আলোক সেন
বাঁকুড়া, ২৩ নভেম্বর

উন্নয়ন প্রকল্পের ডালি নিয়ে দুয়ারে দুয়ারে পৌঁছে যাবে সরকার। মানুষের হাতে পরিষেবা পৌঁছে দিতে আধিকারিকরা গ্রামে গ্রামে যাবেন। হবে শিবির। ১ ডিসেম্বর থেকে ৩১ জানুয়ারি প্রতিটি ব্লকে প্রতিদিন সকাল ১১ থেকে শিবির হবে।
সোমবার খাতড়ার সিদো–কানহু স্টেডিয়ামে প্রশাসনিক সভা করে একথা জানিয়ে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। এদিন বাঁকুড়া জেলার ১৬টি নতুন প্রকল্পের উদ্বোধন করেন তিনি। যার জন্য খরচ পড়েছে ১৭৬ কোটি টাকা। আরও ১৬টি নতুন প্রকল্পের শিলান্যাস করবেন। তার জন্য খরচ হবে ১৭৭ কোটি টাকা। ২৫টি প্রকল্পে ২,১০০ জন উপভোক্তার হাতে এদিন পরিষেবা তুলে দেওয়া হয়।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‌ব্লকে ব্লকে যে সব পরিষেবা এখনও বকেয়া, ৩০ জানুয়ারি গান্ধীজির তিরোধান দিবস পর্যন্ত তা বিলি করার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে গ্রামে গ্রামে গিয়ে শিবির করতে হবে। অর্থাৎ, দুয়ারে দুয়ারে যাবে সরকার। সেখানে যদি কোনও মানুষ বলেন, তিনি কোনও একটি প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছেন না, তিনি ওই প্রকল্প পাওয়ার যোগ্য হলে তাঁকে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। জনগণনার কাজ যেমন চলছে, তেমনই শিবির করে এই কাজও ওই সময়ের মধ্যে শেষ করতে হবে। স্কলারশিপ বিলির কাজও আর ফেলে রাখা যাবে না। স্কলারশিপ হবে ‘হান্ড্রেড পার্সেন্ট‌।’‌
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‌এদিন আসার পথে কয়েকজন যুবক আমার সঙ্গে দেখা করে অভিযোগ করেছেন, তাঁরা একটি কেন্দ্রীয় প্রকল্পে কাজ করতেন। কিছুদিন কাজ করার পর সেই প্রকল্প বন্ধ হয়ে যায়। ফলে, ওই যুবকরা বেকার হয়ে পড়েছেন।’‌ তিনি অভিযোগ করেন, ‘‌কেন্দ্রীয় সরকার এরকম ভূরি ভূরি প্রকল্প চালু করে। ৩ বছর বা ৫ বছর পর সেই প্রকল্প যখন বন্ধ করে দেওয়া হয়, তখন সেই সব মানুষ বেকার হয়ে পড়েন। এ রাজ্যে এমন ঘটনা ঘটে না। এ রাজ্যে একজনও অস্থায়ী কর্মীর কাজ যায়নি। বরং চুক্তিভিত্তিকদের কাজ আমরা ৬০ বছর পর্যন্ত করে দিয়েছি। শুধু তাই নয়, অবসরকালে তাঁরা এককালীন পাবেন ৩ লক্ষ টাকা। আমরা এই রাজ্যে ৪০ শতাংশ বেকারি কমিয়েছি। গত কয়েক মাস ধরে করোনার কারণে সবই তো বন্ধ ছিল। তার জেরে অনেক রাজ্য সরকারি কর্মীদের মাইনে দিতে পারছে না। কোনও কোনও রাজ্য ৩০ শতাংশ পর্যন্ত মাইনে কমিয়ে দিয়েছে। আবার কোনও রাজ্য প্রতি মাসে এক দিনের বেতন কেটে নিচ্ছে। এ রাজ্যে সে সব কিছু হয়নি। আমরা এই জেলায় ৩২ হাজার পরিযায়ী শ্রমিককে কাজ দিয়েছি। শুধু এই জেলাতেই নয়, রাজ্যের সব জেলায় কাজ দেওয়া হয়েছে। বেশি পরিযায়ী শ্রমিক মুর্শিদাবাদে, তাঁদেরও কাজ দেওয়া হয়েছে।’‌
