Durga Puja: এই স্কুলে সরস্বতী নয়, হয় দুর্গাপুজো

‌‌মিল্টন সেন, হুগলি:‌ স্কুলে সরস্বতী পুজো হওয়াটা স্বাভাবিক।

তবে স্কুলে ঘটা করে দুর্গাপুজো। তাও আবার স্কুল কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে। এই রাজ্য কেন, গোটা দেশে কোথাও এই নজির থাকলেও, সংখ্যাও খুব বিরল। বাস্তবেই ঘটা করে দুর্গোৎসব পালন করা হয় বৈচি গ্রাম বি এল স্কুলে। পুজোর বয়স আনুমানিক ১৮৬ বছর। পাণ্ডুয়া থানার অন্তর্গত বৈচিগ্রাম। একদা সেখানে জমিদারি পত্তন করেছিলেন জমিদার ঠাকুরদাস মুখোপাধ্যায়। পুজোর সূচনাও করেছিলেন তিনিই। পরবর্তী সময়ে জমিদারি সামলেছেন তাঁর ছেলে বিহারীলাল মুখোপাধ্যায়। তার স্ত্রী কমলা কামিনী দেবী। তবে কথিত আছে জমিদারীর প্রভাব প্রতিপত্তি কিন্তু বৃদ্ধি পেয়েছিল বিহারীলালের আমলেই। তিনি ছিলেন নিঃসন্তান। তার অবর্তমানে বিপুল সম্পত্তি কি হবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতেন তিনি। এক সময় বিহারীলাল মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। বিদ্যাসাগরের সঙ্গে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে পুত্র দত্তক নেওয়ার কথা প্রকাশ করেন বিহারীলাল। সেই সময় বিদ্যাসাগর মশাই তাঁকে পরামর্শ দেন এই বিপুল স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি সমাজসেবামূলক কাজে ব্যবহার করতে। সে কথা চিন্তা করেই জমিদার বাড়িতেই বিদ্যালয় ও একটি দাতব্য চিকিৎসালয় তৈরি করেন বিহারীলাল। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের পরামর্শেই ১৮৭৭ সালে বিহারীলাল উচ্চ অবৈতনিক বিদ্যালয় ও একটি দাতব্য চিকিৎসালয় তৈরি করেন। সেই থেকে আজও নিষ্ঠার সঙ্গেই জমিদার বাড়ির স্কুলে হয়ে আসছে এই পুজো। ১৮৭০ সালে বিহারীলাল উইল করেন। সেখানে তিনি লেখেন তিনি নিঃসন্তান। তাই তাঁর যাবতীয় সম্পত্তি থেকেই পুজো সহ সমস্ত কিছুই চলবে। উইল অনুযায়ী সব ঠিক চলছিল। ১৯৯৫ সালের পর থেকে সব বন্ধ হয়ে যায়। 
জমিদারি এখন আর নেই। রয়েছে বিশাল জমিদার বাড়ি। তার গায়ে বড় বড় খিলান যুক্ত নাট মন্দির। সেখানেই এখনও দুর্গা এবং জগদ্ধাত্রী পুজো হয়। আর জমিদার বাড়ি ঢোকার আগেই রয়েছে একটি রাস মন্দির। তাতে আজও টেরাকোটার নকশা নজরে পড়বে। তবে কালের পরিবর্তনে দুটি মন্দিরই ভগ্নপ্রায়। দুর্গা মন্দির সংস্কারের চেষ্ঠা হলেও পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে তা সম্পূর্ণ হয়নি। স্কুলেই হয় ঠাকুর তৈরির কাজ। পরে প্রতিমা মূল বেদীতে বসানো হয়। আজও প্রাচীন প্রথা মেনেই তৈরি হয় একচালা দুর্গা মূর্তি। সিংহ বাহিনী মা দুর্গার সঙ্গে একচালাতেই থাকেন লক্ষী গণেশ সরস্বতী কার্তিক এবং মহিষাসুর। টানা চোখের বাংলা মুখের আদলে প্রতিমা। তবে শুরু থেকেই মহিষাসুরের গায়ের রঙ সবুজ। ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত বৈদিক মতে পুজো হয়। ছাগ বলির প্রথা চালু থাকলেও এখন তা হয় না। বর্তমানে কুমড়ো কলা বলি দিয়ে রীতি বজায় রাখা হয়েছে। আগে দশমীর দিন কাঁধে করে চার পাড়া ঘুরিয়ে প্রতিমাকে নিরঞ্জন করা হতো স্কুলেরই একটি পুকুরে। বর্তমানে লোকের অভাবে তা বন্ধ হয়েছে। এখন ট্রাক্টারে করে চার পাড়া ঘুরিয়ে প্রতিমা নিরঞ্জন করা হয়। পুরোহিত সন্দীপ চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, আগে দুর্গাপুজো, দোল ও জগদ্ধাত্রী পুজোয় প্রচুর লোকের সমাগম হতো স্কুল চত্বরে। নবমীর দিন গ্রামের সকলেই অঞ্জলি দিতে আসত। সকলকে খাওয়ানোর ব্যবস্থা থাকত। এখন আর হয় না। কারণ আগে গ্রামে একটাই পুজো হতো। এখন বিভিন্ন জায়গায় বারোয়ারি দুর্গাপুজো হয়। স্কুলের ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমেই পুজো চলত। স্কুলের ছাত্রী সঞ্জনা চ্যাটার্জী বলেন, সরস্বতী পুজো সব স্কুলে হয়। তবে দুর্গাপুজো কোনও স্কুলে হয়, এমনটা তিনি শোনেননি। তবে পুজোর দিনগুলো খুব আনন্দ হয়। স্কুলে এসে প্রতিমা দর্শন থেকে গল্প আড্ডা সবই চলে। স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র রঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন, ভারতবর্ষের আর কোন স্কুলে দুর্গাপুজা হয় তা জানা নেই। তবে বিএল স্কুলে দুর্গাপুজো হয়। ছোটবেলা থেকেই এই পুজো সে দেখে আসছে। তবে পুজোর ঐতিহ্য আগের তুলনায় অনেকটাই কমেছে। দুর্গা মন্দিরের ভগ্নদশা। যতদূর তিনি জানেন, জমিদাররা তাঁদের সমস্ত সম্পত্তি সরকারকে দান করে গেছেন। যদি সরকার একটু দৃষ্টি দেয় তাহলে ভাল হয়।
 

আকর্ষণীয় খবর