উদ্দালক ভট্টাচার্য
দার্জিলিং এখন আর সুন্দরী নেই। বড় ভিড়। তবু আমি আবার, বছরে একবার অন্তত সুযোগ পেলেই দার্জিলিং যাব। এটাই বোধ হয় জাদু পশ্চিমবঙ্গের উত্তরের এই পাহাড়ি শহরের। ধোঁয়া, ধুলো, জানুয়ারি মাসের হাড় কাপানো ঠান্ডা, রাস্তার ধারে পড়ে থাকা জঞ্জাল, গাড়ির বাড়বাড়ন্ত, বাঙালি পর্যটকের আদিখ্যেতা, এ সব কিছুই গায়ে মাখে না দার্জিলিং। অনেক ঠাটবাটে চলা স্টাইল আইকন অষ্টাদশীর মতো। 
জানুয়ারি মাসের ১৩ তারিখ, প্রেয়সী দার্জিলিং মেলের রাতভর সফর সেরে সক্কাল সক্কাল নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে নামলাম। আকাশে মেঘ, ঠান্ডা কলকাতার মতোই। গাড়ির কথা আগে থাকতেই বলা ছিল। আমাদের দলের তিন সদস্য তিস্তা তোর্ষা এক্সপ্রেসে ভোর রাতে এম এনজেপি পৌঁছে আপেক্ষা করছিলেন আমাদের জন্য। আমরা বাকি চারজন পৌঁছতেই গাড়িরতে শিলিগুড়ি বাজারের চেনা মহল্লা ছেড়ে কার্শিয়াংয়ের রাস্তা ধরে দার্জিলিয়ের জন্য রওনা দিলাম। মাঝে কার্শিয়াঙের বাসস্ট্যান্ডে সকালের খিদে মেটাতে পেট ভরে খেয়ে নিলাম স্যান্ডুইচ আর মোমো। কয়েক মিনিট সেখানে ছবি তোলাও হল। পাহাড়ের স্বাদটা ওখানেই যেন প্রথমবারের জন্য পেলাম। একদিকে মেঘে ঢাকা হিমালয়ের আভাস, রাস্তায় পাহাড়ের লোমশ কুকুর। পাহাড়ে বেড়াতে গেলেই বাকি দর্শনীয় জিনিসের মতোই আমার চোখ চলে যায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো মালিকানাহীন এই সুন্দর সারমেয়দের দিকে। তাঁদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে মেঘ ও স্যাঁতসেঁতে দিনের পাহাড়ি রাস্তা পেরিয়ে গাড়ি পৌঁছে গেল দার্জিলিঙে। ওরে বাব্বা, সে কী প্রচণ্ড ঠান্ডা। হোটেলে ঢুকলাম, কীভাবে এই কামড় দেওয়া ঠান্ডা থেকে বাঁচব সবাই, সেটাই বুঝতে পারছি না। একবার বিছানায় রাখা লেপের তলায় ঢুকছি, একবার গ্লাভস, টুপি সোয়েটার চাপিয়ে মনে মনে ভাবছি, ঠান্ডা কমার কথা। আধ ঘণ্টা কেটে গেল এভাবেই, তারপরেই এল বৃষ্টি। আশা করিনি, একদম না। হঠাৎ ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হল, সঙ্গে ছোট্ট ছোট্ট বরফ। হোটেলের বারান্দা থেকে হাত বাড়িয়ে দেখলাম, হাতের ওপর কয়েক সেকেন্ডে কুচি বরফ জমা হল। শুনলাম, ঘুম সেদিন বরফে ঢাকা। বাড়ি থেকে ছাতা হাতে বেরিয়ে পৌঁছে গেলাম ম্যালে, আকাশে তখনও কালো মেঘ। একদিক করে ঘুরতে ঘুরতেই কেটে গেল অনেকটা সময়। কিছুক্ষণ অপেক্ষা, ম্যাল থেকে হেঁটে কেভেন্টারস। গিয়ে দেখি, গাদাখানেক চেনা মুখ। মনটা খিঁচিয়ে উঠল। মেঘ, বৃষ্টি, মারাত্মক ঠান্ডা, কলকাতার লোক, ঠিক যা যা চাইনি, প্রথম দিনেই এক সঙ্গে সব কিছু। যাক, এদিক সেদিক করে কেটে গেল প্রথম রাত। 
