অনুপম বন্দ্যোপাধ্যায়, শান্তিনিকেতন: বিশ্বভারতীর নিরাপত্তায় কেন্দ্রীয় আধা সামরিক বাহিনী মোতায়েনের ‘‌সিদ্ধান্ত’‌ নিয়ে বিতর্কের জেরে বড়সড় অশান্তির প্রহর গুনছে শান্তিনিকেতন। রবীন্দ্রনাথের আশ্রম ভাবনার এই আন্তর্জাতিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাটিতে অস্ত্র হাতে, ভারী বুটের আওয়াজ তুলে আধা সামরিক বাহিনীর জওয়ানরা ঘুরে বেড়াবেন, কেন্দ্রীয় সরকারের এমন ‘‌সিদ্ধান্তে’‌ বিশ্বভারতীর শিক্ষক, ছাত্র–‌ছাত্রী, কর্মী থেকে আশ্রমিক, সব স্তর থেকেই উঠে এসেছে তীব্র আপত্তি। তঁারা মনে করছেন, বিশ্বভারতীতে এই ধরনের উদ্যোগ রবীন্দ্র–‌আদর্শ ও ঐতিহ্যের পরিপন্থী। যদিও বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষের তরফে এ পর্যন্ত এ ব্যাপারে প্রকাশ্যে কিছুই বলা হয়নি। 
একটি সংবাদ মাধ্যমের খবরকে কেন্দ্র করে এ নিয়ে শান্তিনিকেতনে অশান্তির সূত্রপাত হয় মাসখানেক আগে। খবরে দাবি করা হয়, বিশ্বভারতীর উপাচার্যের লিখিত আর্জির পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের সুপারিশে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক বিশ্বভারতীর নিরাপত্তায় সিআইএসএফ মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ওই খবরেই প্রকাশ, মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রককে লেখা চিঠিতে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বিদ্যুৎ চক্রবর্তী নাকি লিখেছেন, বিশ্বভারতীর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা বেসরকারি এজেন্সির নিরাপত্তা কর্মীরা রাজ্যের শাসক দলের অনুগত। কর্তব্যে গাফিলতির কারণে তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। তাই বিশ্বভারতীর সঠিক পরিচালনা ও শান্তি বজায় রাখার জন্য উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রয়োজন। এই ‘‌খবর’‌ চাউর হতেই প্রতিবাদে সরব হন বিশ্বভারতীর অধ্যাপক, ছাত্র–‌ছাত্রী, কর্মী থেকে আশ্রমিক সবাই। প্রতিবাদ জানিয়ে উপাচার্যের কাছে চিঠি বা স্মারকলিপি দেওয়া হয়। 
বিশ্বভারতীর অধ্যাপকদের সংগঠন ‘‌বিশ্বভারতী ইউনিভার্সিটি ফ্যাকাল্টি অ্যাসোসিয়েশন’‌–‌এ‌র সভাপতি সুদীপ্ত ভট্টাচার্য বলেন, ‘‌এই ব্যাপারটা নিয়ে আমরা পুরোপুরি অন্ধকারে। লিখিতভাবে উপাচার্যের কাছে বিষয়টি জানতে চেয়েছি। কিন্তু কোনও উত্তর পাইনি। সংবাদ মাধ্যমে শুনেছি, তিনি ছাত্র ও কর্মীদের ঘেরাওয়ের ভয় থেকেই কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকে এমন চিঠি লিখেছেন। আমরা তার বিরোধিতা করেছি। বিশ্বভারতীর আইন–শৃঙ্খলার জন্য সিআইএসএফ মোতায়েন মানা যায় না। এটা রবীন্দ্র–‌ঐতিহ্য বিরোধী, গণতান্ত্রিক শিক্ষা কাঠামোর বিরোধী। সর্বস্তরের আন্দোলনের চাপে কর্তৃপক্ষ এখন বলছেন, এ ধরনের চিঠি তঁারা দেননি। কিন্তু সর্বভারতীয় সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরের প্রতিবাদও তঁারা এখনও করেননি।’‌
