অমিতাভ সিরাজ
যাদুঘরের গা–‌ঘোঁষে সদর স্ট্রিটের এই বাড়িটা বহু পুরনো। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাদম্বরী দেবীর স্মৃতি রয়েছে। সেই ১০ নম্বর বাড়ির সামনে অনেকক্ষণ ক্যামেরা তাক করে বসেছিলেন শ্বেতাঙ্গ তরুণটি। কাঁধে ঝোলা। পায়ে ‘‌কিটো’‌ স্যান্ডেল। মাথায় অবিন্যস্ত সোনালি চুল। কবি?‌ কে জানে!‌ অ্যালেন গিন্‌সবার্গও তো এরকমই হেঁটে বেড়িয়েছেন এই রাস্তায় ষাটের দশকের শেষে!‌ ‘‌অ্যান্ড ড্রাউন্‌স মি আন্ডার ইট্‌স গ্যাঞ্জেস/‌ হেভিনেস ফরএভার.‌.‌.‌’‌— লিখেছিলেন আমেরিকার ‘‌বিট জেনারেশন’‌–‌এর ওই জনপ্রিয় কবি। সদর স্ট্রিটকে নিজের বাড়ি (‌‌!‌‌)‌ মনে করতেন গিন্‌সবার্গ। ক্যামেরার শাটার ক্লিক করে এই সাহেব মানুষটি যখন ঘুরলেন, তাঁর লেন্সবন্দী হয়ে গেছেন রিক্সাওয়ালা। ততক্ষণে নামও জানা হয়ে গেছে—আন্দ্রে এগরেঁ। সুইডেনের স্টকহোমে ছোট্ট শহরটির নাম জনকোপিং। যা সুইডিশ ভাষায়—‘‌শেন গো পিন’‌। সেখানেই বাড়ি আন্দ্রের। শৌখিন আলোকচিত্রী। পেশায় স্টকহোমের একটি কমিউনিকেশন সংস্থার ম্যানেজিং ডিরেক্টর। কলকাতার টানে বার বার উড়ে আসেন। ‘‌হেরিটেজের শহর। প্রাণবন্ত। এর ইট–‌কাঠ–‌পাথরে উষ্ণতা খুঁজে পাই। সাধারণ মানুষের মধ্যেও।’‌ ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজিতে যা বললেন সুইডিশবাসী আন্দ্রে এগরেঁ, বাংলায় তার মানে দঁাড়ায় এটাই। 
শুধু তিনি নন, সর্বভারতীয় সরকারি পরিসংখ্যানও বলছে, এই বাংলায় ক্রমশ বাড়ছে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা। এই নিরিখে সারা দেশে ইতিমধ্যে পঞ্চম স্থান দখল করে নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। পর্যটন মানচিত্রে বিদেশিদের কাছে রাজস্থানের আকর্ষণ বরাবরই। কিন্তু সাম্প্রতিক কেন্দ্রীয় সরকারের পর্যটন দপ্তরের এক  সমীক্ষা রিপোর্টে বলা হয়েছে, গত এক বছরে অন্তত দেড় লাখেরও বেশি বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। বাংলার মাটিতে পা রেখেছেন প্রায় ১৫ লক্ষ বিদেশি পর্যটক। যা আগের বছরের হিসেব ছিল ১৩.‌৫ লক্ষ। গোটা দেশে তা ৭৮.‌৫৩ লক্ষ। কেন্দ্রের ওই সমীক্ষায় বলছে, গত বছর জানুয়ারি থেকে নভেম্বর মাসে পর্যটন থেকে রাজস্ব এসেছে প্রায় ১ লক্ষ ৩৮ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা। 
পর্যটন টানতে রাজস্থান, গোয়া, কেরালা ও কর্নাটকের পথে হাঁটছে এই বাংলাও। রাজ্য পর্যটন উন্নয়ন দপ্তরের এক পদস্থ আধিকারিকের কথায়, ‘‌বিদেশিদের মধ্যে ইতিহাস চেতনা বেশি বলে তাঁরা পুরনো শহর, ঐতিহ্যকে মাথায় রাখেন। পশ্চিমবঙ্গ সেই ভাবনায় উপযুক্ত স্থান এটা অনুভব করেই হয়ত বিদেশিদের ভিড় বাড়ছে এই শহরে।’‌ দপ্তররেই নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আর এক শীর্ষ অফিসার বলেন, ‘‌আসলে আগে পর্যটন উন্নয়নে এত টাকা বরাদ্দ হত না। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ক্ষমতায় এসে অর্থ বরাদ্দ বহুগুন বাড়িয়েছেন। বাড়তি গুরুত্ব পেয়েছে এই দপ্তর। ফলে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে পরিকাঠামোগত উন্নতি করা হচ্ছে। নতুন নতুন জায়গা চিহ্ণিত করে আকর্ষণীয় করা হচ্ছে জায়গাগুলি।’‌ উল্লেখ্য, চলতি আর্থিক বছরে এই খাতে ২৯৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে রাজ্য সরকার। গত আর্থিক বছরের তুলনায় ১৩ শতাংশ বেশি। 
আর এর রেশ ধরে পর্যটন শিল্পে বৈচিত্র আনতে এবার ‘‌অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম’‌কেও সামনে আনছে রাজ্য সরকার। ঐতিহ্যবাহী সুন্দরবন, শান্তিনিকেতন, মুর্শিদাবাদ, ডুয়ার্স কিংবা দার্জিলিঙে ‘‌অফবিট’‌ জায়গা খুঁজে বের করা হচ্ছে। তার কারণ, পর্যটন দপ্তরের ওই অফিসারটির কথায়, ‘‌ট্রাডিশনাল স্পটগুলিতে লোকবসতি বেড়েছে। ঘিঞ্জি হয়ে গেছে এলাকাগুলি। বিদেশিরা এখানকার স্থানীয় ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, খাওয়াদাওয়ার মধ্যে মনের রসদ খুঁজতে চায়। ভালওবাসে। বিশেষত কলকাতা, দার্জিলিং, কালিম্পঙ ডুয়ার্স এমনকি সুন্দরবনেও। তাই ‘‌হোম স্টে’‌ ভাবনা খুবই জনপ্রিয় হয়েছে।’‌ রাজ্য পর্যটন দপ্তর তাই নতুন নতুন স্পট খুঁজে বার করে স্থানীয় উদ্যোগীদের উৎসাহিত করছে এই ধরনের উন্নয়ন প্রকল্পেও। জানা গেছে, জেলায় জেলায় অসংখ্য পর্বতারোহী ক্লাবকে অনুদান দেওয়া হবে আরও বেশি করে। যাতে রোমাঞ্চ অভিযানে আরও বেশি সংখ্যক পর্যটক এগিয়ে আসে। বাঁকুড়ার শুশুনিয়া কিংবা পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ে ‘‌অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম’‌–‌এর মজাই আলাদা!‌ আবার ট্রেকিং, রিভার র‌্যাফটিং, গ্লাইডিংয়ের আকর্ষণে বকখালি, দীঘা, তাজপুর থেকে উত্তরবঙ্গে ছুটে যাচ্ছেন বাংলার পর্যটকরা। এখন সেই তালিকাতেও ভিড় বাড়ছে ভিনদেশি পর্যটকদের!‌

জনপ্রিয়

Back To Top