নীলাঞ্জনা সান্যাল: কেউ বললেন, অসঙ্গত। কেউ বললেন, স্বৈরতান্ত্রিক। কেউ বললেন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আবার কেউ বললেন, গৈরিক।
দিল্লি থেকে ঘোষিত জাতীয় শিক্ষানীতি নিয়ে শিক্ষাবিদ‌, শিক্ষক সংগঠন, শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত মানুষের এটাই মতামত। জোরদার আপত্তি। কড়া সমালোচনা। অনেকে বলেছেন, শিক্ষা একটি যৌথ বিষয়। সেখানে রাজ্যের সঙ্গে কোনও আলোচনা ছাড়া এমন ঘোষণা হয় নাকি!‌  
কে কী বললেন:‌
বলা হয়েছে ২০২৫ সালের মধ্যে সমস্ত শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষার আওতায় আনা হবে। কিন্তু স্বাধীনতার ৭৩ বছরে যা হয়নি তা এই পাঁচ বছরে কীভাবে হবে তা নিয়ে সন্দেহ আছে। বাচ্চারা শখ করে স্কুলে আসে না এমন নয়। তারা পরিবারের আর্থিক অনটনের কারণে ছোট থেকেই কোনও না কোনও রোজগারে লেগে পড়ে। এই শিশুদের স্কুলে আনতে গেলে তাদের পরিবারকে আগে আর্থিক নিশ্চয়তা দিতে হবে। সেটা পাঁচ বছরে হবে কিনা সন্দেহ আছে।
মাধ্যমিক তুলে দেওয়া অত্যন্ত অসঙ্গত একটা সিদ্ধান্ত। কারণ মাধ্যমিক হচ্ছে আমাদের দেশের স্কুলস্তরের প্রথম বোর্ড পরীক্ষা। মাধ্যমিক পাশ অনেক চাকরির ক্ষেত্রে একটা যোগ্যতা। এই পরীক্ষাটা তুলে দিলে অনেক ছেলেমেয়ের অসুবিধা হবে। দশমের পরও অনেকে স্কুলছুট হয়। তার আগে একটা সার্টিফিকেট পেলে অনেক জায়গায় সুবিধা হয়। তাই মাধ্যমিক তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক বলে আমার মনে হয় না। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে অনার্স চার এবং স্নাতকোত্তর এক বছরের সিদ্ধান্তটিকেও আমার ঠিক সঙ্গত বলে মনে হয়নি। কারণ যত আমরা বড় হই, বুদ্ধি তত পরিণত হয়। অনার্সটা ঠিক আছে কিন্তু স্নাতকোত্তরটা ২ বছরই ঠিক ছিল। পদার্থবিদ্যা পড়ে সঙ্গীত বা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সঙ্গে সৃষ্টিশীল কিছু পড়ার সিদ্ধান্তটিকে যদি আমাদের দেশে চালানো যায় তবে ভাল হবে। এটা বিদেশে আছে। নাম বদলে মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক শিক্ষামন্ত্রক হয়েছে। ইউজিসি উঠে গিয়ে একটি নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার কথা বলা হচ্ছে। এগুলো কতটা কী ভাল হল তা কাজ দেখে বোঝা যাবে।
পবিত্র সরকার (‌‌শিক্ষাবিদ)‌‌
এটাকে জাতীয় শিক্ষানীতি না বলে ভ্রান্ত শিক্ষানীতি বলা উচিত। শিক্ষা ব্যবস্থাকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হল। পয়সা খরচ করে বিদেশ ভ্রমণ করে এসে এই নীতি তৈরি করেছেন এঁরা। ১৩০ কোটির দেশে যেখানে দারিদ্রসীমার নীচে বাস করে এমন ছাত্রছাত্রীরা পড়তেই পায় না, তাদের পড়ানোর ব্যবস্থা না করে পদার্থবিদ্যার সঙ্গে ফ্যাশন ডিজাইন পড়তে পারবে, পড়তে পড়তে চলে গেলাম, আবার খানিকটা খেলাধুলো করে এসে পরীক্ষা দিলাম ইত্যাদি বলা হচ্ছে। ১৩০ কোটির দেশে এই নীতি চলবে না। সমস্ত ভেঙে পড়বে। যাঁরা এটা তৈরি করেছেন তাঁরা চিন্তাভাবনা করেননি। আমাদের দেশের মাটির মানুষের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ এঁদের নেই। এদিকে অনার্সের চতুর্থ বর্ষে গবেষণার কথা বলা হচ্ছে। সমস্ত জিনিসটা দেখে মনে হচ্ছে গোড়া কেটে আগায় জল দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। আমাদের দেশে মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়ে একটা সার্টিফিকেট পাওয়া যায়। দ্বাদশ পর্যন্ত পড়ার জন্য প্রতি সেমেস্টারে ড্রপ আউট হবে।
নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী (‌‌শিক্ষাবিদ)‌‌
‌২০৩৫ সালের মধ্যে অ্যাফিলিয়েটেড কলেজ তুলে দিতে চাইছে। সেই সব কলেজের ভবিষ্যৎ কী হবে, আমার কাছে পরিষ্কার নয়। শিক্ষক ও ছাত্ররা কোথায় যাবে?‌ সমস্যা আরও বাড়বে। প্রাথমিক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া উচিত ছিল। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করে। 

সেখানে যেন কোনও হস্তক্ষেপ না হয়। সব অ্যাফিলিয়েটেড কলেজ তুলে দেওয়া হলে আমরা অবশ্যই বিরোধিতা করব। যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলি রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করে, সে–‌সব নিয়ে কী হবে, তা বলা প্রয়োজন। 
সৌগত রায়, তৃণমূল সাংসদ
‌‌
দেবাশিস সরকার
(‌‌উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের প্রাক্তন সচিব)‌‌
এই শিক্ষানীতি আগামী দিনে প্রাক–প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত শিক্ষাক্ষেত্রে ছাত্রছাত্রীদের অন্তর্ভুক্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলবে। বিশাল অংশের ছেলেমেয়ের কাছে শিক্ষা একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষার কথা বলা হচ্ছে। প্রযুক্তি যার কাছে থাকবে সে সুযোগ পাবে, যার কাছে নেই সে দূরে সরে যাবে। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত ক্লাস্টারের কথা বলা হচ্ছে। মানে শিক্ষার কাঠামোকে সঙ্কুচিত করা হচ্ছে। এবং বেসরকারি পুঁজির হাতে শিক্ষাকে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। আর এসব করার ফলে যাতে সামাজিক প্রতিক্রিয়া না হয় তার জন্যই দুটো ঘোষণা। ১)‌‌ জিডিপি–‌র ৬ শতাংশ শিক্ষাক্ষেত্রে বরাদ্দ করা হবে। কিন্তু বাস্তবে ২০১৪ থেকে এই সরকার শিক্ষাখাতে ব্যয়বরাদ্দ ধাপে ধাপে কমিয়ে এনেছে। ২)‌‌ ৩ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত বাধ্যতামূলক শিক্ষার কথা বলছে। কিন্তু ২০০৯ সালে শিক্ষার অধিকার আইন চালু হয়। যেখানে ৬ থেকে ১৪ বছর পর্যন্ত বাধ্যতামূলক শিক্ষার কথা বলা হয়েছিল। শর্ত ছিল পাশ–ফেল তুলে দিয়ে নিরবচ্ছিন্ন মূল্যায়ন। যা ব্যর্থ হয়েছে। এই সরকার সেই পাশ–ফেলকে ফিরিয়ে এনে ৩ থেকে ১৮ বছরের সব পড়ুয়াকে শিক্ষা ব্যবস্থায় আনার অঙ্গীকার করছে, যার কোনও বাস্তব ভিত্তি নেই।  
অভীক মজুমদার
(‌‌সিলেবাস কমিটির চেয়ারম্যান)‌‌
গণতন্ত্র এবং সংবিধান বিরোধী নীতি। রাজ্যের সঙ্গে কোনও রকম আলোচনা ছাড়া, সংসদে কোনও আলোচনা ছাড়া কীভাবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে পাশ হল?‌ স্কুল এবং উচ্চশিক্ষা নিয়ে রাজ্যের তরফে কিছু পর্যবেক্ষণ পাঠানো হয়েছিল। তার কিছুই এই নীতিতে নেই। শিক্ষা যৌথ তালিকাভুক্ত। সেখানে রাজ্যের সঙ্গে আলোচনা না করাটা সংবিধান বিরোধী। এই শিক্ষানীতি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এতে আধুনিক শিক্ষা বিজ্ঞান নেই। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। যা বহুত্ববাদী ভারতবর্ষের পক্ষে বিপজ্জনক। শিক্ষার পুরো পরিকাঠামো বদলের কথা বলা হয়েছে। তার জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। সেটা কে দেবে?‌ দিন দিন তো শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে কেন্দ্র বরাদ্দ কমাচ্ছে। আর রাজ্যে বকেয়া অর্থের পরিমাণ বাড়ছে। এভাবে ফতোয়া জারি না করে রাজ্যগুলির মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল।
