নীলাঞ্জনা সান্যাল
মাধ্যমিক তুলে দেওয়া, একজন পড়ুয়াকে পাঁচটি ভাষা শেখানো, ধ্রপদী ভাষার তালিকায় বাংলাকে না রাখা, স্নাতকের পাঠ্যক্রমকে চারবছর করা, তিন ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলা এবং কেন্দ্রীয়ভাবে পাঠ্যক্রম তৈরি–‌সহ একাধিক বিষয়ে আপত্তি জানাল রাজ্যের তৈরি ৬ সদস্যের কমিটি। শুক্রবার জাতীয় শিক্ষানীতি নিয়ে এই কমিটির রিপোর্ট জমা পড়েছে শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চ্যাটার্জির কাছে। সেই রিপোর্টে নয়া এই শিক্ষানীতিতে স্কুল ও উচ্চশিক্ষা সম্পর্কে যা বলা হয়েছে তার প্রায় প্রতিটি বিষয়েই আপত্তি জানানো হয়েছে। শিক্ষানীতি পর্যালোচনার জন্য শিক্ষাবিদ পবিত্র সরকার, নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সুরঞ্জন দাস, রবীন্দ্রভারতীর উপাচার্য সব্যসাচী বসুরায়চৌধুরি, সিলেবাস কমিটির চেয়ারম্যান অভীক মজুমদার এবং সাংসদ সৌগত রায়কে নিয়ে ছয় সদস্যের এই কমিটি গড়েছিল রাজ্য।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, নয়া এই শিক্ষানীতির বহু ক্ষেত্রে অসঙ্গতি। যা বলা হয়েছে তা ভারতের মতো ‘‌নানা ভাষা নানা মত’–‌‌এর দেশে বাস্তবসম্মত নয়। এর বদল প্রয়োজন। সংবিধানে শিক্ষা কেন্দ্র–রাজ্য যৌথ তালিকাভুক্ত। কিন্তু এই নীতির ছত্রে ছত্রে রাজ্যের সেই অধিকারে হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। শিক্ষায় একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার কথা বলা হয়েছে। ‘‌এক দেশ এক পাঠ্যক্রম’–‌এর কথা বলা হয়েছে। যা কাম্য নয়। পাঠ্যক্রম তৈরি হবে কেন্দ্রীয়ভাবে। যা মেনে পড়াতে হবে রাজ্যকে। এতে ইতিহাস এবং ভূগোল পড়তে রাজ্যের পড়ুয়ারা উৎসাহ হারাবে। অজয়, দামোদরের মতো নদী চেনার আগে তাকে যমুনা চিনতে বাধ্য করা হবে। ইতিহাসের ক্ষেত্রে বাংলার পাল–‌সেন বংশের ইতিহাস জানার সুযোগ থাকবে না। স্নাতকের পঠনপাঠন চারবছর এবং স্নাতকোত্তরের পাঠ্যক্রম একবছরের করার প্রস্তাব রয়েছে। এ ব্যাপারে আপত্তি জানিয়ে রাজ্যে বর্তমানে তিনবছরের স্নাতক এবং দু’‌বছরের স্নাতকোত্তরের যে পাঠ্যক্রম চালু আছে তা বহাল রাখার কথাই বলা হয়েছে। নয়া শিক্ষানীতিতে তিন ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলা হয়েছে। ১)‌‌ প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে গবেষণা হবে। ২)‌‌ মধ্যম মানের বিশ্ববিদ্যালয়, পড়ানো এবং গবেষণা দুই–‌ই হবে। ৩)‌‌ আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধুই স্নাতকের পড়াশোনা হবে। কোনও গবেষণা নয়। কমিটির সদস্যদের তরফে এভাবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গবেষণাকে পৃথক করা এবং চার বছরের স্নাতক না হলে গবেষণার সুযোগ না পাওয়ার বিষয়টিতেও আপত্তি জানানো হয়েছে।  নতুন শিক্ষানীতিতে স্কুল স্তরে প্রথম ও দ্বিতীয় এবং তার আগের তিন বছরের প্রাক–প্রাথমিক মিলিয়ে পাঁচবছরের ভিত তৈরি, তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রস্তুতি, ষষ্ঠ থেকে অষ্টম পর্যন্ত মাঝারি পর্বের শিক্ষা এবং নবম থেকে দ্বাদশ পর্যন্ত শিক্ষার কথা বলা হয়েছে। নবম থেকে দ্বাদশের মধ্যে আটটি সেমেস্টারের কথা বলা হয়েছে। তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন কমিটির সদস্যরা। স্কুলগুলির যে পরিকাঠামোগত বদল প্রয়োজন তার অর্থ কে দেবে?‌ এই প্রশ্ন তোলা হয়েছে। মাধ্যমিক পাশ অনেক চাকরির ক্ষেত্রে একটা যোগ্যতা। সেই মাধ্যমিক বা দশম শ্রেণির পরীক্ষা তুলে দেওয়ার বিরোধিতা করেছে কমিটি। পঞ্চম পর্যন্ত মাতৃভাষার সঙ্গে অন্য একটি ভাষা, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে একটি ধ্রুপদী ভাষা, অষ্টম থেকে বিদেশি ভাষা— এতগুলো ভাষার বিরোধিতাও করা হয়েছে। বিকাশভবন সূত্রে খবর, মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে কথা বলে রাজ্যের আপত্তির দিকগুলি কেন্দ্রকে জানানো হবে।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top