রাজীব চক্রবর্তী:‌ হিমাচলপ্রদেশের সিমলা জেলার শেষপ্রান্তে শতদ্রু উপত্যকার এক ছোট্ট গ্রামে আমরা যখন পৌঁছলাম তখন বেলা গড়িয়ে দুপুর। গ্রামের ঠিক মাঝখানে ভীমাকালীর মন্দির। আর এই মন্দিরই সারাহানের মুখ্য আকর্ষণ। আমাদের আশ্রয় হল মন্দির সংলগ্ন একবাড়িতে। বাড়ির কয়েকটা ঘর নিয়েই তৈরি হয়েছে অতিথিশালা— বুশাহার গেষ্ট হাউস। বাড়ির সামনে গাড়ি থামতেই গৃহকর্তা এগিয়ে এসে স্বাগত জানালেন। মাঝবয়সী এক ভদ্রলোক। শক্তপোক্ত, ছিপছিপে চেহারা। তবে বাঙালিদের মতো মধ্যপ্রদেশ কিঞ্চিৎ মেদবহুল। মাথায় হিমাচলী টুপি। লালচে গোঁফের নীচে মৃদু হাসি। সদালাপী ভদ্রলোক জানালেন দোতলার চারটে ঘরে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। আমাদের আটজনের দলে ডাক্তার, মাউন্টেনার, সাংবাদিক আবার আমার মতো ছাপোষা গৃহস্থ— সবই আছে। টানা বারান্দায় পরপর ঘর। ‘দাদা ঘর পছন্দ হয়েছে তো ? কোনও অসুবিধা হলে বলবেন।’ হিমাচলী মিশ্রিত হিন্দিতে বললেন ভদ্রলোক। এরপর ভদ্রলোক নিয়ে গেলেন বারান্দার অপর প্রান্তে একটা ঘরে। ঘর খুলে দিয়ে বললেন, ‘এটা আমার নিজের বসার ঘর। আপনারা এটাও ব্যবহার করতে পারেন। সন্ধ্যাবেলা এই ঘরে বসে আড্ডা হবে।’‌
ঘরে ঢুকে কিছুটা অবাক হলাম। এক পাহাড়ি গ্রামের গৃহস্থ বাড়িতে এরকম ঘর কল্পনাতীত। ঘরের মেঝে সুদৃশ্য কার্পেটে ঢাকা। চারিদিকে দামি আসবাব। দেওয়ালে বাহারী বাতিদান। পাহাড়ী হস্তশিল্পের বিভিন্ন নিদর্শন ছড়িয়ে রয়েছে ঘরের দেওয়ালে। বোঝা গেল বাড়ির মালিক বেশ শৌখিন।
 আমাদের গাড়ির চালক রোশন। সে–ই জানাল এই গেষ্ট হাউসের মালিক বেশ প্রভাবশালী ব্যক্তি। নিজের বাড়ি সংলগ্ন মন্দিরের একদিকে গাড়ি রাখার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। এদিকে রোশনের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে নীচের একটি ঘরে।
 মন্দির চত্বর থেকে বেড়িয়েই একটা ছোট বাজার।খাবার ছাড়াও কাঁচা সব্জি, শীতবস্ত্র ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যও পাওয়া যায়। বাজারটা এতই ছোট যে, দোকানের সংখ্যা সহজেই হাতে গুনে ফেলা যায়। 
