অলক সরকার ও পার্থসারথি রায় ■  জলপাইগুড়ি- ভুটান–‌‌কোচবিহার–‌‌বৈকুণ্ঠপুর–‌‌রংপুরের অংশ নিয়ে দ্বিতীয় ইঙ্গ–‌‌ভুটান যুদ্ধের পর ১৮৬৯ সালের ১ জানুয়ারি ভূমিষ্ঠ হয়েছিল জলপাইগুড়ি জেলা। তারপর বহু কাটাছেঁড়া হয়েছে এই জেলার মানচিত্রে। শেষবার ২০১৪ সালে আলিপুরদুয়ার মহকুমাটিকে কেটে পৃথক জেলা গঠন করে তৃণমূল সরকার। আলিপুরদুয়ারের মানুষের কাছে এই জেলা গঠন ছিল ঐতিহাসিক উপহার। যার জেরে চা–‌বলয়ে আরএসপি–‌‌র একসময়ের দুর্গ ভেঙে খান খান হয়ে যায়। আলিপুরদুয়ারের পঞ্চায়েত থেকে পুরসভা, বিধানসভা থেকে লোকসভা, সবই তৃণমূলের দখলে। জেলা ভাগ হওয়ায় আলিপুরদুয়ারে যেমন খুশির জোয়ার, জলপাইগুড়িতে তখন ছিল চাপা অভিমান। কারণ, পর্যটনের আসল ঠিকানাগুলো থেকে যায় আলিপুরদুয়ারের সঙ্গে। জেলার গুরুত্ব অনেকটাই কমে যায়। 
এরই মাঝে আরও খণ্ডিত হওয়ার আশঙ্কা। শিলিগুড়ি পুরনিগমের ৪৭টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১৪টি ওয়ার্ড জলপাইগুড়ি জেলার অধীন। তাদের লোকসভাও জলপাইগুড়ি। কিন্তু এঁরা মনেপ্রাণে চান শিলিগুড়ির সঙ্গে জুড়ে যেতে। অতীতে ভুটানিদের অত্যাচার সহ্য করে পাঁচশো বছর শাসন করেছেন বৈকুণ্ঠপুরের রায়কত বংশীরা। জেলা গঠন হওয়ার পরে রেলপথ স্থাপিত হয়েছিল। এমনকী সড়কপথেরও বিশাল উন্নতি হয়েছিল। চা–‌‌কাঠ–‌‌তামাক–‌‌তুলা ব্যবসার উন্নয়নে আর্থিক সমৃদ্ধি ঘটেছে। কিন্তু দেশভাগ সেই সমৃদ্ধিতে আঘাত হানে। আজও তাই কাটাকুটিগুলি বঞ্চনার অভিঘাত রচনা করে জলপাইগুড়ির মানুষের মনে।
 ২০১৪ সালে জেলা ভাগের ৫ বছর পর এ বছর জলপাইগুড়ির জন্মের ১৫০ বছর পূর্তি। গোটা জেলা জুড়ে সেই উচ্ছ্বাস চোখে পড়ছে। এই উচ্ছ্বাসে ৫ বছর আগের অভিমানও ধুয়েমুছে গেছে অনেকটাই। কারণ, ইতিমধ্যে এই জেলাও নানা উপহার পেয়েছে। ২০১৯ সালের ৯ মার্চ জলপাইগুড়িতে নতুন সার্কিট বেঞ্চের উদ্বোধন হয়। এই জেলার মাটিতেই গড়ে উঠেছে রাজ্য সরকারের শাখা সচিবালয় ‘‌উত্তরকন্যা’‌। পর্যটকদের জন্য তৈরি হয়েছে দুটি চমৎকার ঠিকানা। মুখ্যমন্ত্রীর স্বপ্নের গাজলডোবা ইকো ট্যুরিজম প্রকল্প ‘ভোরের আলো’ এবং বন্যপ্রাণীর উন্মুক্ত চিড়িয়াখানা ‘বেঙ্গল সাফারি’ পার্ক। গড়ে উঠেছে স্পোর্টস কমপ্লেক্স অর্থাৎ বিশ্ব বাংলা ক্রীড়াঙ্গন। উন্নয়ন এখানে খালি চোখে দেখা যায়। উন্নয়নের এই সাজানো বাগিচায় এবারের লোকসভা নির্বাচন। আর এই উন্নয়নেই অনেকটা কোণঠাসা বিরোধীরা। খুব সতর্কভাবে প্রচার চালাতে হচ্ছে। উন্নয়ন নিয়ে প্রশ্ন তোলার বদলে ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে প্রশ্নের অভিমুখ।  
