রাজীব চক্রবর্তী, দিল্লি: টিভিতে চন্দ্রযান এবং পাকিস্তান। সেখান থেকে চোখ ঘোরালে আম আদমি পকেটে টান অনুভব করছেন। দেশের করুণ অর্থনীতি এবং তার শ্লথগতি নিয়ে সরকার ও বিরোধী পক্ষের টানাপোড়েন অব্যাহত। পরিসংখ্যান বলছে, আগস্ট মাসের চেয়েও বেহাল দশা সেপ্টেম্বরের প্রথম ১০ দিনে। অর্থনীতিবিদরা চিন্তিত। সমাধানের সূত্র হিসেবে আয়ের বৈষম্য দূর করার পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু সে সব কানে তুলতে নারাজ সরকার। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া বলছে, নগদের সমস্যা নেই। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন অর্থনীতির শ্লথগতি ব্যাপারটাই মানতে নারাজ। সমস্যা রয়েছে, তা না মানলে সমাধানের প্রশ্নই ওঠে না। গতকালই অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন বলেছেন, এখন মানুষ নিজে গাড়ি কেনার বদলে ওলা, উব্‌রে চড়তে পছন্দ করছে। তাই গাড়ির বাজার মন্দা। সেই নিয়ে সরব সোশ্যাল মিডিয়া থেকে বিরোধী নেতারা।
‌চলতি অর্থবর্ষের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকের (‌জুলাই–‌‌সেপ্টেম্বর) ফলাফল জানা যাবে এ মাসের শেষে। আশঙ্কা, এপ্রিল–‌জুন ত্রৈমাসিক হিসেবকেও না লজ্জা দেয় তা। ধুঁকছে অটোমোবাইল শিল্প। স্তব্ধ ভোগ্যপণ্য থেকে নির্মাণ সামগ্রীর বেচাকেনা। টুথপেস্ট, তেল, সাবান, শ্যাম্পু, চা, বিস্কুট—‌ সব কিছুর বিক্রি কমেছে। লোকসান বেড়েছে ডাবর, ব্রিটানিয়া, হিন্দুস্থান লিভারের মতো কোম্পানিগুলিরও। ফল হিসেবে অসংগঠিত ক্ষেত্রে সবার আগে ছাঁটাই শুরু হয়েছে। এখন সংগঠিত ক্ষেত্রেও দুরবস্থা। কর্মহীন হচ্ছেন বহু মানুষ। সরাসরি এর প্রভাব পড়ছে বাজারে।
দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘‌সেন্টার ফর ইকনমিক স্টাডিজ অ্যান্ড প্ল্যানিং’ বিভাগের অধ্যাপক সুরজিৎ মজুমদার ‘‌আজকাল’‌কে বলেছেন, ‘‌বেশ কিছুদিন ধরেই দেশে শিল্প ও অর্থনীতির বিকাশে শ্লথগতি ছিল। রপ্তানি থমকে গিয়েছিল। শুধুমাত্র কয়েকটি ক্ষেত্রের ওপর ভর করে চলছিল। সেই সময় সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো ও বেসরকারি বিনিয়োগে উৎসাহ দেওয়ার পরিবর্তে নোট বাতিল করা হল। অসম্পূর্ণ জিএসটি চালু করা হল। এমনকী গবাদি পশু বেচাকেনায় রাশ টানা হল। স্বভাবতই তার প্রভাব পড়ল দেশের অর্থনীতির ওপর। সেই শ্লথগতি এখন ভয়ঙ্কর আকার নিয়েছে। এই পরিস্থিতি আরও কঠিন ভবিষ্যতের ইঙ্গিতবাহী। অবিলম্বে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা না নিলে মন্দা অবশ্যম্ভাবী।’‌ অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশে ১০ শতাংশ মানুষ অর্থনৈতিক বৃদ্ধির সম্পূর্ণ লাভ পাচ্ছেন। বাকি ৯০ শতাংশের পকেট কার্যত শূন্য। এই বৈষম্য দূর করতে না পারলে বেশিরভাগ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা তৈরি হবে না। সুরজিতের মতে, সমাধান দু’‌ভাবে হতে পারে। স্বল্পকালীন ও দীর্ঘমেয়াদি পথ। প্রথমত, সরকারকে নিজে ব্যয় করতে হবে। সেটা অবশ্যই ভর্তুকিতে নয়। বরাদ্দ করতে হবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং পরিকাঠামোর মতো ক্ষেত্রে। তাহলে কর্মসংস্থান হবে, চাহিদা তৈরি হবে। বাজারে গতি আসবে। দীর্ঘকালীন সমাধান হিসেবে ১০ শতাংশ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে বাকি ৯০ শতাংশের মধ্যে নিয়ে যেতে হবে। সেজন্য সরকারের উচিত কর ব্যবস্থায় সংশোধনী এনে বিত্তবানদের কাছ থেকে কর নিয়ে গরিব মানুষের জন্য ব্যয় করা। আয়ের সামঞ্জস্য হঠাৎ করে বাস্তবায়িত হবে না। তবে, এটা সরকারের কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে। কিন্তু, সরকার অর্থনৈতিক শ্লথগতি মানতে নারাজ। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপকের কথায়, ‘‌সরকারের এই মনোভাব তাদের ‌‘‌মেক ইন ইন্ডিয়া’‌র মতো প্রকল্পের প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, বাজার মন্দা হলে, চাহিদা তৈরি না হলে বেসরকারি বিনিয়োগ আসা সম্ভব নয়। তা সে মারুতি গাড়ি হোক বা পার্লে জি বিস্কুট হোক, কেউই নতুন করে বিনিয়োগ করতে চাইবে না।’‌
অভিষেক মনু সিংভির কটাক্ষ, তাহলে ওলা, উব্‌রের জন্যই সব শেষ হয়ে গেল!‌ অর্থনীতির এই বেহাল দশার জন্য আপনারা কি বিরোধীদের দায়ী করবেন? যুবকরা চাকরি পাচ্ছে না। সেজন্য কি বিরোধীরা দায়ী? তাহলে ওলা, উব্‌রের জন্যই সব শেষ হয়ে গেল!‌ মোদির সরকার জনগণকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ভারতকে ৫ লক্ষ কোটি ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছে দেবে। তা কীভাবে সম্ভব হবে?‌ নরেন্দ্র মোদি, নির্মলা সীতারামন এবং জনগণের অর্থনৈতিক ভাষাকে তিনি যথাক্রমে ‘মোদিনমিক্স’, ‘নির্মলানমিক্স’ এবং ‘পাবলিকোনমিক্স’ আখ্যা দিয়েছেন।
অর্থনীতিবিদদের একটা অংশের মতে, ভারতে অর্থনীতির সমস্যা শুরু হয়েছে গ্রামীণ ভারত থেকে। এর সমাধানও লুকিয়ে রয়েছে গ্রামীণ ভারতেই। কৃষকের আয় বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি। বরং আয় কমেছে। সবজি মান্ডি বা কিসান মান্ডিগুলিতে নগদের অভাব মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। কৃষককে স্বস্তি দিতে সবার আগে ‘‌ক্যাশলেস’‌ বন্দোবস্ত থেকে বেরিয়ে বাজারে ‌নগদের ব্যবহার ফেরাতে হবে। তারপর নজর দিতে হবে কৃষকের আয়ের প্রতি।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top