পরের দিন, ঠিক হল আমরা চিড়িয়াখানায় যাব। তার আগে গ্লেনারিজে খাওয়াদাওয়া। সোজা পৌঁছে গেলাম গ্লেনারিজ। দার্জিলিঙের সবচেয়ে সুন্দর ও রোম্যান্টিক রেস্তোরাঁ এই গ্লেনারিজ। হ্যাঁ, কেভেন্টার্সের থেকেও ভাল। দ্বিতীয় দিন, ঠান্ডাটা সামান্য গায়ে সয়েছে। হালকা রোদও উঠেছে। গ্লেনারিজের বারান্দায় হালকা রোদ এসে পড়েছে। আমরা এলাম, বসলাম বারান্দায়। একে একে, বার্গার, স্যান্ডুইচ, সসেজ, এবং শেষে ব্রাউনি উইথ আইসক্রিম। গরম ব্রাউনির গায়ে বেয়ে ধবধবে সাদা আইসক্রিমের স্কুপ গলে পড়ছে। মাথায় চরকা কাটা চটলেট সস। বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর দেখতে খাবার যদি কিছু থাকে, সে তালিকায় এই পদের জন্য গ্লেনারিজের নাম উঠতেই পারে। একবার নয়, লোভে পড়ে আমরা দুটো করে ব্রাউনি খেয়ে নিলাম। ছাড়তেই ইচ্ছা করছিল না, যাই হোক পেট ভরে গেল। হেঁটে চললাম চিড়িয়াখানার জন্য। তেমন লোক নেই, কিছু সিকিমের পর্যটক ও কিছু বিদেশি পর্যটকের আনাগোনা। এখানে বাঙালি নেই বললেই চলে। চিড়িয়াখানর প্রায় প্রতিটি পশুই বেশ প্রাণবন্ত। দার্জিলিঙের প্রাণকেন্দ্র ম্যাল থেকে আধঘণ্টা পায়ে হেঁটে পৌঁছে যাওয়া যাবে চিড়িয়াখানায়। দরকার হলে গাড়িও নিতে পারেন। পথের শোভা উপভোগ করব বলেই আর গাড়ির কথা ভাবিনি আমরা। বিকেলে ৪ টের সময় বন্ধ হয়ে গেল চিড়িয়াখানা। সূর্য তখন ঢলে পড়েছে। আমরাও কিছুটা ক্লান্তি নিয়ে ধীর পথে ম্যালের দিকে ফিরতে শুরু করলাম। ফিরতে ফিরতে অন্ধকার হয়ে গেল। ব্রিটিশ কায়দায় বানানো বাড়িগুলোর ভিতরে টিমটিমে আলো, পথে তেমন আলোই নেই। ভুতের মত আমরা ৭ জন হেঁচে চলেছি রাস্তায়। পাহাড়ের ওদিকে এক এক করে ফুটে উঠেছে আলো। একটা গোটা শহর তখন জ্বলছে জোনাকির মতো। পথে মাঝে মাঝে হেডলাইট জ্বেলে আমাদের পেরিয়ে যাচ্ছে গাড়ি। আঁধারের দার্জিলিঙে নীরবতা ফিসফিস করে কথা বলছিল আমাদের সঙ্গে। এমন হাঁটা পথ একমাত্র সন্ধ্যাতেই মেলে, পাহাড়ে। 