ভীমাকালি মন্দির বাঁদিকে রেখে এগোতেই চোখ আটকে গেল ছবির মত সুন্দর এক ছোট্ট প্রাসাদে। চারিদিকে সবুজ পাহাড়ের মধ্যে গাঢ় খয়েরি রঙের বাড়িটি সহজেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। প্রবেশ পথেই বাগান। সুসজ্জিত বাগান পেরিয়ে মূল ভবন। প্রাসাদচত্বর গাছপালায় পরিপূর্ণ। নিয়মিত পরিচর্যার ছাপ সুষ্পষ্ট। অপূর্ব বাড়িটির নির্মাণশৈলী। চারিদিকে ঘোরানো বারান্দা। মূল বাড়িটা দোতলা। প্রাসাদের ভিতরে যাবার উপায় নেই। দরজা বন্ধ। বারান্দায় দুটো বেতের চেয়ার রাখা। কেয়ার টেকার নিশ্চয়ই আশেপাশে কোথাও আছে। এদিক ওদিক তাকিয়ে সেরকম কাউকে দেখতে না পেয়ে বসে পড়লাম চেয়ারের উপর। সামনে তাকাতেই চোখে পড়ল ভীমাকালি মন্দির।প্রাসাদের মুখোমুখি। প্রত্যহ ঈশ্বর দর্শনের ইচ্ছাতেই বোধহয় এখানে প্রাসাদ নির্মাণ! মন্দিরের চূড়ার ফাঁক দিয়ে দৃশ্যমান ঈষৎ মেঘে ঢাকা পাহাড় শৃঙ্গ। শিখণ্ড মহাদেব। সামনের বাগানে বাহারি ফুলের সমাহার।দু’একজন পর্যটক ছাড়াও স্থানীয় কিছু মানুষও ঘুরে বেড়াচ্ছেন বাগানে। মখমলের মত ঘাসে ছুটোছুটি করছে কয়েকটি শিশু। সামনের  অনুপম দৃশ্যাবলির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মন ছুটে চলল বুশাহার রাজ্যে।
কাশ্মীরের পর পশ্চিম হিমালয়ের অন্যতম প্রাচীন পাহাড়ী রাজ্য বুশাহার। শতদ্রু উপত্যকার এই রাজ্যের পূব দিকে শতদ্রু নদী আর পশ্চিম দিকে ছিল কুলু রাজ্য।ঐতিহাসিকদের মতে বুশাহার রাজ্যেরপ্রতিষ্ঠাতা রাণা দানবর সিংহ। এই রাজপূত বীরসমতলথেকে হিমাচলে এসে ১৪১২ সালে এই রাজ্য পত্তন করেন। বুশাহার রাজ্য বিস্তৃত ছিল কিন্নর দেশ পর্যন্ত। সাংলা উপত্যকার কামরু দূর্গে বুশাহার রাজ বংশের অনেক তথ্য পাওয়া যায়। কামরু ছিল বুশাহার রাজাদের প্রাচীন রাজধানী। পরবর্তীকালে রাজধানী স্থানান্তরিত হয় সারাহানে। সারাহান আদিতে বুশাহার রাজ্যের অন্তর্গত ছিল না। এই পাহাড়ী জনপদ শাসন করতেন কুলুর রাজা। এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের শেষে সারাহান বুশাহার রাজ্যের শাসনাধীনে আসে। 
কুলুর রাজা দীর্ঘদিন ধরেই চেষ্টা করছিলেন তাঁর রাজ্য পূর্বদিকে বিস্তার করার। পাশের রাজ্য বুশাহারের সাথে যুদ্ধ লেগেই থাকত। ক্রমে কুলু ও বুশাহার একে অপরের চিরশত্রুতে পরিণত হয়। কয়েকশো বছর আগের কথা। কুলু যুদ্ধ ঘোষণা করে বুশাহারের বিরুদ্ধে। সেই ভয়ংকর যুদ্ধে প্রচুর সেনা হতাহত হয়।