দীপঙ্কর নন্দী- পুজো কমিটিগুলির কাছে আয়কর দপ্তর থেকে কর দেওয়ার যে নোটিস পাঠানো হয়েছে, মঙ্গলবার তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে তৃণমূলের বঙ্গজননী বাহিনী সুবোধ মল্লিক স্কোয়্যারে দিনভর ধর্না দেয়। বক্তব্য পেশ করেন কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম, বঙ্গজননী বাহিনীর চেয়ারম্যান কাকলি ঘোষদস্তিদার। এদিকে এদিন আয়কর দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, মিথ্যে রটনা হচ্ছে। কোনও দুর্গোপুজো কমিটিকে এ বছর নোটিস ধরানো হয়নি। ঠিকাদার ও ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিগুলি যে সব কর ফঁাকি দিচ্ছে, তা আটকানোই আমাদের লক্ষ্য। কোনও দুর্গাপুজো কমিটিকে বিপদে ফেলা বা সমস্যা তৈরি করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। এদিন রাতেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি প্রতিবাদ করে ফেসবুকে লিখেছেন, ‘‌পুজোর জিজিয়া কর নিয়ে আয়কর দপ্তর তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে প্রেস বিবৃতি দিয়েছে। আমি আপনাদের সবাইকে জানাতে চাই, ওই বিবৃতির নামে তারা কিছু দাবি করেছে। যা প্রমাণ করে যে, তারা ঠিক তথ্য দেয়নি। গত বছরও আয়কর দপ্তর পুজো কমিটিগুলিকে নোটিস পাঠিয়েছিল। ঢাকি, পুরোহিত ছাড়াও গ্রামবাংলার আরও অনেক মানুষ পুজো এবং মণ্ডপ তৈরির সঙ্গে জড়িয়ে থাকেন। পুজো কমিটিগুলির মাধ্যমে তঁাদের কাছ থেকে কর নেওয়া আসলে ‘‌টেরিবল ডিজাস্টার স্কিম’‌।’‌ মমতা মন্তব্য করেছেন, ‘‌আমাদের সংস্কৃতি এবং দুর্গাপুজো উৎসবের ওপর এ এক আক্রমণ। আমি জানি না, জেনে অথবা না জেনে এই কাজ করা হয়েছে কিনা। তবে, এটা ভীষণরকম কুরুচি। যখন সমস্ত ধর্মের মানুষ দুর্গোপুজোয় অংশ নেন, তখনই এ এক জাতীয় উৎসবের চেহারা নেয়।’‌ মমতা এদিন আবেদন করেছেন, উৎসবের ওপর থেকে এই কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে নেওয়া উচিত।‌
এদিন ধর্নার সঞ্চালনা করেন মন্ত্রী শশী পঁাজা। মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, নয়না ব্যানার্জি, স্মিতা বক্সি, জুঁই বিশ্বাস, মালা সাহা, সোমা চৌধুরি, অনন্যা ব্যানার্জি প্রমুখ বক্তব্য পেশ করেন। এঁরা সকলেই আয়কর দপ্তরের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। গলায় প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়ে আসেন তঁারা। বিভিন্ন জায়গা থেকে মহিলারা আসেন। প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল— এভাবে কর আদায় করা যাবে না;‌ আমরা এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করছি। সুবোধ মল্লিক স্কোয়্যারে একডালিয়া এভারগ্রিন ক্লাবের পক্ষ থেকে আসেন সুব্রত মুখার্জির বোন তনিমা চ্যাটার্জি। তিনি ক্লাবের সহ–‌সভাপতি। তঁার বক্তব্য, ‘‌আপনাদের বাড়ির কাজের লোক যে কাজ করেন, তঁার থেকে কখনও আয়কর নেওয়া হয়?