তরুণ রায়চৌধুরি
অনেকদিন পর আবার বারাণসী। এবারে আসা অমৃতসর এক্সপ্রেসে। স্টেশনে আমাদের সঙ্গে দুজন দেখা করতে এসেছেন। অটো করে ওনাদের সঙ্গে প্রথমে গেলাম লঙ্কা। তবে লঙ্কায় গেলে সবাই যে রাবণ হয় সেটা ঠিক নয়। কিন্তু কেউ কেউ হয়। যেমন এবার অটো-চালক হল। ভাড়া নেওয়ার জন্য ওকে ১০০ টাকা দেওয়া হয়েছে। সে খুচরো না থাকার অজুহাত দেখায়। যাতে সেই টাকার বাকি অংশ ফেরত দিতে না হয়। রাম পাশেই ছিলেন রিকশাচালকের বেশে। রাবণের এ ধরনের ছ্যাঁচরামো তাঁর পছন্দ হয় না। একটুও সময় নষ্ট না করে সে আমাদের ১০০ টাকা ভাঙিয়ে দেয়। আমরা অটোর ভাড়া মেটাই। লঙ্কা থেকে আরেকটা অটোতে চললাম দশাশ্বমেধ-ঘাটের কাছে। ওখানেই হোটেলে উঠব। তারপর চটপট স্নান সেরে পনিরের টুকরো মেশানো মশলাধোসা আর গরম চায়ে দারুণ ব্রেকফাস্ট। এখন যাব প্রায় ১২ কিমি দূরে সারনাথ। 
গঙ্গার পাড় বাঁধিয়ে বারাণসীতে তৈরি হয়েছে অসংখ্য ঘাট। অসি ঘাটের কাছে গঙ্গার সঙ্গে মিশেছে অসি নদী। এখানকার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘাট হল মণিকর্ণিকা ঘাট, মানমন্দির ঘাট, রাজেন্দ্রপ্রসাদ ঘাট, দশাশ্বমেধ ঘাট, দ্বারভাঙ্গা ঘাট, চৌষট্টি ঘাট, কেদার ঘাট, হরিশ্চন্দ্র ঘাট ইত্যাদি। সত্যজিৎ রায়ের জয়বাবা ফেলুনাথ ছবিতে বেনারসের নানা জায়গার মধ্যে দ্বারভাঙ্গা ঘাটও রয়েছে। এই ঘাটেই তোলা হয়েছিল ফেলুদার কেরামতিতে প্রাচীন মূর্তি চোরাকারবারি মগনলাল মেঘরাজের পুলিসের হাতে ধরা পড়ার দৃশ্য। 
বারাণসীর অন্যতম আকর্ষণ কাশী বিশ্বনাথ মন্দির। এই মন্দিরেই আছে দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম জ্যোতির্লিঙ্গটি। ইতিহাসের পাতায় পাতায় লেখা আছে বহুবার এই মন্দিরের ভাঙাগড়ার কাহিনী। মোগল সম্রাট ঔরঙ্গজেব সেই মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের ওপর তৈরি করেছিলেন জ্ঞানভাপি মসজিদ। পরবর্তীকালে এই মন্দিরকে নতুন করে নির্মাণ করেন ইন্দোরের রানীমাতা অহল্যাবাই হোলকার। মন্দিরের দুটি চূড়া সোনা দিয়ে মুড়ে দেন পাঞ্জাবের মহারাজা রঞ্জিৎ সিংহ। পরদিন খুব ভোরে কাশী বিশ্বনাথ মন্দির দর্শন সারলাম। তার পর গাড়ি নিয়ে রামনগর হয়ে চুনার ঘুরে আরতির অনেক আগেই ফিরে এলাম দশাশ্বমেধ ঘাটে। পাঁচজন উঠে বসি নৌকোয়। তার আগে মাঝিদের সঙ্গে বিস্তর দর–কষাকষি। শেষে জনপ্রতি ৩০০ টাকায় রফা। শুরু হয় সান্ধ্য–জলবিহার। আলোয় সেজে ওঠা ঘাটগুলিকে মনে হয় যেন স্বপ্নপুরী। 