রক্তগঙ্গা বয়ে যায় পাহাড়ী উপত্যকায়। নিহত হন কুলুর রাজা। তার মাথা ধড় থেকে আলাদা করে নিয়ে ফিরে যায় বুশাহার সেনারা। সঙ্গে নিয়ে যায় কুলু রাজপরিবারের দেবতা রঘুনাথজীর চিত্র। শোনা যায়, বর্তমান ভীমাকালি মন্দির চত্বরে এক পাথরের উপর কুলু রাজার কর্তিত মস্তক রাখা হয়। কুলুর পরাজিত প্রজারা এবং রাজ পরিবারের সদস্যরা রাজার শেষকৃত্য সম্পন্ন করার উদ্দেশ্যে বুশাহার রাজাকে অনুরোধ করে নিহত রাজার মাথা ফিরিয়ে দিতে। বুশাহারের পক্ষ থেকে মাথা ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য তিনটি শর্ত দেওয়া হয়। প্রথম শর্ত ছিল, শতদ্রু উপত্যকার কুলু রাজ্যের অন্তর্গত বুশাহারদের দখল করা অঞ্চল কুলুকে ফিরিয়ে দেওয়া হবে না। দ্বিতীয় শর্ত, কুলু ভবিষ্যতে আর কখনো বুশাহার রাজ্যকে আক্রমণ করতে পারবে না। শেষ শর্ত ছিল, রঘুনাথজীর চিত্র যা বুশাহার সেনারা কুলু থেকে নিয়ে এসেছে তা প্রতিষ্ঠিত হবে ভিমাকালী মন্দিরে। পরাজিত রাজ্য কুলু রাজার খণ্ডিত মস্তক ফিরে পাবার জন্য সমস্ত শর্তই মেনে নেয়। প্রতিদানে কুলুও ইচ্ছা প্রকাশ করে বুশাহারও তাদের মতো দশেরা উৎসব পালন করুক। কুলুর প্রস্তাব মেনে নেন বুশাহারের রাজা। শতদ্রু উপত্যকাতেও শুরু হয় মহাসমারোহে দশেরা পালন। রাজার ছিন্ন মস্তক নিয়ে ফিরে যান কুলুর প্রজারা। শতদ্রু উপত্যকার এই গ্রাম বুশাহার রাজ্যের অন্তর্গত হল। জন্ম নিল আজকের সারাহান। 
অষ্টাদশ শতাব্দীতে রাজধানী আবার স্থানান্তরিত হয় সারাহান থেকে রামপুরে। রাজ্যের রাজধানী রামপুর হলেও ভীমাকালী মন্দিরের জন্য বুশাহার রাজাদের কাছে সারাহানের গুরুত্ব কোনওভাবেই হ্রাস হয়নি। সারাহান হয়ে ওঠে বুশাহার রাজ্যের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী। এই দেশীয় রাজ্যের শেষ রাজা পদম সিং বুশাহার  ১৯১৭ সালে ছুটি কাটানোর উদ্দেশ্যে ভীমাকালী মন্দিরের পাশে এই প্রাসাদ তৈরি করান। বুশাহার শাসকদের কথা ভাবতে ভাবতে দেখি দলের সকলে এগিয়ে চলেছে প্রাসাদের পিছন দিকে। আমিও হাটতে থকলাম তাদের পিছু পিছু। 
পাহাড়ি পথে পায়ে হেঁটে ঘোরাটা যুগপৎ আনন্দ ও কষ্টের। দমের অভাব তো হয়ই তার সাথে ব্যথা হয় পা দুটোতেও। চড়াই–এর থেকেও বেশি কষ্ট উৎরাইয়ে। হাঁটুগুলো যেন ধকল আর সহ্য করতে পারে না। তবে সব কষ্ট দূর হয়ে যায় পাহাড়ি গ্রামগুলির সৌন্দর্যে। সারাহান এমনই এক গ্রাম যেখানে সারাদিন পাহাড়ি পথে ঘুরে বেড়ালেও মনে কোনও ক্লান্তি আসবে না। ধাপে ধাপে ছোটো ছোটো ঘর। পাকা ঘরের পাশাপাশি পুরনো দিনের পাথর দিয়ে বানানো ঘরও চোখে পড়ে। বাড়ির সংলগ্ন উঠানে সব্জির খেত। কোথাও রাজমার চাষ হচ্ছে তো কোথাও কচি ভুট্টার গাছগুলি হাওয়ায় মাথা দোলাচ্ছে।ফলের গাছও চোখে পড়ল। আপেল, আখরোট  যত্রতত্র।
