সঙ্ঘমিত্রা মুখোপাধ্যায়
করোনা–‌আবহে এবার খোলামেলা জায়গায় পুজো করার পরামর্শ দিয়েছে গ্লোবাল অ্যাডভাইজার বোর্ড। সেইমতো মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিও পুজো উদ্যোক্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন। প্রতিমা ও পুজোর জায়গা ছাড়া অন্য কোনও জায়গায় আচ্ছাদন না দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। উদ্যোক্তারা সেভাবেই মণ্ডপ তৈরির কাজ এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। লকডাউনে সব মণ্ডপের কাজই শুরু হয়েছে অনেক দেরিতে। মহামারী এখনও বেশ উদ্বেগজনক, তাই উদ্যোক্তা থেকে শিল্পী সবাই খানিকটা দ্বিধাগ্রস্ত। পুজোয় আড়ম্বর না থাকলেও থিমের মধ্য দিয়ে সমাজ সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দিচ্ছেন শিল্পীরা এবার। 
 বালিগঞ্জ সমাজসেবীর পুজো এবার ৭৫ বছরে। খুব জাঁকজমকের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু করোনা ও আমফানের জোড়া ধাক্কায় এবারে পুজোর ঔজ্জ্বল্য একেবারে ম্লান। সম্পাদক অরিজিৎ মৈত্রের কথায়,  ‘‌আমফানে বিধ্বস্ত সুন্দরবনের ৭৫টি পরিবারকে সর্বাঙ্গীণ সাহায্য করাই এবারের প্রধান কাজ। সেজন্য বাজেট এবার ৭৫ শতাংশ কমানো হয়েছে।’‌ ওই সবহারানো পরিবারগুলোকে শুধু আর্থিক সাহায্যই নয়, তঁাদের শিক্ষা–‌স্বাস্থ্য–‌বাসস্থানের বন্দোবস্ত করার সঙ্গে সঙ্গে স্বনির্ভর করে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্যোক্তারা। এই কাজকেই থিমের মধ্যে  ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন শিল্পী প্রদীপ দাস। প্রদীপের বক্তব্য, ‘‌লকডাউনের ফলে রুটিরুজি হারিয়েছেন বহু মানুষ, আমফানে ভেসে গেছে বহু লোকের ঘরবাড়ি। ওই অসহায়দের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনাটাই এবারের থিম ‘সেতু’। হিঙ্গলগঞ্জের সর্দারপাড়া গ্রামের ৭৫টি পরিবারকে সাহায্য করার মধ্য দিয়ে বালিগঞ্জ সমাজসেবীর সঙ্গে এঁদের যে সংযোগ তৈরি হচ্ছে— এই ভাবনাটাই ফুটে উঠবে পুজোয়। ২০ ফুট/২০ ফুট জায়গা শুধু ঢাকা হবে প্রতিমার জন্য। বাকি জায়গা খোলাই থাকবে। কাঠ, লোহা, বঁাশ দিয়েই হবে থিমের কাজ। কোনও চাকচিক্য থাকবে না। সাধারণের ধরাছোঁয়ার মধ্যেই থাকবে শিল্পের ছোঁয়া। সময়, সুযোগ, বাজেট সবই কম এবার। তাই চ্যালেঞ্জটা বেশি।’ দক্ষিণ ২৪ পরগনার বেশ কিছু বন্যাপীড়িত কারিগর কাজ করছেন। এভাবেই এঁদের কর্মসংস্থান হয়েছে। মণ্ডপ এমন খোলামেলা হবে যে ভেতরে না ঢুকেও প্রতিমা দর্শন করা যাবে। মণ্ডপে ঢুকতে হলে মাস্ক পরে, স্বাস্থ্য ও দূরত্ববিধি মানতে হবে। পাশে একটা স্বাস্থ্যশিবিরও থাকবে। কোনও দর্শক হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তঁার চিকিৎসার সুযোগ মিলবে সেখানে। ভার্চুয়াল মাধ্যমেও পুজো দেখানোর ব্যবস্থা থাকবে। 
বেলেঘাটা ৩৩ পল্লী অধিবাসীবৃন্দের পুজোর থিমও এবার আর্ত, অসহায় মানুষ। থিমের নাম ‘‌স্বজন’‌। শিল্পী শিবশঙ্কর দাসের কথায়, ‘‌রুজি হারানো অসহায় মানুষকে নিয়ে এবং অসহায় আর্তদের জন্যই এই শিল্পভাবনা।’‌ যে–‌সব উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে, তা বেশিরভাগই স্থানীয় দোকান, বাজার থেকে সংগ্রহ করা। দীর্ঘদিন লকডাউনের ফলে দোকান বন্ধ থাকায় পাড়ার ব্যবসায়ীরা যে সঙ্কটে পড়েছেন, তঁাদের কথা ভেবেই এমন ভাবনা। প্রতিমাও বানাচ্ছেন স্থানীয় শিল্পী সুশান্ত দাস। খুবই প্রতিভাবান এই শিল্পীর এবছর কাজ নেই বললেই চলে। তাই ৩৩ পল্লী ওই শিল্পীকে তাঁর প্রতিভার স্বীকৃতি দিতে চেয়েছে। জঙ্গলমহল থেকেও এসেছেন জনা দশেক কারিগর। এলাকার একটি ফঁাকা ফ্ল্যাটে এঁদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে, মাস্ক পরে এঁরা নিয়মিত মণ্ডপ তৈরির কাজ করছেন। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ মতো মণ্ডপের আচ্ছাদন এবার খুব অল্প পরিসরে হবে, বেশিরভাগ জায়গাই থাকবে খোলা, জানালেন যুগ্ম সম্পাদক অভিনব দে। এভাবেই করোনাকালে শারদোৎসবের আয়োজনে মেতে উঠছে শহর কলকাতা।

জনপ্রিয়

Back To Top