সুখেন্দু আচার্য, হাঁসখালি: তাঁর জন্য ফুচকা পাঠাবেন বলে শনিবার সন্ধ্যায় বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন সত্যজিৎ বিশ্বাস। ফুচকা আসেনি। তিনিও আর ফেরেননি। রবিবার কৃষ্ণগঞ্জের বাড়িতে ফিরল তাঁর মৃতদেহ। লোকভর্তি বাড়িতে বসে হাউ হাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন রূপালি বিশ্বাস। নিহত বিধায়ক সত্যজিতের স্ত্রী। 
সত্যজিতের দেড় বছরের পুত্র সৌম্যজিৎ বাড়ির সকলের কান্না দেখে হঠাৎ চুপ করে গেছে। আগে ঠাকুমার কোলেপিঠে যেত। এদিন মায়ের কোল ছেড়ে নামতেই চাইছে না। মায়ের কান্না দেখে মাঝেমধ্যে সে–ও কেঁদে উঠছে। বাকি সময় নিশ্চুপ। 
রূপালি বলছিলেন, ‘‌সন্ধ্যার সময় ঘর থেকে ক্লাবের দিকে যাবে বলে বেরোচ্ছিল। আমি বললাম, খুব ফুচকা খেতে ইচ্ছে করছে। ও বলল, পাঠাচ্ছি। এই বলে বেরিয়ে গেল। বাড়ির কাছেই ক্লাবের পুজোটা বেশ বড় করে হয়। রাত ৮টা পর্যন্ত ফুচকা আসছে না দেখে ওকে ফোন করি। ফোন ধরেনি। ভেবেছিলাম, ফুচকা নিয়ে নিজেই ফিরছে। ফুচকা এল না। এল ওর মৃতদেহ।’‌ কাঁদতে কাঁদতে বলেই যাচ্ছিলেন রূপালি— ‘‌আমি এই বাড়িতে এসেছি ২ বছর। ওর জনপ্রিয়তা নিজের চোখে দেখেছি। একবার ওর সঙ্গে কলকাতায় বিধায়কদের কোয়ার্টারে গিয়েছিলাম। বলেছিল, এখানে এসেছ, তোমায় রান্না করতে হবে না। আমি রান্না করছি।’‌ কারা এমন কাজ করল? রূপালি বলেন, ‘‌ওর কোনও শত্রু ছিল বলে জানি না। শুনিওনি। সকলে ওকে ভালবাসত। ও–ও সকলকে ভালবাসত। অনেক সময় গরিব মানুষকে নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়ে খাবার কিনে দিত। কে ওকে খুন করবে? তবে রাজনৈতিক কারণে ও খুন হয়ে থাকতে পারে। যারা ধরা পড়েছে, শুনলাম, তাদের একজন বিজেপি করে।’‌ তার পরেই স্বগতোক্তি করলেন, ‘‌আমার দেড় বছরের ছেলেটা কী দোষ করেছিল? ও তো আর বাবা ডাকতে পারবে না। এখন ওকে কী করে সামলাব?‌’‌ শনিবার থেকেই সত্যজিতের এক ভাই সুজিত কৃষ্ণনগর হাসপাতালে। সত্যজিতের দেহ বাড়িতে আসার সঙ্গে সঙ্গে ছোটভাই সুমিত দাদার মৃতদেহের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে অঝোরে কাঁদতে থাকেন। দুই ভাইয়ের একই কথা, ‘‌কী দোষ করেছিল দাদা?‌ ওরা মেরে দিল!‌ দাদা তো সবার আপদে–বিপদে দৌড়ে যেত। তবু ওকে বঁাচতে দিল না।’‌ তাঁদের অভিযোগের কাঠগড়ায় বিজেপি। 
সত্যজিতের মা বৃদ্ধা অঞ্জনাদেবীকে নিয়ে আপাতত চিন্তিত সকলে। তঁাকে আলাদা একটি ঘরে রাখা হয়েছে। সত্যজিতের পাড়ায় কোনও বাড়িতে উনুন জ্বলেনি। বিকেলের পর যখন শেষযাত্রায় রওনা হচ্ছে ৩৮ বছরের সত্যজিতের দেহ, বাড়ির বাইরে দাঁড়ানো এক মহিলা বলছিলেন, ‘‌ছেলেটা চলে গেল। গলা দিয়ে ভাত নামবে না কারও। তাই রান্না বন্ধ।’‌         ছবি: অভিজিৎ মণ্ডল

জনপ্রিয়

Back To Top