RadioMan: যুগের পরিবর্তনে মন্দা এসেছে রেডিওর বাজারে, সময়ের সাক্ষী রেডিওম্যান

রিয়া পাত্র: পুজো আসছে।

একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর থেকে আমরা দিন গুনতে শুরু করি। গাছের তলায় শিউলি ফুল পড়তে শুরু করে। আকাশের পেঁজা মেঘের দল জানলার ফাঁকে উঁকি মেরে দেখে যায় ঘর পরিষ্কার কদ্দুর, নদীর ধারে-জমির আলে কাশ ফুল দুলতে শুরু করে। গ্রাম-শহরের কুমারটুলিগুলিতে কাঠামোর ওপর মাটি শুকিয়ে সাদা-হলুদ রঙ পড়ে। জন্মাষ্টমী, রাধাষ্টমী-জীতাষ্টমী পেরিয়ে যায়। তখন আমাদের অপেক্ষা কেবল এক সকালের, যে সকালে ঘুম ভেঙে উঠে আলো-অন্ধকারে শুনব এক উদাত্ত কন্ঠের ‘মহিষাসুরমর্দিনী
’। আসলে বহুদিনে বহু প্রস্তুতি মিলে বাঙালির মহালয়া আসে, তারপর থেকে শুধু আঙুল গুনে দিন গুজরানের পালা। তবে মহালয়া বলতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের উদাত্ত কন্ঠের পাশাপাশি আর যে কথা আমাদের মনে আসে, বলা ভালো যা ছাড়া আমাদের মহালয়া সম্পূর্ণ হয়না, তা হল রেডিও। প্রজন্মের পর প্রজন্ম, মহালয়ার ভোরে উঠে ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে রেডিও চালিয়ে বসে থাকি আমরা। শুরু হয়, 
"আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোক মঞ্জীর; 
ধরণীর বহিরাকাশে অন্তরিত মেঘমালা... "
তবে আশ্বিনের শারদপ্রাতে এই রেডিও বাজার আগের প্রস্তুতি নেহাত কম থাকেনা। কোনও কোনও বাড়িতে এখনও রোজকার রেডিও শোনার চল আছে। তবে এফ.এম এখন ফোনেই চালায় বেশিরভাগ মানুষ। কেউ কেউ মহালয়া ছাড়া বাকি বছরভর রেডিও তুলে রাখে শোকেসে। মহালয়ার আগে মোড়ক খোলা হয় তাদের। নিয়ে যাওয়া হয় সারাইয়ের জন্য। সেসব দোকানে গত কয়েকদিন ব্যস্ততা তুঙ্গে। সেরকমই চরম ব্যস্ততায় দিন কাটাচ্ছেন ‘রেডিওম্যান’ অমিত রঞ্জন কর্মকার। কোনও রকমে নাওয়া-খাওয়া সারছেন, দোকানের আলো জ্বলছে রাত ২টো পর্যন্ত। চিন্তা একটাই, মহালয়ার আগে যেন সকলের বাড়িতে রেডিও পৌঁছে যায়। 