 গ্রামের মধ্যে দিয়ে পাকা পথ ধরে হাটতে হাটতে বেশ কিছুটা উপরে পৌছে দেখি ডানহাতে পাথরের পাঁচিল দিয়ে ঘেরা একটা জায়গা। গেটের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে খেলার মাঠ। ছোটো ক্রীড়াঙ্গনটির নাম ‘নলাটি স্টেডিয়াম’। যেখানে হাঁটতে গেলেই অক্সিজেনের অভাবে ক্লান্ত হতে হয়, সেখানে এখানকার ছেলে–মেয়েরা এই উচ্চতায় খেলাধূলা করে কীভাবে! প্রকৃতির এ এক অদ্ভুত খেলা। পরিবেশ, পরিস্থিতি অনুযায়ী তৈরী হয়ে যায় মানুষের শরীর।আরও কিছুটা উপরে উঠতেই বেশ কিছুটা সমতল জায়গা পাওয়া গেল। ডানদিকের কোণে একটা লোহার গেট। পাখীদের অভয়ারণ্য। রয়েছে পক্ষী প্রজনন কেন্দ্র। হিমাচল প্রদেশের জাতীয় পাখি ‘মুনাল’ প্রজননে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। গেটের ফাঁক দিয়ে ভিতরটা দেখা যাচ্ছে। বড় বড় গাছের আবছা অন্ধকার থেকে ভেসে আসছে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, সঙ্গে ঘরে ফেরা অচেনা পাখীর কোলাহল। অরণ্যের দুর্বার আকর্ষণ। ভিতরে যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করতেই রোশন বাধা দিল, ‘সন্ধ্যা হয়ে আসছে, এখন যাওয়া যাবে না।‘ সামনে নিচের দিকে দেখা যাচ্ছে ভীমাকালী মন্দির। মন্দিরের দিকে হাত দেখিয়ে রোশন বলল , ‘দাদা নীচে চলিয়ে। আরতি কা সময় হো গয়া।’ 
শুরু হল মন্দিরের দিকে যাত্রা। পিছনের বন থেকে ভেসে আসা ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক এখনও শোনা যাচ্ছে। রাস্তার দু’ধারে পাইন গাছ। পাইন ফল ছড়িয়ে আছে গাছের নীচে। পড়ন্ত সূর্য্যের আলো তার সাথে বড় বড় গাছের আড়াল মিলে সৃষ্টি হয়েছে আলো-আঁধারি পরিবেশ। পায়ে পায়ে আমরা চলেছি নীচের দিকে। এমন পরিবেশ শুধু উপভোগ করার, তাই যেন কারও মুখে কথা নেই। সবাই চুপ করে হেঁটে চলেছি। শুধু শোনা যাচ্ছে নিজেদের পায়ের আওয়াজ। 
সামনে ভীমাকালীর মন্দির। চারিদিকে সবুজ পর্বতমালা আর পাইন গাছের মধ্যে দিয়ে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে পিচ বাঁধানো রাস্তায় হেঁটে চলা— আমরা হারিয়ে গেলাম এক অন্য জগতে। নিশ্চুপ হেটে চলতে চলতে পৌঁছে গেলাম বানাসুরের দেশে।
শতদ্রু উপত্যকায় অবস্থিত অনুপম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা এই স্থান কিন্নরের প্রবেশ দ্বার। পুরাণ অনুসারে এখনকার সারাহানের নাম ছিল শোণিতপুর।  
