Brazil-Croatia: ট্র্যাজিক নায়ক নেইমার! টাইব্রেকারে অকাল বিসর্জন ব্রাজিলের, শেষ চারে ক্রোয়েশিয়া

ক্রোয়েশিয়া - (১) (পেটকোভিচ)

ব্রাজিল - (১) (নেইমার)

আজকাল ওয়েবডেস্ক: দর্প চূর্ণ ব্রাজিলের। এবারও হল না। ২০ বছরের অপেক্ষা দীর্ঘায়িত হল। শুক্রবার এডুকেশন সিটি স্টেডিয়ামে টাইব্রেকারে ক্রোয়েশিয়ার কাছে ৪-২ গোলে হেরে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেই ছিটকে গেল ব্রাজিল। পরপর দু'বার শেষ আট থেকে বিদায়। সেমিফাইনালে মডরিচরা। মাঠেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন নেইমার। দিন তিনেক আগে যে দলকে সাম্বা নাচতে দেখা গিয়েছিল, সেই ফেভারিটরাই আজ আন্ডারডগদের কাছে হেরে অকাল বিসর্জনে। গোটা ম্যাচে খেলল ব্রাজিল, জিতল ক্রোয়েশিয়া। আবার কোয়ার্টার ফাইনাল। আবার টাইব্রেকার। আবার মডরিচদের পেনাল্টি শুটআউটে একশো শতাংশ রেকর্ড। এর আগে বিশ্বকাপের তিনটে টাইব্রেকার জেতার নজির ছিল ক্রোটদের। সেই ধারাই অব্যাহত থাকল। টাইব্রেকারে ক্রোয়েশিয়ার হয়ে গোল করেন ভ্লাসিচ, মাজের, মডরিচ এবং অরসিচ। অন্যদিকে জাপানের পর এদিনও অনবদ্য ডমিনিক লিভাকোভিচ।‌ শুরুতেই রদ্রিগোর শট বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে বাঁচান ক্রোয়েশিয়ার গোলকিপার। দ্বিতীয় শটে গোল করেন ক্যাসেমিরো। তৃতীয় শটও গোলে রাখেন পেদ্রো। কিন্তু চতুর্থ শট পোস্টে মেরে ব্রাজিলের স্বপ্ন জলাঞ্জলি দেন মারকুইনহোস। নব্বই মিনিট গোলশূন্য থাকার পর অতিরিক্ত সময় স্কোরলাইন ১-১। অবশেষে টাইব্রেকারে বিপত্তি। ব্রাজিলকে পেনাল্টি শুট আউট পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার ছক কষে নেমেছিল ক্রোয়েশিয়া। পরিকল্পনায় সফল দালিচ। তবে দ্বিতীয়ার্ধে যা সুযোগ পেয়েছিল ব্রাজিল, ম্যাচ ৯০ মিনিটেই শেষ হয়ে যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু এদিন ফুটবল দেবতা ব্রাজিলের সঙ্গে ছিল না। আজ দোহায় ম্যাচ শুরুর আগে অসময়ে দুই এক পশলা বৃষ্টি পড়ে। হয়তো কাতারের আকাশও আগাম অঘটনের‌ আন্দাজ পেয়েছিল। 

অতিরিক্ত সময় ব্রাজিলের পরিত্রাতা ছিলেন নেইমার। নবমবার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠার হাতছানি ছিল পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নদের। অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধের শেষলগ্নে সেই ম্যাজিক গোল এসেছিল।

১০৫+১ মিনিটে ডেডলক ভাঙেন নেইমার। বক্সের মাথায় বল ধরে পাকুয়েতার সঙ্গে ওয়ান টাচ খেলে শরীরের ঝাপটায় দুরন্ত ফর্মে থাকা লিভাকোভিচকে কাটিয়ে ডান পায়ের শটে দুরন্ত গোল ব্রাজিলীয় তারকার। দেশের জার্সিতে ৭৭তম গোল করে ব্রাজিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে ছুঁলেন পেলেকে। চার বছর আগে রাশিয়ায় বেলজিয়ামের কাছে হেরে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নিয়েছিল সেলেকাওরা। কাতারেও সেই অঘটনের আশা কেউ করেনি। এমনকী অতি বড় আর্জেন্টিনার সমর্থকরাও না। মনে হয়েছিল ম্যাচ টাইব্রেকারে গড়াবে না। কিন্তু ১১৭ মিনিটে পরিবর্ত ফুটবলার ব্রুনো পেটকোভিচের গোলে অবিশ্বাস্যভাবে ম্যাচে ফেরে ক্রোয়েশিয়া। এরপরও গোলের সুযোগ এসেছিল ব্রাজিলের সামনে। কিন্তু পরিত্রাতা সেই লিভাকোভিচ।‌ থিয়াগো সিলভার শট বাঁচিয়ে দেন ক্রোয়েশিয়ার গোলকিপার। স্বাভাবিকভাবেই ম্যাচের নায়ক তিনি।  

