আজকালের প্রতিবেদন: দোকানের খোলা মিষ্টিতেও এবার থেকে থাকতে হবে উৎপাদনের তারিখ। একইসঙ্গে ওই মিষ্টি কতদিন ঠিক থাকবে বা খাওয়া যাবে তাও উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক। আগামী জুন মাস থেকে এই নির্দেশ কার্যকর করার কথা জানিয়েছে ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি অফ ইন্ডিয়া। সরকারি নির্দেশ নিয়ে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে নানা জল্পনা। সরকারি এই নির্দেশ কীভাবে কার্যকর করা হবে তা নিয়ে খুচরো ব্যবসায়ীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নানা বিভ্রান্তি। বিপাকে পড়েছেন মিষ্টি ব্যবসায়ীরা।
বাস্তবে এই নির্দেশ মেনে ব্যবসা চালানো কার্যত অসম্ভব, জানালেন চন্দননগরের বিখ্যাত সূর্য মোদকের কর্ণধার শৈবাল মোদক। তিনি জানান, মিষ্টির ট্রে–র গায়ে উৎপাদনের তারিখ বা মিষ্টির মেয়াদ লিখে দিলে স্বাভাবিক ভাবেই তা গ্রাহকদের চোখে পড়বে না। আর ট্রে–র মধ্যে সাজিয়ে রাখা ছোট ছোট সন্দেশ বা অন্যান্য মিষ্টির গায়েও ট্যাগ লাগানো সম্ভব নয়। 
এদিকে সরকারের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন রিষড়ার বিখ্যাত ফেলু মোদকের কর্ণধার অমিতাভ দে। তিনি বলেছেন, এমনিতেই তাঁদের প্যাকেটজাত মিষ্টিতে যাবতীয় তথ্য দেওয়াই থাকে। এবার থেকে খুচরো মিষ্টিতেও তা করতে হবে, খুব ভাল। সাধারণ মানুষ কী মিষ্টি খাচ্ছেন সেই বিষয়ে তাঁরা নিশ্চিত হতে পারবেন। তবে শুধু মিষ্টি কেন? বাজারে বিক্রি হওয়া মাছ, মাংস থেকে ফুটপাথের ফাস্ট ফুড সব কিছুকেই এই আইনের আওতায় আনার দাবি তুলেছেন তিনি। বলেছেন, তাহলে বাজার থেকে মাছ মাংস কেনার সময় গ্রাহক নিশ্চিত হতে পারবে সে টাটকা কিনছে না বাসি। ফুটপাথে ফাস্ট ফুড খাওয়ার সময় মনে আর ভাগাড়ের মাংস খাচ্ছেন কিনা তা নিয়ে ভয় থাকবে না।
ধন্দে রয়েছেন নদিয়া জেলার মিষ্টি ব্যবসায়ীরা। এতদিন শুধুমাত্র প্যাকেটজাত মিষ্টির ক্ষেত্রেই এই নিয়ম ছিল। কিন্তু নদিয়া জেলায় প্যাকেটজাত মিষ্টির বিশেষ চল নেই। এখানে প্রচুর পরিমাণে বিক্রি হয় প্যাকেটহীন মিষ্টি। এই মিষ্টির ক্ষেত্রে কীভাবে উৎপাদনের তারিখ এবং কত দিনের মধ্যে সেটা খেতে হবে তা ক্রেতাকে কীভাবে জানাতে হবে সেটা নিয়ে ধন্দে আছেন মিষ্টান্ন বিক্রেতারা। কৃষ্ণনগরের বিখ্যাত মিষ্টান্ন বিক্রেতা গৌতম দাস জানালেন, ‘‌বিক্রির সময়ে অনেক ক্রেতা আমাদের মিষ্টি কবে তৈরি বা কতদিন ভাল থাকবে সেটা জানতে চান। আমরা মুখে সেটা বলেও দিই। কিন্তু এই নির্দেশ ঠিক কীভাবে কার্যকর করতে হবে সেটা ঠিক বুঝতে পারছি না।’‌ এই সমস্যার কথা স্বীকার করেছেন কৃষ্ণনগরের অংশুমান মোদক এবং‌ মাজদিয়ার বিখ্যাত নলেন গুড়ের সন্দেশ প্রস্তুতকারক গোপাল অধিকারীর মতো ব্যবসায়ীরাও।‌
এই নতুন নিয়ম নিয়ে ধন্দে পূর্ব বর্ধমানের মিষ্টান্ন ব্যবসায়ীরাও। প্রখ্যাত মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী সুব্রত রক্ষিত, ইন্দ্রজিৎ দত্ত ও প্রসেনজিৎ দত্তরা জানান, ‘আমরা খুচরো বিক্রেতারা মিষ্টির ওপর উৎপাদন এবং খাওয়ার সময় বেঁধে দেওয়ার নিয়মে অভ্যস্ত নই। স্বভাবতই কীভাবে এটা করা হবে সে নিয়ে রীতিমতো ধন্দে রয়েছি। যদিও মিষ্টি বিক্রি করার সময় খদ্দেরদের বলেই দিই, এই মিষ্টি ফ্রিজে রাখবেন না। দু–তিন দিনের মধ্যে খেয়ে নিতে হবে। 
‘‌বাবরসা’‌ পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনার একটি প্রসিদ্ধ মিষ্টি। এখানকার ব্যবসায়ীদের দাবি, সারাদিন যে পরিমাণ বাবরসা তৈরি হয়, তার সব বিক্রি না হলে তাঁরা রসে ফেলেন না বলে কয়েকদিন টাটকা থাকে। তাই নির্দিষ্ট করে তারিখ উল্লেখ করা সম্ভব নয়। মেদিনীপুর, খড়্গপুর, ঘাটালের মিষ্টি ব্যবসায়ীরা জানান, মিষ্টির গুণগত মান খারাপ তাঁরা দেন না। বেশির ভাগই ছোট ব্যবসায়ী। দু’‌ একজন করে কারিগর। প্রতি মিষ্টির ট্রে–তে এত সব লিখতে গেলে ব্যবসা করতে সমস্যা বাড়বে। 
বসিরহাটেও এই নিয়মের গেরোয় চিন্তিত বসিরহাটের মিষ্টি ব্যবসায়ীরা। বসিরহাটের ‘‌সুরুচি’‌–‌র কর্ণধার নিমাই দত্ত বলেন, ‘‌একেবারে অসম্ভব। যদি সত্যি আমাদের ওপর চাপানো হয় তাহলে বসিরহাটের কাঁচাগোল্লা তৈরি বন্ধ হয়ে যাবে একদিন। ওসব লাড্ডু, শোনপাপড়ি, বরফির ক্ষেত্রে চলে। বাংলার সন্দেশ, রসগোল্লা, ল্যাংচার গায়ে তারিখ লেখার দরকার পড়ে না।’‌ 
তথ্যসূত্র:‌ মিল্টন সেন, অমিতকুমার ঘোষ, বিজয়প্রকাশ দাস, স্বদেশ ভট্টাচার্য, বুদ্ধদেব দাস‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top