১৮৭৪ সালে এই গাজলডোবাতেই প্রথম চা–‌বাগান স্থাপন করে ব্রিটিশরা। কিন্তু সেই চা–‌শিল্পে ইদানীং একটা আশঙ্কার জায়গা দেখা যাচ্ছে। মাঝে মাঝেই কারণে–‌অকারণে মালিকপক্ষ বাগান বন্ধ করে দিচ্ছেন। যার প্রভাব গিয়ে পড়ছে হাজার হাজার চা–‌শ্রমিকদের ওপর। একদিকে বন্ধ বাগান খোলার চেষ্টা, অন্যদিকে চা–‌বলয়ে বিকল্প আয়ের উৎস তৈরি করা। পর্যটনের নতুন ঠিকানাও তৈরি হচ্ছে। বাড়ছে কর্মসংস্থানের সুযোগ। আর তাতেই ধস নেমেছে বিরোধীদের সংগঠনে। বাগরাকোটে বিমল গুরুংদের যে সংগঠন ছিল, তা প্রায় উধাও। তাঁদের অনেকেই এখন তৃণমূলের ঝাণ্ডা হাতে দাবি আদায়ের লড়াই করছেন। চা–‌বলয়ে এখনও সিটু নেতা জিয়াউল আলমদের নেতৃত্বে বাম সংগঠন মাথা তুলে আছে। টিমটিম করে জ্বলছে কংগ্রেসের শ্রমিক সংগঠনও। 
সেজে উঠেছে শহরের বিভিন্ন এলাকা। মার্বেল আর টাইলসে রাজকীয়ভাবে বাঁধানো রাজবাড়ি ঘাট। করলা নদীর পাড়ে বসানো হয়েছে নজরকাড়া বেঞ্চ। আর আলোর ফুলঝুরি। প্রতিটি রাস্তা মসৃণ। নীল–‌সাদা রঙে চিক চিক করছে। সেজে উঠেছে মালবাজারও। সারা বছরই দেখে মনে হবে দীপাবলি চলছে। এই কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী বিজয়চন্দ্র বর্মনকে তাই প্রচারে গিয়ে তেমন অভিযোগ শুনতে হচ্ছে না। প্রার্থী বেশ স্বস্তি নিয়েই বললেন, ‘‌বঞ্চনার ইতিহাস এখন অতীত। যেখানে যাচ্ছি, নানা কাজের জন্য মানুষ এসে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে যাচ্ছেন। তাই জয় নিয়ে কোনও সংশয় নেই।’‌ কোন বিধানসভায় কত লিড আসতে পারে, তার হিসেবও চলছে। অন্যদিকে, বিজেপি অনেকটাই ছন্নছাড়া। প্রার্থী জয়ন্ত রায় আদৌ দাঁড়াতে পারবেন কিনা, তা নিয়েই সংশয় ছিল। শেষমেশ ছাড়পত্র পেলেও প্রচারে সাড়া নেই। যদিও প্রার্থীর দাবি, ‘‌একটা চোরাস্রোত চলছে। ফল বেরোলেই বুঝতে পারবেন।’‌ একসময় এই লোকসভা ছিল বামেদের দুর্গ। কিন্তু পাঁচ বছর আগে এই কেন্দ্র হাতছাড়া হওয়ার পর থেকে সংগঠন ক্রমশ ফিকে। প্রার্থী ভগীরথ রায় বিভিন্ন এলাকায় প্রচার করছেন ঠিকই, কিন্তু তেমন সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। যদিও তাঁর দাবি, ‘‌মানুষ সব কিছুই দেখছেন। মানুষকে বোকা ভাবা ঠিক নয়। মানুষ জানে, কারা তাদের আসল বন্ধু।’‌ উন্নয়নের ধাক্কায় জলপাইগুড়ির কেএলও আন্দোলন মুখ থুবড়ে পড়েছে। কেপিপি তৃণমূলকে সমর্থন করেছে। কিন্তু রাজবংশী মানুষদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টাও চলছে। জলপাইগুড়ি জেলার ৬টি কেন্দ্রের সঙ্গে রয়েছে কোচবিহারের মেখলিগঞ্জ। জয়ী সেতু হওয়ায় এই এলাকায় শাসক দল অনেকটাই এগিয়ে। তবু, ধর্মের রাজনীতির ওপর সোজা হয়ে দাঁড়াতে চাইছে বিজেপি। বেরুবাড়ি, সন্ন্যাসীকাটার মতো সীমান্ত এলাকায় তাই অল্প চোরাস্রোত আছে। যেমন দেখা গেল ময়নাগুড়ি, রাজগঞ্জের তিস্তার চর এলাকায়।
তিস্তা–‌করতোয়া ছিল উত্তর বাংলার প্রধান জনপদ। এই নদী দেখেছে বহু জাতির উত্থান–‌পতন। এই নদীর পলি শস্য শ্যামলা করেছে উত্তরকে। আবার বন্যা ধ্বংস করেছে বহু জনপদ। এই তিস্তার চোখের সামনে আজও ভাঙছে মানিক সান্যাল, মিনতি সেনদের লালদুর্গ। আর তিস্তাপাড়ের দীর্ঘ বঞ্চিতা রূপশ্রী, কন্যাশ্রীরা উড়িয়ে দিচ্ছে উন্নয়নের ‘‌বিজয়’‌ কেতন। 

জনপ্রিয়

Back To Top