সব্যসাচী সরকার, হাঁসখালি: তাঁর বাড়ি থেকে পায়ে–হাঁটা দূরত্বে ‘মজিদপুর আমরা সবাই’ ক্লাব। সরস্বতী পুজো উপলক্ষে সেখানেই একটি অনুষ্ঠানে শনিবার সন্ধ্যায় গিয়েছিলেন নিহত তৃণমূল বিধায়ক সত্যজিৎ বিশ্বাস। মঞ্চে প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের পর নেমে এসে ১০ পা দূরে একটি চেয়ারে বসেছিলেন। পেছনেই বসেছিলেন সত্যজিতের সর্বক্ষণের সঙ্গী মিলন সাহা। এলাকার নাম ফুলবাড়ি। বিশাল মাঠের একদিকে শিশুশিক্ষা কেন্দ্র। একপাশে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মঞ্চ। তার পাশেই সরস্বতী পুজোর মণ্ডপ। রবিবার পুজো হওয়ার কথা ছিল সেই মণ্ডপে। সত্যজিতের আকস্মিক মৃত্যুতে সেই পুজো বন্ধ। 
দলের কাজ সেরে বাড়ি হয়ে পাড়ার মাঠের অনুষ্ঠানে এসেছিলেন সত্যজিৎ। অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে হঠাৎ ভিড় থেকে এক দুষ্কৃতী উঠে এসে দেশি পিস্তল (সিঙ্গল শটার) থেকে মাথার ডানদিকে আগ্নেয়াস্ত্রের নল প্রায় ঠেকিয়ে গুলি চালায়। গুলিটি সত্যজিতের মাথা ভেদ করে ডান গাল ফুঁড়ে বেরিয়ে যায়। মাঠের মধ্যেই লুটিয়ে পড়েন সত্যজিৎ। এমনই বর্ণনা দিয়েছেন ঘটনার অন্যতম প্রত্যক্ষদর্শী মিলন। ঘটনা এতই দ্রুত ঘটে যে, কেউ কিছু বোঝার আগেই ওই দুষ্কৃতী আগ্নেয়াস্ত্র হাতে পালাতে শুরু করে। মাঠের পাশেই বড় রাস্তা টপকে স্থানীয় একটি দোকানের সামনে অস্ত্রটি ফেলে সে পাশের গলি দিয়ে দৌড়ে পালায়। মিলন হাঁসখালি থানায় দায়ের–করা অভিযোগে জানিয়েছেন, ‌রাত ৮টা ১৫ মিনিট নাগাদ সত্যজিৎকে গুলি করা হয়। তিনিই চিৎকার করে লোকজন জড়ো করে রক্তাক্ত তৃণমূল বিধায়ককে হাসপাতালে নিয়ে যান। 
শনিবার রাত থেকে তদন্ত চালিয়ে পুলিশ এলাকার দুই বাসিন্দা সুজিত মণ্ডল ও কার্তিক মণ্ডলকে গ্রেপ্তার করেছে। আরও একজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। অভিজিৎ পুন্ডারি নামে একজন পলাতক। রবিবার আদালতে হাজির করানো হলে ধৃতদের ১৪ দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এফআইআরে নাম রয়েছে প্রাক্তন তৃণমূল এবং অধুনা বিজেপি নেতা মুকুল রায়েরও। তবে মুকুল প্রত্যাশিতভাবেই সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। যে গুলি চালিয়েছিল, তাকে এখনও পাওয়া যায়নি বলেই পুলিশ সূত্রের খবর। কর্তব্যে গাফিলতির দায়ে হাঁসখালি থানার ওসি অনিন্দ্য বসুকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তও শুরু হয়েছে। সত্যজিতের দেহরক্ষী প্রভাস মণ্ডলের বিরুদ্ধেও বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছে। তবে প্রাথমিক তদন্তে এটা মোটামুটি নিশ্চিত যে, খুনের পিছনে রাজনীতিই রয়েছে। পুলিশের বক্তব্য— রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই এই খুন।  
সত্যজিৎ–হত্যার তদন্তে নেমে পুলিশ কয়েকটি বিষয়ে আলাদা করে নজর দিয়েছে। তাতে পরিকল্পনা করে খুনের তত্ত্বই জোরালো হচ্ছে। 
প্রথমত, শনিবার রাতে ওই অঞ্চলে সন্ধে ৬টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত বহুবার লোডশেডিং হয়। স্থানীয়রা বলছেন, এত ঘনঘন লোডশেডিং আগে কখনও হয়নি। তবে বিধায়ককে যখন গুলি করা হয়, তখন আলো ছিল। যদিও খুনির মুখ চেনা যায়নি। গুলির আওয়াজও জোরালোভাবে শোনা যায়নি। এক স্থানীয় বাসিন্দার কথায়, ‘বেলুন ফাটার মতো একটা আওয়াজ হয়েছিল। তার পরেই উনি মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে যান।’ লোকজন এরপর ছোটাছুটিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। রক্তাক্ত সত্যজিৎকে গাড়িতে তুলে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় অনেকে সচকিত হন। দৌড়ে এসে জানতে চান— কী হয়েছে?‌ কেউ কেউ বলতে থাকেন, সত্যজিতের স্ত্রীর গুলি লেগেছে। পরে সবাই জানতে পারেন, গুলি করা হয়েছে সত্যজিৎকে। 
দ্বিতীয়ত, সত্যজিতের দেহরক্ষী প্রভাস আগে থেকে জানিয়ে রবিবার ছুটি নিয়েছিলেন। তখন অন্য দেহরক্ষী কেন রাখা হয়নি?‌ অথবা, তিনি কেন রবিবারই ছুটি নিলেন?  প্রভাসের বিরুদ্ধেও বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছে। 
তৃতীয়ত, যে অস্ত্রটি খুনে ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি দিয়ে গুলি চালাতে প্রতিবার একটি করে গুলি ভরতে হবে। খুনি অথবা খুনিরা নিশ্চিত হল কীভাবে যে, সত্যজিৎকে সামনে থেকে একবার গুলি করেই হত্যা করা যাবে?‌
চতুর্থত, খুনি যে রাস্তা ধরে পালিয়েছে, তা বহিরাগত কারও পক্ষে সম্ভব কি? তাহলে কি সত্যজিৎকে যে বা যারা খুন করেছে, তারা এলাকারই লোক?‌
পঞ্চমত, আততায়ী ওই সময়টাই কীভাবে এবং কেন বেছে নিল? সে অর্থে একেবারে পেশাদার খুনির মতোই বাঘের ঘরে ঢুকে খুন করে যাওয়ার ঘটনা।
রবিবার ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, যে চেয়ারে বসেছিলেন সত্যজিৎ, সেটি তখনও পড়ে রয়েছে। মাঠে বসার জন্য যে ত্রিপল পাতা হয়েছিল, তাতে রক্ত জমাট বেঁধে কালো হয়ে রয়েছে। স্থানীয়রা বলাবলি করছিলেন, এত দ্রুত খুনি দৌড়ে পালিয়েছে, যে তাকে তাড়া করে ধরার মতো কোনও পরিস্থিতি ছিল না। মাঠে তখন কচিকাঁচা ও তাদের মায়েরাই সংখ্যায় বেশি। সে অর্থে এলাকার পুরুষরাও তত বেশি সংখ্যায় অনুষ্ঠানস্থলে ছিলেন না।  
প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের অনুমান, খুনি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখার জন্য আগে থেকেই এসে বসেছিল, বিষয়টা সম্ভবত তেমন নয়। সম্ভবত তাকে কেউ খবর দিয়েছিল যে, সত্যজিৎ কার্যত অরক্ষিত অবস্থায় মাঠে এসে বসেছেন। মাঠে বাড়িঘর রয়েছে। একমাত্র রাস্তার দিকটাই কিছুটা ফাঁকা। আগে থেকে আততায়ীরা ঘটনাস্থল পরীক্ষা (রেইকি) করে গিয়েছিল, এমনও তথ্য এখনও পর্যন্ত তদন্তে পায়নি পুলিশ। 
৩৮ বছরের সত্যজিৎ স্থানীয় দক্ষিণপাড়া রাধাসুন্দরী পালচৌধুরি বিদ্যালয়ে অশিক্ষক কর্মীর পদে যোগ দেন ২০১৩ সালের আগস্ট মাসে। 