বিশ্বভারতী কর্মিসভার সভাপতি গগন সরকারের কথায়, ‘‌বিশ্বভারতী একটি আশ্রম বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে সিআইএসএফ নিয়োগের সিদ্ধান্ত আমরা কোনও মতেই মেনে নিতে পারি না। আসলে উপাচার্য মসৃণভাবে তঁার একনায়কতন্ত্র চালানোর সুবিধার জন্যই সিআইএসএফ চাইছেন। বিশ্বভারতীর সম্পত্তি রক্ষার জন্য যদি নিরাপত্তার প্রয়োজন থাকে, তা হলে তিনি রবীন্দ্রভবন ও কলাভবনের জন্য শুধু কেন্দ্রীয় বাহিনী চাইতে পারতেন। আসলে ‌উপাচার্য এই বিষয়টি নিয়ে রাজনীতি করছেন। যেহেতু এটি একটি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং কেন্দ্রে রয়েছে বিজেপি সরকার। রাজ্যে ক্ষমতাসীন তৃণমূলের সঙ্গে তাদের বৈরিতা রয়েছে। তাই তিনি এই বিষয়টি নিয়ে সূক্ষ্ম রাজনীতি করছেন।’‌ শান্তিনিকেতনের প্রবীণ আশ্রমিক তথা ‘‌শান্তিনিকেতন বঁাচাও কমিটি’‌র সম্পাদক সুবোধ মিত্রর বক্তব্য, ‘‌সিআইএসএফ চেয়ে কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকে চিঠি পাঠানোর কথা বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ যদি এখন অস্বীকার করে থাকেন, সেটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। আসলে এ নিয়ে সর্বস্তরে প্রতিবাদ হয়েছে, ডেপুটেশন দেওয়া হয়েছে বলে চুপ আছে।’‌ এদিকে, এই বিষয়টি নিয়ে ‘‌হোক কলরব’‌–এর আদলে বড়সড় আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিশ্বভারতীর ছাত্র–‌ছাত্রীদের যৌথ ফোরাম। ছাত্র সংগঠন এসএফআইয়ের নেতা মইনুল হোসেন ও নকশালপন্থী ছাত্র সংগঠনের নেতা ফাল্গুনী পান জানান, তঁারা এ নিয়ে উপাচার্যের কাছে ডেপুটেশন দিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। প্রতিবাদ উপেক্ষা করে যদি এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়, তা হলে  ‘‌বিশ্বভারতী সাধারণ ছাত্র–‌ছাত্রী ঐক্যমঞ্চ’‌ আরও বড় ধরনের আন্দোলনে নামবে।
বিশ্বভারতীর জনসংযোগ আধিকারিক অনির্বাণ সরকার জানান, সিআইএসএফ চেয়ে বিশ্বভারতীর পক্ষ থেকে কোনও চিঠি দেওয়া হয়নি। এ ধরনের খবর ভিত্তিহীন। পৌষমেলায় নিরাপত্তা–সহ আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সহযোগিতা চেয়ে বিশ্বভারতীর পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে একটি চিঠি দেওয়া হয়। ওই চিঠিতে বলা হয়, সামগ্রিকভাবে বিশ্বভারতীর জন্য আরও উন্নত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হলে ভাল হয়। আমরা নোবেল ধরে রাখতে পারিনি, চন্দন গাছ চুরি হয়ে যাচ্ছে, চুরি–ছিনতাই বাড়ছে। তাই কেন্দ্রীয় সরকার বিশ্বভারতীর উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থার স্বার্থে যদি কোনও বাহিনী দিতে চায়, তা হলে তা নিতে আমাদের কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু এর জন্য কোনও রকম আর্থিক দায়ভার বহন করা বিশ্বভারতীর পক্ষে সম্ভব নয়।’‌‌‌‌‌‌

বিশ্বভারতীর উপাসনা কক্ষ। ছবি:  সংগৃহীত

জনপ্রিয়

Back To Top