আজকাল ওয়েবডেস্ক:‌ তাঁর গুরু মহিলাদের এতটাই শ্রদ্ধা করতেন, যে সেজন্য জাতিভেদ প্রথাতেও আমল দেননি। উপনয়নে ধনি কামারনীকে নিজের ভিক্ষামা রূপে গ্রহণ করেছিলেন। নিজের স্ত্রীর ষোড়শী পুজো করেছিলেন। সেই রামকৃষ্ণ পরমহংসের শিষ্য তিনি। তাই স্বামী বিবেকানন্দও যে নারীজাতিকে সম্মান করবেন, সেটা অনুমেয়। 
প্রায় একশো পঁচিশ বছর আগে দাঁড়িয়ে তিনি মনেপ্রাণে চেয়েছিলেন, মেয়েরা নিজের পায়ে দাঁড়াক। স্বাধীনভাবে উপার্জন করুক। এজন্য মেয়েদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন। এ বিষয়ে তাঁকে প্রভাবিত করেছিলেন আমেরিকার মেয়েরা। তাঁদের আত্মনির্ভরশীলতা, বুদ্ধির তীক্ষ্ণতা, মানসিক উদারতা স্বামীজিকে মুগ্ধ করে। 
নিঃসম্বল, নিঃসহায় অবস্থায় যখন তিনি আমেরিকায় গেছিলেন, তখন সেখানকার মহিলারাই তাঁকে সাহায্য করেছিলেন। এই কথা স্বামীজি আজীবন মনে রেখেছেন। তাঁর এক ভক্ত হরিপদ মিত্রকে তিনি লেখেন, ‘এ দেশের (আমেরিকার) স্ত্রীদের মতো স্ত্রী কোথাও দেখি নাই। সৎ পুরুষ আমাদের দেশেও অনেক, কিন্তু এদেশের মেয়েদের মতো মেয়ে বড়ই কম। এদের কত দয়া! যতদিন এখানে এসেছি, এদের মেয়েরা বাড়িতে স্থান দিচ্ছে, খেতে দিচ্ছে—লেকচার দেবার বন্দোবস্ত করে, সঙ্গে করে বাজারে নিয়ে যায়, কি না করে বলতে পারি না। শত শত জন্ম এদের সেবা করলেও এদের ঋণমুক্ত হব না। এদের মেয়েরা কি পবিত্র! ২৫ বৎসর ৩০ বৎসরের কমে কারুর বিবাহ হয় না। আর আকাশের পক্ষীর ন্যায় স্বাধীন। বাজার হাট, রোজগার, দোকান, কলেজ—সব কাজ করে, অথচ কি পবিত্র! যাদের পয়সা আছে, তারা দিনরাত গরিবদের উপকারে ব্যস্ত!’‌
এর পরেই নিজের সুপ্ত ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন স্বামীজি। ‘‌এরা রূপে লক্ষ্মী, গুণে সরস্বতী, আমি এদের পুষ্যিপুত্তর, এরা সাক্ষাৎ জগদম্বা, বাবা! এইরকম মা জগদম্বা যদি ১০০০ আমাদের দেশে তৈরি করে মরতে পারি, তবে নিশ্চিন্ত হয়ে মরব।’‌
এই কাজে তিনি ভগিনী নিবেদিতাকেও উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। ১৮৯৭ সালের ২৯ জুলাই একটি চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘ভারতের জন্য বিশেষত ভারতের নারী সমাজের জন্য পুরুষের চেয়ে নারীর একজন প্রকৃত সিংহিণীর প্রয়োজন।’ এই ডাকেই সাড়া দিয়ে নিজের স্বদেশ, স্বজন ছেড়ে ভারতে চলে এসেছিলেন নিবেদিতা। 
সমাজের মঙ্গলে নারীর ভূমিকা পুরুষের থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করতেন স্বামীজি। তিনি মনে করতেন নারী শক্তির সার্থক উদ্বোধনের ওপরই সমাজ, দেশ ও জাতির উন্নতি নির্ভর করছে। স্বামীজি তাঁর গুরুভাই স্বামী বিজ্ঞানানন্দকে একবার বলেন, ‘মাতৃশক্তিই হচ্ছে সমস্ত শক্তির কেন্দ্রবিন্দু। এই শক্তিরই এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সে এই দেশেই হোক বা অন্য দেশেই হোক। দেখছ না শ্রীশ্রীমা সেই ঘুমন্ত শক্তিকে জাগ্রত করবার জন্য এসেছেন। এ তো সবে শুরু, সমস্ত পৃথিবীতে এই মাতৃশক্তি কালে এক বিরাট রূপ নেবে।’
শিষ্যদের কথায়, ‘‌স্বামীজির চোখে পতিতা নারীও ছিলেন মহামায়ার অংশ স্বরূপিণী।’‌ তিনি বিশ্বাস করতেন নারী এবং পুরুষ, দু’‌জনেরই আত্মজ্ঞান লাভের অধিকার রয়েছে। একই সঙ্গে স্বামীজি চেয়েছিলেন নারীরা আত্ম-নির্ভরশীল হোক। তাঁর মতে, ‘‌সে জন্যও প্রয়োজন শিক্ষা এবং হাতের কাজ অথবা বিভিন্নরকম শিল্পকর্ম-শিক্ষা, লক্ষ্য রাখ প্রত্যেকটি মেয়ে যেন এমন কিছু জানে যাতে দরকার হলে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে।’ 

জনপ্রিয়

Back To Top