 

যে মাঠে তাঁকে খুন করা হয়েছে, সেই মাঠেই সত্যজিতের বৌভাতের অনুষ্ঠান হয়েছিল। সম্প্রতি নতুন বাড়ি করেছিলেন। ধীরে ধীরে পরিশ্রম করে উন্নতি করছিলেন। এলাকার প্রতিটি মানুষের সঙ্গেই ছিল নিবিড় যোগাযোগ। মতুয়া সম্প্রদায়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভআবে যুক্ত ছিলেন সত্যজিৎ। তাই তাঁকে খুন করার নেপথ্যে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর চক্রান্ত আছে বলেই প্রাথমিকভাবে পুলিশি তদন্তে অনুমান। হাতের তালুর মতো নিজের এলাকাকে চিনতেন সত্যজিৎ। তাঁর প্রাক্তন শিক্ষক অমিত কুমার পাল বলছিলেন, ‘‌কীভাবে এই ঘটনা ঘটে গেল বুঝতে পারছি না।’‌
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী মিলন থানায় যে অভিযোগ করেছেন, তাতে তিনি ৪ জনের নাম লিখেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সত্যজিৎকে জাপটে ধরে দু’জন। একজন গুলি চালায়। যদিও পুলিশ জানাচ্ছে, জাপটে ধরার ঘটনা না–ও ঘটে থাকতে পারে। সম্ভবত দু’জন সত্যজিৎকে ঘিরে দাঁড়িয়েছিল। তৃতীয়জন গুলি চালায়। 
পুলিশ মনে করছে, অস্ত্র ফেলে পালিয়ে যাওয়ার অর্থ— খুনি গুলি চালানোর পর ভয় পেয়ে গিয়েছিল। আবার পুলিশের অনয্য একাংশ বলছে, যে সিঙ্গল শটারটি থেকে সত্যজিৎকে গুলি করা হয়, সেটির দাম বেশি নয়। সন্দেহ থেকে বাঁচতেই আততায়ী সেটি ছুঁড়ে ফেলে পালিয়েছে।

জনপ্রিয়

Back To Top