ন করে খাওয়াবে গরম পুরি, সবজি ও হালুয়া। বিনিময়ে কোনও অনুদান দেওয়া বা না–দেওয়া আপনার মর্জি।
গাড়ির রাস্তা এখানেই শেষ। আর ঠিক এখানেই জোশীজিদের রেস্তোরাঁ ও চায়ের দোকান তথা বসতবাড়ি। কুকুছিনাতে থাকার একমাত্র জায়গা জোশীজির গেস্ট হাউজ। গেস্ট হাউজের ঘর আরামপ্রদ সঙ্গে ‘ইকোফ্রেন্ডলি’। আছে গোটা তিনেক বিদেশি ধাঁচের কটেজও। বছরের যে সময়েই আসুন দেখতে পাবেন হিমালয়ের রহস্য আর আধ্যাত্মিকতার টানে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে অতিথিরা এখানে হাজির। গেস্টহাউসে আছে বিরাট প্রার্থনাকক্ষ বা মেডিটেশন রুম। নির্দিষ্ট কোনও দেবদেবীর পুজো হয় না। আছে মহাবতার বাবাজির কাল্পনিক চিত্র ও তাঁর শিষ্য আর তাঁদের শিষ্যদের ছবি। আছেন যিশু খ্রিস্টও।
এখানকার মানুষের বিশ্বাস অনুযায়ী মহাবতার যোগী প্রাচীন ক্রিয়াযোগ চর্চার মাধ্যমে অবিনশ্বর শরীর ধারণ করেছেন। আড়াই হাজার বছর ধরে তিনি এই জঙ্গল পর্বত গুহায় অবস্থান করছেন। তাঁর কৃপা ও আশীর্বাদে ভক্তরা কখনও কখনও তাঁর দর্শন পেয়েছেন বলেও শোনা গেছে। কুকুছিনায় জোশীদের অতিথিনিবাসের ঠিক উলটো দিকের পাহাড়ে ‘বাবাজি কা গুহা’। পাহাড়ি ঝরনা ও জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পাথুরে সিঁড়ি ভেঙে তিন কিলোমিটার। যাঁরা ট্রেক করতে ভালোবাসেন, তাঁদের কাছে আদর্শ। প্রায় ঘণ্টা তিনেক সময় লাগে। তাই শুকনো খাবার আর জল সঙ্গে রাখাই ভাল। মাঝ পথে হঠাৎ আবির্ভূত হবে একটি পাহাড়ি কুকুর। যে আপনাকে পথ দেখাতে দেখাতে পৌঁছে দেবে বাবাজির গুহার কাছাকাছি। তার পর অদৃশ্য হবে। এই মহাভারতীয় অত্যাশ্চর্য দর্শনের জন্য কুকুছিনায় এসে আপনাকে বাবাজি কা গুহা দর্শনে যেতেই হবে। গুহার ভেতরে এখন অবশ্য আর যাওয়া যায় না। পাঁচিল তুলে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। লোকমুখে শোনা যায়, এই গুহার ভেতরেই নাকি পাণ্ডবদের যুদ্ধাস্ত্র রাখা আছে। বাবাজির গুহা যে পাহাড়ে তারই মাথায় রয়েছে মহাবতার বাবার শিষ্য বলবন্ত গিরির আশ্রম— পাণ্ডব খোলি। এখন আশ্রমের দায়িত্বে বলবন্ত গিরির শিষ্য রাম সিং। পাণ্ডব খোলির শিখরে উঠতে হবে হাঁটা পথেই। কুকুছিনা থেকে সময় লাগবে আড়াই ঘণ্টা। রাত্রিবাসের বন্দোবস্ত আছে। আবার সকালে উঠে বিকেলেও নেমে আসা যায়। আপনি গেলেই আপনাকে মশলা দেওয়া উষ্ণ চা পান করাবেন রাম সিং। রাত্রিবাস করলে খাওয়াবেন পুরি–সবজি, পুদিনার চাটনি, গরম খিচুড়ি। পাণ্ডব খোলিতে ঠান্ডা কুকুছিনার