Durga Puja 2021: ধর্ষণের আতঙ্ক নিয়ে গত পুজোটা কেটেছিল হোমেই, এবার ঠাকুর দেখবে পায়েল

বিভাস ভট্টাচার্য: শর্ত হয়েছে। যে আগে উঠবে সে বাকিদের ঘুম থেকে তুলে দেবে। সকাল সকাল উঠতে আর কারও কোনও দুশ্চিন্তা নেই। সবাই স্কুলের বন্ধু। পাড়া বা আশেপাশেই থাকে। ফলে এবছর দল বেঁধে ভোরে উঠে টুক করে বাকিদের সঙ্গে ফুল তোলার পাশাপাশি প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঢুঁ মেরে আসছে পায়েল (নাম পরিবর্তিত) ও তার সঙ্গিরা। বাড়ি ফিরে টুকটাক ঘরের কাজ সেরে ফের বিকেলের জন্য তৈরি হওয়া। ঠাকুর দেখতে বেরোতে হবে যে। পুজোটা এবার সত্যিই পায়েলের কাছে আনন্দের। 
অথচ এর আগের বছরের পুজোটা ছিল রীতিমতো অজানা। কবে আসল, কবে গেল সেটা বোঝাও যায়নি। কারণ, পাচারকারীদের থেকে উদ্ধার হওয়ার পর বাকি দিদিদের সঙ্গে তাকেও রাখা হয়েছিল একটি হোমে। সেখান থেকে অবশেষে বাড়ি ফেরা এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার জন্য সমাজের বিরুদ্ধে প্রাণপণ লড়াই। আস্তে আস্তে কিছুটা থিতু হওয়া। 
পায়েলের কথায়, 'হোম থেকে ফিরে আসার পর এলাকার সবাই আমার দিকে অন্য রকমভাবে তাকাতে শুরু করল। যেন আমি একটা দেখার জিনিস। দীর্ঘদিন স্কুলে না যাওয়ার জন্য স্কুল থেকেও নাম কেটে দিয়েছিল। ওয়ার্ল্ড ভিশন ইন্ডিয়া'র সহযোগিতায় এখন আমি আমার স্কুলে ক্লাস নাইনে ভর্তি হয়েছি।' 
দক্ষিণ ২৪ পরগণার সুভাষগ্রামে বাড়ি পায়েলের। দুই বোনের মধ্যে সে ছোট। দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। বাবা মৃত। কষ্ট হলেও মেয়েকে লেখাপড়া শেখাতে স্কুলে ভর্তি করেছিল তার মা। অসুস্থতার কারণে মা চাকরিটা ছেড়ে দেয়। ফলে সংসার আর মায়ের চিকিৎসার খরচ জোগাতে ১৪ বছরের পায়েল চাকরি খোঁজা শুরু করে। পাড়ারই এক দিদি তাকে চাকরির টোপ দিয়ে নিয়ে গেছিল ওই জেলার গোচরণ রেল স্টেশনের কাছে এক জনের বাড়িতে। দিনটা ছিল ২০১৯ সালের ৯ ডিসেম্বর।
স্টেশনের পাশেই একটা বড় বাড়িতে পাশাপাশি অনেকগুলো ঘর। বিভিন্ন বয়সি দিদিরা আছে।‌ কিন্তু কেন যেন জায়গাটা ভালো লাগেনি। বেরিয়ে আসার চেষ্টায় পায়েল জানায় সে আগামীকাল আসবে। কিন্তু ততক্ষণে বাড়িটার মূল দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। একটা ঘরে ঢুকিয়ে তাকে পরপর ছ'জন ধর্ষণ করে। অজ্ঞান হয়ে গেছিল। শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে যখন  জ্ঞান আসে, তখন বুঝতে পারে সে এখন খাঁচাবন্দি। বাইরে লোহার শক্ত জাল। যন্ত্রণাকে সঙ্গে নিয়ে শুরু হয় তার একদিন প্রতিদিন। 
স্থানীয় সূত্রে খবর পেয়ে ২০২০ সালের জুন মাসে বারুইপুর জেলা পুলিশ গোচরণের ওই বাড়িতে অভিযান চালায়। উদ্ধার হয় পায়েল সহ পাচার হওয়া বাকি মেয়েরা। গ্রেপ্তার হয় বাড়ির মালিক ও তার সাঙ্গোপাঙ্গোরা। সকলেই আশ্রয় পায় বারুইপুরের একটি হোমে। ক্যালেন্ডারের নিয়ম মেনে আসে দুর্গাপূজা। 
পায়েলের কথায়, 'শুনেছিলাম দুর্গাপূজা হচ্ছে। মাঝে মাঝে ঢাকের আওয়াজও পেতাম। ভালো লাগত না। সারাক্ষণ একটা আতঙ্ক তাড়া করত। কবে পুজো এল আর কবে সেটা চলেও গেল কিছুই বুঝতে পারিনি। বোঝার মতো মানসিক অবস্থাও ছিল না।' এরপর যোগাযোগ হয় পাচার হওয়া মেয়েদের জন্য কাজ করা ওয়ার্ল্ড ভিশন ইন্ডিয়া নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে। তাদের সহযোগিতায় ঘরে ফিরে আসে পায়েল। ফিরে এসেও শুরু হয় এক নতুন লড়াই। এলাকার লোকের কৌতুহলের মুখোমুখি হওয়া।
ওয়ার্ল্ড ভিশনের পক্ষে সুলগ্না সরকার বলেন, 'মেয়েটি স্কুলছুট হয়ে গেছিল। আমরা কথা বলে ওকে আবার ভর্তি করেছি। এক্ষেত্রে সব থেকে যেটা বড় হয়ে দাঁড়ায় সেটা হল এদের সামাজিক লড়াই। ঘটনার পেছনে যে মেয়েটির কোনও দোষ নেই সেটা অনেকেই বুঝতে চান না। লোকে বিষয়টি নিয়ে নানারকম মনগড়া গল্প ফেঁদে বেড়ায়।' সামাজিক লড়াইটা যে ভীষণ বড় হয়ে দাঁড়ায় সেটা শোনা গেছে বারুইপুর পুলিশ জেলার মহিলা পুলিশ আধিকারিক কাকলি ঘোষ কুণ্ডুর মুখেও। তিনি বলেন, 'পায়েলকে চিনি। আমাদের জেলা পুলিশ ওকে উদ্ধার করেছিল। খবর পেলেই আমরা পাচারকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাই। উদ্ধারের পর সামাজিকভাবে ওকে বা ওর মতো বাকিদের ভালো রাখাটাও একটা শক্ত চ্যালেঞ্জ। তবে খুব ভালো লাগছে মেয়েটি এবার নতুন জামা পড়ে প্রতিমা দেখতে বেরিয়েছে। তার মানে ও লড়াইটা জারি রেখেছে।' 
বন্ধুরা এসে গেছে। পায়েলের হাতে আর সময় নেই। তাড়াতাড়ি বেরোতে হবে। ঠাকুর দেখার পাশাপাশি দল বেঁধে ফুচকা খাওয়াটাও কিন্তু তার কাছে একটা বড় কাজ।