ইতিমধ্যে পৌঁছে গেছি মন্দিরের দরজায়। মন্দিরের নির্মাণশৈলী দেখার মতো। মন্দিরটি তৈরি হয় ১৯৪৩ সালে। হিন্দু শৈলীর সাথে মিশে রয়েছে বৌদ্ধ শিল্পরীতির ছাপ। বাইরেটা পাথর ও কাঠের তৈরি। অপূর্ব শিল্পকর্মে ভরা মন্দিরের দেয়াল। মন্দিরের দু’টি বড় বড় স্তম্ভ সহজেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কাঠ এবং পাথর দিয়ে তৈরী এই স্তম্ভদুটির অনেকগুলি ধাপ। কাঠের  খাঁজকাটা জানলাগুলোয় নানা ধরনের কারুকাজ। স্তম্ভের মাথার দিকটায় প্যাগোডার আদল। ছাদগুলি চকচকে কালো পাথরে ঢাকা।   
মূল প্রবেশ দ্বার দিয়ে ঢুকেই একটা বড় উঠোন। প্রায় ৩০০০ বছরের প্রাচীন মন্দিরের পাথরে ঢাকা বিস্তৃত প্রাঙ্গনে প্রবেশ করেই মনে হল যেন এক অন্য জগতে চলে এলাম। কত ইতিহাসের সাক্ষী এই মন্দির। বিস্তৃত প্রাঙ্গনের সামনের দিকে টানা বারান্দা। সেখানে কাঠের তৈরি একটা দোতলা বাড়ি। ভীমাকালী মন্দির ট্রাষ্টের গেষ্ট হাউস। প্রচুর ভক্ত মন্দিরের পবিত্র পরিবেশে থাকার জন্য এই গেষ্ট হাউস  বেছে নেয়। বাঁদিকে একটা পাথরের প্রাচীন মন্দির। লঙ্কাবীরের মন্দির। পুরনো পাথরের মন্দিরটির কাছেই নাকি লুকানো আছে একটা সুড়ঙ্গের বন্ধ প্রবেশ দ্বার। পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে সেই সুড়ঙ্গ পথ চলে গেছে আশেপাশের গ্রামে। গ্রাম থেকে পুরোহিতরা মাতৃশক্তির আরাধনায় রোজ সুড়ঙ্গ পথেই মন্দিরে আসতেন। পাহাড়ি গ্রামের পথে নানা অশুভ শক্তি নাকি ঘুরে বেড়াত পুরোহিতদের পথ আটকানোর জন্য। বলপ্রয়োগের সঙ্গে তারা পুরোহিতদের উপর শর নিক্ষেপও করত। তাই পূজারীদের সুরক্ষার জন্যই বানানো হয়েছিল পথ। লঙ্কাবীরের মন্দির ছাড়াও এই চত্বরের মধ্যেই রয়েছে নরসিংহ ও রঘুনাথজীর মন্দির।  
উঠোনের ডান দিকের দরজা দিয়ে উঠে মা ভীমাকালী  মন্দির প্রাঙ্গন। এটা নূতন মন্দির। ১৯০৫ সালের এক বিধ্বংসী ভূমিকম্পে প্রাচীন মন্দিরটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সর্বসাধারণের জন্য প্রাচীন মন্দিরটির দরজা বন্ধ হলেও মন্দিরে প্রয়োজনীয় সামগ্রী রাখার কাজে এখনও ব্যবহৃত হয়। এই চত্বরে ঢোকার জন্য মস্তক আচ্ছাদিত থাকা জরুরি। টুপি, ওড়না বা অন্য কোনও আবরণে মাথা ঢেকে প্রবেশ করাই নিয়ম। কোমরবন্ধ, মানি ব্যাগ প্রভৃতি চামড়ার জিনিস নিয়েও প্রবেশ নিষেধ। জুতো খুলে এবং সঙ্গের চামড়ার জিনিসপত্রগুলি