নব্বই মিনিট গোলশূন্য। গোল লক্ষ্য করে ১৪টা শট ব্রাজিলের। তারমধ্যে ডমিনিক লিভাকোভিচের ন'টা সেভ! সবগুলোই দ্বিতীয়ার্ধে। অনবদ্য গোলকিপিং। নক আউটে‌ যেকোনও ক্রোয়েশিয়ান গোলকিপারের সর্বোচ্চ সেভ। প্রথমার্ধে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। কিছু ক্ষেত্রে ব্রাজিলকে টেক্কা দেয় ক্রোয়েশিয়া। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধ তিতের দলের। পুরোপুরি কোণঠাসা হয়ে যায় রাশিয়া বিশ্বকাপের রানার্সরা।‌ ব্রাজিলের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে হিমসিম খায় ক্রোটরা। শুধু গোলটাই হল না। সৌজন্যে লিভাকোভিচ। প্রথমার্ধে ব্রাজিলকে সমান টক্কর দেয় ক্রোয়েশিয়া। দক্ষিণ কোরিয়া ম্যাচের ঝড় তোলা দূরঅস্ত, খেলা তৈরির খুব বেশি ফাঁকা জমি পায়নি নেইমার, ভিনিসিয়াস, রাফিনহারা। দারুণ পরিকল্পিত হোমওয়ার্ক করা ফুটবল দালিচের দলের। চলতি বিশ্বকাপের ট্রেন্ড অনুযায়ী যা একেবারেই ভাবা যায়নি। সাধারণত কিছুটা রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলে ক্রোটরা।‌রক্ষণ জমাট করে সুযোগসন্ধানি ফুটবল যাকে বলে। কিন্তু এদিন ব্রাজিলের বিরুদ্ধে স্টাইল একেবারেই বদলে ফেলে। বল নিজেদের দখলে রাখার পাশাপাশি বেশ কয়েকবার আক্রমণেও উঠতে দেখা যায় পেরিসিচ, ক্রামারিচদের।

‌ মূলত ডান প্রান্ত দিয়ে দানিলোর দিক থেকে আক্রমণে উঠছিলেন মডরিচ, জুরানোভিচরা।‌ বার দুয়েক গোলের মতো পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছিল। ম্যাচের ১৩ মিনিটে জুরানোভিচের ক্রসে পা ছোঁয়াতে পারেনি পেরিসিচ। তবে ব্রাজিল বল পেলেই দ্রুত গতিতে আক্রমণে উঠছিল। মূলত নেইমার, ভিনিসিয়াস জুনিয়রের কাঁধে ভর করেই অ্যাটাক করছিল সেলেকাওরা। কিন্তু তাঁরা বল পেলেও দু'জন করে ঘিরে ধরছিল। ১৮ গজের বক্সের আগেই অধিকাংশ সময় ব্রাজিলীয়দের পা থেকে বল কেড়ে নেয় ক্রোটরা। ম্যাচের ৫ মিনিটের মাথায় ভিনিসিয়াসের শট সরাসরি তালুবন্দি করেন ক্রোয়েশিয়া গোলকিপার। প্রথমার্ধের শেষ মিনিটে নেইমারের ফ্রিকিক সরাসরি বিপক্ষ কিপারের হাতে যায়।

প্রথমার্ধে দক্ষিণ কোরিয়া ম্যাচের সেই গতি এদিন চোখে পড়েনি। বরং গোটা মাঠ জুড়ে পাসিং ফুটবল খেলে মডরিচরা। প্রথমার্ধে ব্রাজিলকে ছন্দ পেতে দেয়নি ক্রোয়েশিয়ার বুদ্ধিদীপ্ত গেম প্ল্যানিং। বিশ্বকাপের শেষ সাতটা ম্যাচের মধ্যে ছ'টাতে প্রথমার্ধে গোল করতে পারেনি ব্রাজিল। তারমধ্যে কাতার বিশ্বকাপে চারটে। তবে বিরতির পর আক্রমণের গতি বাড়ে ব্রাজিলের। ডানদিক থেকে ওভারল্যাপে উঠে ক্রোয়েশিয়া রক্ষণে চাপ সৃষ্টি করেন মিলিতাও। লিভাকোভিচ সজাগ না থাকলে ভারদিওলের আত্মঘাতী গোল হতে পারত। জাপানের বিরুদ্ধে তিনটে পেনাল্টি সেভ করার পর এদিনও গোলের নীচে অনবদ্য ক্রোয়েশিয়ান কিপার। একাধিক গোল বাঁচান। ম্যাচের ৫৫ মিনিটে রিচার্লিসনের পাস থেকে নেইমারের শট বাঁচায় লিভাকোভিচ। আবার দশ মিনিট পর পাকুয়েতার ওয়ান টু ওয়ান শট বাঁচান ক্রোট কিপার। ম্যাচের ৮০ মিনিটে ব্রাজিলীয় মিডিওর গড়ানো শট তালুবন্দি করেন লিভাকোভিচ। দ্বিতীয়ার্ধ পুরোপুরি ব্রাজিলের দখলে। বিরতির পর থেকে গতি বাড়িয়ে আগ্রাসী ফুটবল খেলে সেলেকাওরা।‌ কিন্তু ক্রোয়েশিয়ার দুর্গের শেষ প্রহরীকে পরাস্ত করতে পারেনি। একা নেইমারকেই চারবার রোখেন লিভাকোভিচ।‌ গোলের নীচে তিনি না থাকলে ব্রাজিলের হাই প্রেসিং ফুটবলে আগেই আত্মসমর্পণ করত ক্রোয়েশিয়া। কিন্তু কাতার বিশ্বকাপে দ্বিতীয়ার্ধে গোল না হজম করার ট্রেন্ড বজায় রাখে ক্রোটরা। লিভাকোভিচের দাক্ষিন্যে ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়ায়। বাকিটা ইতিহাস। 

আকর্ষণীয় খবর