থেকে অনেক বেশি। তাই তৈরি হয়ে যেতে হবে। পথে বা জোশিজির চায়ের দোকানে হঠাৎ দেখা হয়ে যেতে পারে ‘রাশিয়ান বাবা’-র সঙ্গে। সুদূর রাশিয়া থেকে এ দেশে এসে গেরুয়া ধারণ করেছেন। এই বাবা পাহাড়ে জঙ্গলে থাকেন। কথা বলেন চোস্ত হিন্দি এমনকী গাড়োয়ালিতেও। আরও অনেকে আছেন। ফ্রেঞ্চ বাবা, চাইনিজ বাবা— ঘুরে বেড়াচ্ছেন অথবা সাধনা করছেন এখানে। দলে দলে বিদেশিরা আসছেন ‘ক্রিয়াযোগ’–এর চর্চা করতে। নিন্দুকেরা অবশ্য বলেন, অমূল্য পাহাড়ি গাছগাছড়া, জড়িবুটি হাতাতে।
চার
শ্বাস-প্রশ্বাসের বিশেষ ক্রিয়া যার মাধ্যমে নিজের শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এক কথায় তাই ক্রিয়াযোগ। মহাবতার বাবার কাছ থেকে তাঁর শিষ্যরা এই বিদ্যা শিখেছেন। যোগীরাজ শ্যামাচরণ লাহিড়ী মহাশয়ের মাধ্যমে ‘ক্রিয়াযোগ’ শব্দটির সঙ্গে আমরা পরিচিত । আর মিডিয়ার সৌজন্যে বিষয়টা এখন ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। নতুন প্রজন্ম অন্য রকম কিছুর স্বাদ নিতে ছুটে আসছেন পাহাড়ে। ক্রিয়াযোগের টানে। বাড়ছে অধ্যাত্ম পর্যটন। সংস্থান হচ্ছে স্থানীয় মানুষের ডাল–রুটিরও। মন্দ কী? কেউ যদি এই সব আধ্যাত্মিকতায় আগ্রহী না হন, তা হলেও কুকুছিনায় এসে প্রশান্তি অনুভব করবেন দু’চোখ ভরে যাওয়া প্রাকৃতিক মাধুর্যে, সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের রক্তিম আভায় স্নান করতে করতে। নির্জন পাহাড়ি গ্রামে নিজের পদধ্বনি নিজের কানে শুনে। আপনার যদি সাহিত্য বা সৃজনে অভ্যাস থাকে তা হলে জোশীজির বারান্দায় দু’–এক দিন বসে থাকলেই মনের মধ্যে জমে থাকা আইডিয়াগুলো লেখায় অথবা রেখায় অবয়ব পেতে শুরু করবে।
অপরিচিতদের সঙ্গে পরিচিত হতে চাইলে, কিছুটা সময় আর এক কাপ চা নিয়ে বসে থাকুন দোকানে। নেপালের গ্রাম থেকে সীমান্ত ডিঙিয়ে মজুরের কাজ ও খেতি করতে আসা শ্রমিক, পাহাড়ে পাহড়ে গরু–মোষ চরানো গৃহবধূ, হলদুয়ানি থেকে আসা বাসের কনডাক্টর, রাস্তা তৈরির ঠিকাদারের অস্থায়ী কর্মী, আঙ্কেল চিপসের একটা প্যাকেট হাতে পেলে পরশপাথর প্রাপ্তির খুশিতে ডগমগ হয়ে ওঠা সদ্য স্কুল যেতে শুরু করা গ্রামের বালক— একের পর এক দৃশ্যের কোলাজ। এই সব দেখতে হলে দু’‌–চার দিন ঘুরে যান কুকুছিনায়। জেনে ভাল লাগবে শুধু আপনিই নন, দক্ষিণী মহাতারকা রজনীকান্তও ঘুরে গেছেন স্বয়ং। তৈরি হয়েছে বাবাজি কা গুহা নিয়ে চলচ্চিত্রও। তা হলে আর দেরি কেন?‌‌

কুকুছিনা আশ্রমের নিসর্গ।

জনপ্রিয়

Back To Top