দরজার পাশে নিশ্চিন্তে জড়ো করে আমরা ভিতরে পৌঁছলাম। এখানেও একটা চৌকো উঠোন। তবে এটা নিচের মতো অত বড় নয়। একটা দালান পেরিয়ে বাঁদিকে কোণাকুণি মন্দিরের ভিতরে উঠে গেছে সিঁড়ি। কাঠের সিড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে শুনতে পেলাম ভজনের আওয়াজ। ভিতরের দেয়ালগুলিতে কাঠের মধ্যে খোদাই করা শিল্পকর্ম। মেঝেতে কার্পেট পাতা। কাঠের বারান্দা দিয়ে কার্পেটের মধ্যে দিয়ে হেঁটে পৌছলাম একটা ঘরে। দোতলার এই ঘরে কোনও বিগ্রহ নেই। বেশ কিছু মানুষ বসে ঢোল এবং খঞ্জনির মত দুটি বাদ্যযন্ত্র সহযোগে ভজন গাইছে। সেই দলে পুরুষ, মহিলা, শিশু সবাই রয়েছে। ছেলেদের মাথায় বিভিন্ন রঙের হিমাচলী টুপি। আর মেয়েদের মাথায় রং-বেরঙের স্কার্ফ। পিত গৌড় বর্ণ একদল নরনারী চোখবুজে, বুকের কাছে হাত জড়ো করে দেবী অম্বার ভজনায় মগ্ন। সঙ্গীতের মাধ্যমে অন্তরের শ্রদ্ধা নিবেদন করছে জগৎ মাতৃকাকে। আমাদের উপস্থিতি তাদের মধ্যে কোনও প্রভাব ফেলল না। চোখ বন্ধ করে তারা গেয়ে যেতে থাকল একের পর এক ভজন। গানে মগ্ন ভক্তদলকে অতিক্রম করে তিনতলায় উঠে পৌছলাম দেবীর সম্মুখে। 
মাতৃ বিগ্রহে দেবী দুর্গার আদল। ভীমাকালী আদ্যাশক্তিরই এক রূপ। দেবী মাহাত্ম্যর যে সব কথা প্রচলিত আছে তা পুরাণের মহিষাসুরমর্দিনীর কাহিনীর মতই। ব্রহ্মার সৃষ্টি করা অগ্নি শিখা থেকে জন্ম হয় এক যুবতী কন্যার। দেবতাদের দেওয়া বিভিন্ন অস্ত্র ও আভূষণে সজ্জিত হয়ে হেমকূট প্রদত্ত সাদা বাঘের পিঠে চড়ে দেবী বিভিন্ন সময়ে নানা রূপে দৈত্য দমন করেছিলেন। অনেকে সারাহানকে শক্তিপীঠ বলেও মনে করেন। দেবীর বাঁ কান নাকি এখানে পড়েছিল।     
মন্দির পরিসর থেকে বেরিয়ে হাটতে হাটতে চলে এলাম রাস্তায়। দোকানপাট, মানুষজন দেখতে দেখতে ঘুরে বেড়াচ্ছি।  কোনও তাড়া নেই। রাত্রের খাবার খেয়েই ঘরে ফিরব। অনেকক্ষণ পরে আবার আমি দলছুট।  উদ্দেশ্যহীন ঘুরতে ঘুরতে এসে পৌঁছলাম আমাদের আশ্রয়স্থল ‘বুশাহার গেষ্ট হাউসে’-র সামনে।    
রাত্রে গেষ্ট হাউসের বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবছিলাম ছোট্ট পাহাড়ী জনপদের কথা। হিমালয়ের স্বভাবিক সৌন্দর্য্যে ভরা শান্ত গ্রামটি ছেড়ে কাল সকালেই চলে যেতে হবে ভেবে মন খারাপ লাগছিল। কখন যেন আমিও তলিয়ে গেলাম ঘুমে।      