তৃতীয় দিন। যাব হ্যাপি ভ্যালি চা বাগানে। আমাদের ৭ জনের সকলেরই ভিড় এড়িয়ে কোথাও একটা দিন কাটানোর ইচ্ছা ছিল। যাই হোক, সকাল সকাল ঘুম ভাঙার পরেই বিছানায় শুয়ে শুয়েই আমরা তিনজন পরিকল্পনা করছিলাম, কোথায় কী হবে আজ। হঠাৎ, পাশের ঘরে এক সঙ্গী ছুতে ছুটে এসে ধাক্কা দিল দরজায়। হুড়মুড় করে বারান্দায় বেরিয়ে দেখলাম, মেঘ সরে গেছে। খুলে গেছে পাহাড়। সফরের শেষ দিনে এসে, সেই সাধও পূর্ণ হল। খোলা আকাশে ঝলমলে কাঞ্চনজঙ্ঘা মন ভরিয়ে দিল। সোনালি পাহাড় এমন সুন্দর হতে পারে, ভাবনাতেও আসে না। রওনা দিলাম হ্যাপি ভ্যালির জন্য। প্রায় ১ ঘণ্টা হাঁটা পথ। সবটাই ঢালু, তাই আনন্দে পেরিয়ে যেতে সমস্যা হল না। আমি ও আমার এক সঙ্গী প্রথমবার চা বাগান দেখছি। প্রায় ছুটতে ছুটতেই পৌঁছে গেলাম হ্যাপি ভ্যালিতে। যাক, এখানে হাতে গোনা দু’–একজন স্থানীয় লোক ছাড়া আর কেউ নেই। শান্ত চা বাগানের একদিকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়। সাধ পূর্ণ হল, ঘণ্টা দুয়েক কাটিয়ে ফিরে এলাম মলে। ফের রাতের গ্লেনারিজে বারান্দায় হাজির হলাম। প্রায় ঘণ্টা দুয়েক, রাত ৯টা পর্যন্ত বসে রইলাম। শহরটা ঝিমিয়ে এল। আমরা তিন জনে বসে রইলাম তবু। কেউ চলে যেতে বলল না। দার্জিলিঙের শেষ দিনটা এত সহজে ছেড়ে যাই কী করে?‌

পরের দিন সকালে উঠেই সোজা চলে গেলাম টয়ট্রেনে চড়তে। টিকিটও পাওয়া গেল সহজে। ৭ বান্দা এক সঙ্গে বাতাসিয়া লুপ হয়ে ঘুম পর্যন্ত সফর হবে। ট্রেনে মাত্র ৭ জনই, আমরা ৭ জন। ভিড় নেই, লোক নেই। দুদিন আগেই খবর পেয়েছি, দুর্ঘটনার কবলে পড়েছিল টয়ট্রেন। তবু, মজা হল দেদার। ফিরে এলাম। আর কয়েক ঘণ্টা পরেই ছাড়তে হবে শহর। গাড়ি এল, চালক বললেন, এক অন্য রাস্তা দিয়ে আপনাদের নিয়ে যাব, রোহিণী। চলল গাড়ি। পথে চলতে চলতেই কুয়াশা ঘিরে এল রাস্তায়া। চালক বললেন, এনেকটা বেশি সময় লেগে যাবে, কুয়াশার জন্য গাড়ির গতি কম রাখতে হচ্ছে। যাক গে, সেই কম গতিতেই চলল গাড়ি। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নেমে এল। রোহিণীর পথ তখন অন্ধকার হয়ে উঠেছে। মিশকালো পথ। কার্শিয়াঙের দিক থেকে দার্জিলিং যাওয়ার থেকে অনেক আকর্ষণীয় এই রোহিণীর পথ। সেখানে রোমাঞ্চ আছে ষোলো আনা। পরের বারে, কার্শিয়াঙের থেকে কয়েক মিনিটের দূরত্বে থাকা রোহিণীতে রাত কাটানোর একটা অপূর্ণ ইচ্ছা নিয়েই পথ পেরিয়ে সমতলে নেমে এলাম। ছুটি শেষ। রাতটা ট্রেনে কাটিয়ে বাড়ি ফিরব। পরের দিন ফের কলকাতার বাসে চেপে অফিস। দার্জিলিঙের আমাকে মনে থাকবে না, কিন্তু আমার মনে একটা গোলাপি দাগের মতো থেকে যাবে পাহাড়ি শহর। ওই রাতের শহরের ফিসফিস করা কথাগুলো বাজবে কানের পাশে।  

জনপ্রিয়

Back To Top