অমিত রঞ্জনের দোকান কুমারটুলিতে। দোকান জুড়ে থরে থরে সাজানো রয়েছে রেডিও, টেপ- রেকর্ডার। যার মধ্যে বেশিরভাগের  বয়স পঞ্চাশের ওপারে। নিজের সারা জীবন তিনি ওই একটা কাজেই নিয়োজিত করেছেন। কথা বলতে গিয়ে জানা গেল, রেডিওর প্রতি ভালোবাসা তাঁর আজন্ম। কুমোরটুলির ওই রেডিও ঠাসা দোকানে একসময়ে বসতেন তাঁর বাবা। ১৯৬৭ সালে এই দোকান শুরু করেছিলেন তাঁরা বাবা। তার প্রায় একদশক পরে, ১৯৭৬-এর শেষের দিকে এই দোকানে বসেন তিনি। সেই শুরু। ক্যালেন্ডারে বছর বদলেছে, রাজ্যের রাজনীতিতে কত পালাবদল ঘটে গিয়েছে, অমিত রঞ্জন এখনও ঘাড় নিচু করে একের পর এক রেডিও সারিয়ে তুলছেন নিবিষ্ট চিত্তে। 
রেডিও, আর রেডিওর প্রতি অমিত রঞ্জনের এই আজীবন ভালোবাসা দেখে মনে প্রশ্ন জাগে, যে সময়ে তিনি রেডিও সারিয়ে তোলার কাজ শুরু করেছিলেন, তার থেকে আজও কি রেডিও নিয়ে মানুষের উন্মাদনা এক আছে? কাজের ফাঁকে ঘাড় তুলে রেডিওম্যান জানালেন, ১৯৯৯-এর পর কাজে ভাটা আসে। আগে রেডিও নিয়ে মানুষের উন্মাদনা ছিল। একের পর এক অনুষ্ঠান, স্থানীয় সংবাদ, খেলা মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়ার উপায় আগে ছিল রেডিও, পরে ঘরে ঘরে টিভি আসে। স্বাভাবিক ভাবেই কদর কমে রেডিওর। আর তার সঙ্গে সঙ্গেই কাজ কমে যায় এই পেশায় যুক্ত মানুষদের।
যুগের পরিবর্তনে তখন বাধ্য হয়ে অনেকেই বদলে ফেলেছিলেন নিজেদের পেশা। সেই সময় তাঁর সঙ্গে যাঁরা কাজ করতেন রেডিও সারানোর, তাঁরা অনেকেই অন্য পেশায় যান। কেউ হয়তো ঘুঘনি পাউরুটি বেচতে বসেন, কেউ খুঁজে নেন অন্য কাজ। কাজ কমে গিয়েছিল তাঁর নিজেরও। তবে তিনি আর পথ বদলাননি। আজীবন যে কাজ করবেন ভেবেছিলেন, মন্দার দিনেও সেই রেডিওর থেকে হাত সরিয়ে নেননি তিনি। দিন কেটেছে কষ্টে, তবে আক্ষেপ নেই। ধৈর্য ধরে সময় ঘুরতে দেখেছেন। 
সু’সময় আসে ২০১০ থেকে। রেডিওম্যানের হাতে পুরনো গতি আসে আবার, চোখের সামনে জমতে থাকে রেডিও। ধুলো ঝেড়ে রেডিওর অসুস্থতা নির্ণয় করে সারিয়ে তুলতে শুরু করেন তিনি। অমিত রঞ্জন জানান, কুমোরটুলিতে তাঁর পুত্র-কন্যা সম যাঁরা ছবি তুলতে আসতেন, তাঁরাই তাঁর হাতে কাজের যোগান দেন। একে একে বাড়ি থেকে পুরনো রেডিও এনে ধরেন রেডিওম্যানের সামনে। কোনওটা বাবার আমলের, কোনওটা দাদু’র আমলের। কখনও এমন হয়েছে, ৩০ টাকার কাজের জন্য খরিদ্দার খুশি হয়ে পকেটে গুঁজে দিয়ে গিয়েছেন ১০০ টাকা। পুরনো রেডিও ফিরে পেয়ে খুশি হয়েছেন বাড়ির বাবা-দাদুরাও। সেভাবেই একে একে বাড়তে থাকে কাজ। করোনা কালে বাজার কিছুটা মন্দা হলেও, আবার ফিরেছে কাজের বাজার। কাজ বাড়তেই উৎসাহ বেড়েছে তাঁর, কাজে গতি এসেছে। ২০২২-এর মহালয়ার প্রাক্কালে শ্বাস ফেলার সময় নেই । এক নাগাড়ে ঘাড় নিচু করে কাজ করে যাচ্ছেন। বেথুয়াডহরি থেকে রেডিও সারাতে দিয়ে গিয়েছেন কেউ, রেডিওকে সুস্থ করে তৃপ্তির হাসি হেসে জানালেন, এবার ফোন করলেই বলবেন, মহালয়ার আগে নিয়ে যেতে। 
প্রচণ্ড ব্যস্ততার মাঝেও চারপাশের ডাঁই করা রেডিওর দিকে তাকিয়ে পরিচয় করিয়ে দিলেন। কোন রেডিও কোন সালের। কোথা থেকে কুমোরটুলির দোকানে এসেছে সেগুলি। দেখালেন ১৯৭২ সালের ফিলিপসের রেডিও, তখন অমিতরঞ্জন ক্লাস এইট-এ। সেই রেডিও দিয়েই হাতেখড়ি হয়েছিল। আজও তাঁর পাশে অতি যত্নে রয়েছে রেডিওটি। দোকানে রয়েছে ১৯৮৮ সালের রেডিও, সেটিও সচল এখনও। ১৯৫২ সালে লণ্ডনে তৈরি রেডিও এখনও চলছে কুমোরটুলির ছোট্ট দোকানটায়। মহালয়ার সকালে যখন তাঁর সারানো রেডিওতে বাজবে “আনন্দময়ী মহামায়ার পদধ্বনি অসীম ছন্দে বেজে উঠে রূপলোক ও রসলোকে আনে নব ভাবমাধুরীর সঞ্জীবন।
তাই আনন্দিতা শ্যামলীমাতৃকার চিন্ময়ীকে মৃন্ময়ীতে আবাহন।" তখনও হয়তো আলো জ্বলবে কুমারটুলির ছোট্ট ঘরটায়। হয়তো একহাতে রেডিও কানে ধরে থাকবেন অমিত রঞ্জন, আর মুখে থাকবে তৃপ্তির হাসি।

আকর্ষণীয় খবর