মৃত্যুর পর নশ্বর দেহ বারাণসীর কোনও ঘাটে পঞ্চভূতে বিলীন হলে জীবন–যন্ত্রণা থেকে চিরতরে মুক্তি পাওয়া যায়। যুগযুগান্ত ধরে ধর্মপ্রাণ মানুষদের এটাই বিশ্বাস। দূরে মণিকর্ণিকা ঘাটে চিতার আগুনের একাধিক শিখা। দাহ সংস্কারের জন্য বারাণসী ছাড়াও ভারতবর্ষের অনেক রাজ্যের মানুষ মণিকর্ণিকা ঘাটে আসেন। এ ঘাটে চিতার আগুন তাই কখনও নেভে না। অনেকক্ষণ আরতি দেখার পর আমরা গেলাম হরিশ্চন্দ্র ঘাটের কাছে। এখানেও চলছে মৃতদেহের সৎকার। এ সব দেখলে জীবনের হিসেব–নিকেশকে তুচ্ছ মনে হয়।
পরদিন সকালে গঙ্গার বুকে আবার নৌকো–সফর। কেদার ঘাটের কাছে মাঝনদীতে ইডলি আর সাম্বার বড়ার স্বাদ দারুণ লাগে। পাখিদের জন্যেও কেনা হয়েছে এক প্যাকেট ঝুরিভাজা। মাঝির ডাকে উড়ে আসে পাখির দল। সোনালি রোদ গায়ে মেখে নতুন রূপে ধরা দেয় সন্ধের সেই ঘাট। দেখতে দেখতে দুটো দিন কীভাবে যে চলে গেল বুঝতে পারলাম না। আজই ফেরার ট্রেন সন্ধে ৭:‌১৫ মিনিটে। সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে বারাণসী গঙ্গার পবিত্র জল। 
জলের পাত্র হাতে হোটেল থেকে আবার রওনা দিই দশাশ্বমেধ ঘাটের দিকে। মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় শুরু হয় ম্যারাথন ছবি তোলা। রাস্তাঘাট, দোকানপাট, মানুষ বা অন্য কোনও প্রাণী কিছুই বাদ যায় না। একটা ষাঁড়ের পিছু নিয়ে চলে আসি মান মহলের প্রবেশপথে। এখানেই আছে অম্বরের মহারাজা সোয়াই দ্বিতীয় জয় সিংহের তৈরি সারা ভারতে পাঁচটি মান মন্দিরের একটি। সময় এবং গ্রহ– নক্ষত্রের অবস্থান জানার জন্য মান-মহলের ছাদে বসানো হয়েছিল ছয় রকমের যন্ত্র। সবচেয়ে বড় যন্ত্রটির নাম সম্রাটযন্ত্র। টিকিট কেটে ঢুকে পড়ি ভিতরে। জ্যোতির্বিজ্ঞানের অনেক কিছুই জানা গেল এখানে। আরও কত কিছু যে জানার আছে কে জানে।  
ছাদ থেকে দেখা যায় গঙ্গার আরেক রূপ। ঘাটের কাছে বাঁধা অসংখ্য নৌকো। সূর্য এখন দিগন্ত ছেড়ে অনেক উঁচুতে। আমার অত্যাধুনিক ঘড়িতে সময় এখন ঠিক বেলা ১১:‌২০ মিনিট হয়ে ৩৮ সেকেন্ড। সম্রাটযন্ত্রটির ত্রিভুজাকার অংশের ছায়া পড়েছে বাদিকে। বাঁকা স্কেলের ওপর ফুটে ওঠে সময়ের ছবি। অতীত আর বর্তমান মিলেমিশে এক হয়ে যায়।  

সব ছবি: তরুণ রায়চৌধুরি‌

ব্যাকপ্যাক

কলকাতা থেকে বারাণসী যাওয়ার অনেক ট্রেন আছে। কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ট্রেন – ১৩০০৫ অমৃতসর মেল, ১৩১৩৩ শিয়ালদা–‌‌বারাণসী এক্সপ্রেস, ১৩০৪৯ অমৃতসর এক্সপ্রেস, ১২৩৩৩ বিভূতি এক্সপ্রেস। ভাড়া : ১এ- ২,৫৭০, ২এ-‌ ১,৫২০, ৩এ-‌ ১,০৫৫ এবং স্লিপার- ৩৮৫ টাকা। ১৯ নং জাতীয় সড়কপথে কলকাতা থেকে বারাণসীর দূরত্ব প্রায় ৬৮২ কিমি। থাকার জন্য বারাণসীতে বিভিন্ন মানের অনেক হোটেল আছে। আরও জানতে ‘‌সফর’‌ ক্রোড়পত্রে নজর রাখুন।
 

জনপ্রিয়

Back To Top