বাঁকুড়া জেলার কথা তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‌আমাদের সরকার আসার আগে মুকুটমণিপুর খাঁ খাঁ করত। এখন সেই মুকুটমণিপুর সৌন্দর্যে ভরে গেছে। অনেক কাজ হয়েছে এই খাতড়া ব্লকেও। হাতির হানায় মৃত্যু হলে আমরা ব্যবস্থা করেছি পরিবারের একজন হোমগার্ডের চাকরি পাবে। মাওবাদী হানায় নিহত এবং নিরুদ্দেশদের জন্য ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করেছি। জঙ্গলমহলের যুবকদের ১০ হাজার জনকে জুনিয়র কনস্টেবল পদে চাকরি দেওয়া হয়েছে। চাকরি দেওয়ার সময় বিজেপি, সিপিএম দেখা হয়নি। এ রাজ্যে বিরোধীরা পদে পদে মামলা করে সরকারকে কাজ করার ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি করে। পুরোহিতদের জন্য আমরা ভাতা চালু করেছি। যাঁরা ২৪ ঘণ্টায় পুরোহিতের কাজ করেন, অন্য কোনও কাজের সঙ্গে যুক্ত নন, তাঁরা এই ভাতা পাবেন। আপাতত ১০০০ টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। সরকারের হাতে টাকা এলে তা বাড়িয়ে ২০০০ করে দেওয়া হবে। ‘‌মাটির সৃষ্টি’‌ প্রকল্পে এই জেলার ৮ হাজার বিঘে পতিত জমিতে কাজ চলছে। চাষের অযোগ্য জমিকে চাষযোগ্য করে তোলা হচ্ছে। এখানে আগামী দিনে কয়েক লক্ষ ছেলেমেয়ের কর্মসংস্থান হবে। 

এক সময় এই জেলায় পানীয় জলের হাহাকার চলত। আমরা ৪ হাজার কোটি টাকা খরচ করে প্রায় ৭৫ শতাংশ মানুষের কাছে পানীয় জল পৌঁছে দিয়েছি। রাজ্য জুড়ে রাস্তার হাল আমরা আমূল বদলে দিয়েছি। সমস্যা হচ্ছে ছোট রাস্তাতেও ভারী ভারী গাড়ি যাতায়াত করে রাস্তাগুলিকে নষ্ট করে দিচ্ছে। পুলিশকে দেখতে হবে, ছোট রাস্তাতে যেন ভারী ভারী গাড়ি যেতে না পারে।’‌ তিনি বলেন, ‘‌রাজ্যের ৯৯ শতাংশ কৃষককে আমরা কিসান ক্রেডিট কার্ড দিয়েছি। আগামী জুন মাস পর্যন্ত রেশনে খাদ্যসামগ্রী পাওয়া যাবে বিনামূল্যে। আগামী দিনে মেয়াদ আরও বাড়িয়ে দেওয়া হবে। আগে মেয়ে জন্মালে বাবা–মায়েরা মারাত্মক দুশ্চিন্তায় পড়তেন, কী করে মেয়ের বিয়ে দেবেন। আমরা ৭০ লক্ষ মেয়েকে ‘‌কন্যাশ্রী’‌ প্রকল্প দিয়েছি। এখন মেয়েদের বিয়ে এবং পড়াশোনার জন্য বাবা–মায়েদের দুশ্চিন্তা করতে হয় না।’‌
মমতা বলেন, রাজ্যের সাড়ে ৭ কোটি মানুষকে ‘‌স্বাস্থ্যসাথী’‌ কার্ড দিয়েছি। সেই কার্ডে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত চিকিৎসার সুযোগ পাওয়া যাবে। শুধু সরকারি বা রাজ্যের বেসরকারি হাসপাতালগুলিতেই নয়, দিল্লির এইমসে, এমনকী ভেলোরেও। তাই যত দিন বাঁচব, মানুষের জন্য কাজ করে যাব। যখন থাকব না, তার আগে টিম তৈরি করে দিয়ে যাব। কোনওমতেই বাংলার বদনাম হতে দেব না। কেন্দ্র বলছে, ওরা নাকি করোনার জন্য প্রতিষেধক দেবে। বলবে এখনই দিচ্ছি, কিন্তু দেবে হয়তো ৬–৮ মাস পরে। আমরা এই রাজ্যে করোনা রোগীদের জন্য বিনা পয়সার চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছি। তাঁদের চিকিৎসার যাবতীয় খরচ রাজ্য সরকার বহন করে। আমাদের সরকার সর্বস্তরের মানুষের জন্য কিছু না কিছু প্রকল্প চালু করেছে, যা দেশের আর কোনও রাজ্যে নেই।’‌
জেলায় তিনদিন সফরের প্রথম দিনে এই প্রশাসনিক বৈঠক ঘিরে এলাকার মানুষের উৎসাহ ছিল প্রবল। প্রকল্পগুলির সঙ্গে যুক্ত সাধারণ মানুষ ছাড়াও দলে দলে এলাকার আদিবাসীরা ধামসা–মাদল নিয়ে অনুষ্ঠানে শামিল হয়েছিলেন। মন্ত্রী শ্যামল সাঁতরা, সাংসদ কল্যাণ ব্যানার্জি, সভাধিপতি মৃত্যুঞ্জয় মুর্মু, দলীয় ৮ জন বিধায়ক ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন মুখ্য সচিব আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়, স্বরাষ্ট্র সচিব হরিকৃষ্ণ দ্বিবেদী, পুলিশের আইজি সঞ্জয় সিং, জেলাশাসক এস অরুণ প্রসাদ, পুলিশ সুপার কোটেশ্বর রাও প্রমুখ।‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top