কেশব ভট্টাচার্য
(‌‌সভাপতি, এআইফুকটো)‌‌
করোনা পরিস্থিতিতে যেভাবে কোনও আলোচনা ছাড়া এই শিক্ষানীতিকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা অনুমোদন দিল তা দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ বলে মনে হয়েছে। এই শিক্ষানীতিতে শিক্ষার কেন্দ্রীয়করণ, বাণিজ্যিকীকরণ এবং বেসরকারীকরণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সকলের জন্য শিক্ষা আর রইল না। এখানে খুব ‘‌এলিট’‌ একটা শিক্ষা ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। এটা চালু হলে প্রান্তিক অংশের মেধাবী পড়ুয়াদের সুযোগ ক্রমশ সঙ্কুচিত হবে। উচ্চশিক্ষায় পড়ুয়াদের আসার সুযোগ কমবে। দরিদ্র মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের সুযোগ–সুবিধা কমবে।
গৌতম মাইতি
(‌‌সম্পাদক, আবুটা)‌‌
এই শিক্ষানীতি জনবিরোধী। করোনা পরিস্থিতিকে ব্যবহার করে চালু করা হল। এর ছত্রে ছত্রে রয়েছে ‘‌গৈরিক’‌ ছোপ। জাতীয় শিক্ষানীতির নামে নিখুঁত ‘‌মার্কেট মডেল’‌। ফি বাড়বে, লাগাম ছাড়া সেল্ফ ফিনান্সিং কোর্স চালু হবে। সমাজের প্রান্তিক স্তর থেকে আর কেউ শিক্ষার সুযোগ পাবে না।  স্বাধীনতার পর দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে কুক্ষিগত করে রাখার এমন নগ্ন ফ্যাসিবাদী চেষ্টা আগে দেখা যায়নি।
সাংখ্যায়ন চৌধুরি
(সম্পাদক, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি)‌‌
এই নীতি যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় শিক্ষাক্ষেত্রে রাজ্যের ভূমিকার ওপর বড় আঘাত। এই নীতি উচ্চশিক্ষায় বেসরকারীকরণকেই উৎসাহিত করবে। বিদেশি পুঁজির কাছে দেশের শিক্ষার দরজা খুলে দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া কিন্তু মেধাবী পড়ুয়াটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
পার্থপ্রতিম রায়
(সম্পাদক, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি)‌‌
এই শিক্ষানীতি ভারতবর্ষের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ১০০ বছর পিছিয়ে দেবে। এতে বিশেষ একটি রাজনৈতিক দলের মতাদর্শকেই মান্যতা দেওয়া হয়েছে। রাধাকৃষ্ণণ এবং কোঠারি কমিশন বিশ্ববিদ্যালয়ের যে স্বাধিকারের কথা বলেছিল, তাকে এই নীতিতে নস্যাৎ করে দেওয়া হয়েছে। উচ্চশিক্ষায় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বদলে স্বৈরতান্ত্রিকতা তৈরি হবে।
তরুণ নস্কর
(‌‌সম্পাদক, সারা বাংলা সেভ এডুকেশন কমিটি)‌‌
এই শিক্ষানীতি মধ্যযুগীয় ধ্যানধারণার জন্ম দিতে সাহায্য করবে। গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষার মূলে আঘাত করবে। নবম থেকে দ্বাদশ পর্যন্ত সেমেস্টার পদ্ধতি চালু করায় স্কুলস্তর থেকেই শিক্ষার গভীরতা হ্রাস পাবে। এমন একটা সময় এই নীতি চূড়ান্ত করা হল যখন মানুষ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করতে পারবে না।

জনপ্রিয়

Back To Top