চোখ খুলে ডানদিকের জানলা দিয়ে তাকাতেই চোখে পড়ল ভীমাকালি মন্দিরের চূড়া। আকাশ তখনও পুরো পরিস্কার হয় নি। ঘড়ির কাঁটা সাতটা ছুঁই ছুঁই। তার মানে আকাশ মেঘলা। পাহাড় দেখা যাবে না। হিমালয় দর্শনে এসে মেঘলা আকাশ পেলে মনটা খারাপ হয়ে যায়।। ঘরের বাইরে এসে দেখি জয়ন্তদা ও ডাক্তার গল্প করছে। বারান্দার উল্টোদিক দিয়ে বাড়ির মালিক হেটে আসছিল, আমাদের দেখে থামল। ‘দাদা, উপর যাইয়ে। শিবজী কা দর্শন কিজিয়ে’। কী বলতে চাইছে বুঝতে পারলাম না। আমরা একে অন্যের মুখের দিকে তাকাচ্ছি দেখে সে বলল, ‘আইয়ে মেরে সাথ’। 
বারান্দার শেষ প্রান্ত দিয়ে লোহার সিঁড়ি উঠে গেছে ছাদের উপরে। ভদ্রলোকের পিছু পিছু আমরা উঠে গেলাম। ছাদের উপরে আবার একটা ছোটো ছাদ। মইয়ের মত সরু লোহার সিড়ি বেয়ে কোনওরকমে উঠলাম উপরে। ‘সামনে দেখিয়ে’, ভদ্রলোক হাত তুলে দেখাল আকাশের দিকে। মেঘে ঢাকা আকাশের মধ্যে ফুটে উঠেছে সারি সারি পাহাড় চূড়া। পাহাড়ের নিচের দিকটা দেখা যাচ্ছে না। ঘন মেঘে ঢাকা। সাদা ধোঁয়ার মত মেঘ ভেসে চলেছে আমাদের শরীর ছুঁয়ে। পাহাড় চূড়াগুলি মাঝে মাঝে হারিয়ে যাচ্ছে মেঘের আড়ালে। আবার কিছুক্ষণ পরে ভেসে উঠছে আকাশে। মেঘের সাথে লুকোচুরি খেলতে খেলতে একসময় সব শিখরগুলি হারিয়ে গেল। এখন সামনে শুধুই ঘন সাদা মেঘ। ছাদটাও ঢেকে গেল মেঘে।  
ধীরে ধীরে মেঘ কাটতে শুরু করেছে। পূব দিকের কোণে হাল্কা সূর্যের আলো। একটু পরে মেঘের চাদর ধীরে ধীরে পাতলা হতে শুরু করল।  বাঁ দিক থেকে ডানদিকে ভেসে চলেছে মেঘরাশি। একটু একটু করে মেঘ সরছে আর স্পষ্ট হচ্ছে পর্বতরাশি। এতক্ষন যেন একটা চাদর দিয়ে কেউ ঢেকে রেখেছিল । সমস্ত চাদরটা সরে যেতেই বাঁ দিক থেকে ডান দিকে আকাশ জুড়ে দেখা দিল শিখণ্ড মহাদেব পর্বতমালা। মহাদেবের বাসস্থান। এর বিস্তার কিন্নর দেশ জুড়ে। এই পর্বতদেশেই মহাদেব কিরাত রূপ ধারণ করেছিলেন। মহাভারতানুসারে পাণ্ডবরা বেশ কিছুকাল শোণিতপুরে কাটিয়ছিলেন। কথিত আছে, সেই সময় মহাবলী ভীম শ্রীখণ্ড মহাদেব পর্বতের উপর একটি বিশাল শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করেন। মহাদেবের সাথে সাথে প্রকট হলেন সূর্যদেবও। পর্বতের শরীর কালচে সবুজ রঙের। বরফে ঢাকা শীর্ষ দেশ সূর্যের আলো পড়ে সোনালি। সবুজ-কালো-খয়েরি নকসা কাটা আলখাল্লা গায়ে মাথায় সোনার মুকুট পরে বসে আছেন গিরিরাজ। স্ত্রী–র কথাই ঠিক। এই সৌন্দর্যের টানে সব কষ্টই সহ্য করা যায়। বারে বারে ফিরে আসা যায় এই পাহাড়ি গ্রামে।‌

জনপ্রিয়

Back To Top