‌ উৎসব নিয়ে কোনও কর হয় না। কেউ একজন প্রতিমার টাকা দিল, আবার কেউ দিল প্যান্ডেলের টাকা। যারা দিচ্ছে, তারাই তো কর দেয়। পুজো কমিটিগুলি কেন দেবে?‌ সেটাই আমরা বুঝতে পারছি না। আমাদের প্রতিবাদ এখানে।’‌ ‌সুবোধ মল্লিক স্কোয়্যারে রাস্তার ওপর চেয়ারে বসে লেবু চা খাচ্ছিলেন বাদামতলা আষাঢ় সঙ্ঘের সম্পাদক সন্দীপ চক্রবর্তী। বলছিলেন, ‘‌৮১ বছরের পুজো। এখন নাকি আমাদের কর দিতে হবে!‌ বাজেট কমাতে বাধ্য করা হচ্ছে। জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। লাইট, প্যান্ডেল ও প্রতিমার জন্য প্রচুর টাকা খরচ হয়ে যায়। আমরা হিসেব রাখি। হিসেব ছাড়া পুজো হয় না। টিডিএস কাটতে বলছে। কর আমরা দিতে পারব না।’‌
সুরুচি সঙ্ঘের পক্ষ থেকে জুঁই বিশ্বাস এসেছিলেন। তিনি বলেন, ‘মহারাষ্ট্রে গণেশ পুজো হয়। তারা কি কর দেয়?‌ আসলে মমতাদিকে হেনস্থা করতেই এসব করা হচ্ছে।’‌ বাবুবাগানের সরোজ ভৌমিক বলেন, ‘‌অনেকের প্যানকার্ড নেই। তারা কীভাবে কর দেবে?‌ সর্বজনীন পুজো থেকে কর আদায় করা যায় না।’‌
এদিন সকালে আগমনি গান দিয়ে ধর্না শুরু হয়। সকালেই এসে পৌঁছন কাকলি ঘোষদস্তিদার, শশী পঁাজা–‌সহ অনেকেই। নিউ টাউনের সারদাপল্লী সর্বজনীন দুর্গোৎসব কমিটির পক্ষ থেকে অনামিকা সাহা জানালেন, ‘‌মহিলারা এই পুজো করেন। ১৬ বছর ধরে করছি। আমি মনে করি, পুজো সামাজিক কাজ।’‌
ফোরাম ফর দুর্গোৎসবের পক্ষ থেকে শাশ্বত ঘোষ বলেন, ‘‌এই ফোরামে ৩৮৬টি কমিটি আছে। ৪০টি পুজো কমিটিকে নোটিস দেওয়া হয়েছে। চঁাদা তুলে পুজো করা হয় না। এখন স্পনসর জোগাড় করে করতে হয়। টাকা পাওয়া যায় বহুদিন পর। আমরা আয়কর দপ্তরে সব জানিয়ে এসেছি। এভাবে কর চাপানো যায় না।’‌
মঙ্গলবার ‘‌আমার গর্ব মমতা’‌–‌র ফেসবুক থেকে একটি কার্টুন পোস্ট করা হয়েছে। তাতে লেখা হয়েছে— এবার কি দুর্গাকেও কৈলাস থেকে আসার সময় আধার আর প্যানকার্ড নিয়ে আসতে হবে?‌ মা দুর্গাকেও ট্যাক্স দিতে হবে?‌ দুর্গাপুজো কমিটিগুলিকে আয়কর দপ্তরের নোটিসের তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। কার্টুনে একজন প্রতিমাকে জিজ্ঞেস করছেন, আপনার প্যানকার্ড, আধার কার্ড দেখান। শেষ কবে আইটি রিটার্ন ফাইল করেছেন?‌‌
বাংলার পুজো নিয়ে হস্তক্ষেপ করায় আয়কর দপ্তরের তীব্র সমালোচনা করেন কংগ্রেস সাংসদ, লোকসভার কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরি। আয়কর দপ্তর ‘‌ট্যাক্স টেররিস্ট’‌–‌এ পরিণত হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন অধীর।‌‌‌‌‌‌

 

 

ফেসবুকে কার্টুনে প্রচার। 

জনপ্রিয়

Back To Top