অভিজিৎ চৌধুরি, সুজাপুর (মালদা): মালদার সুজাপুরে প্লাস্টিকের কারখানায় ভয়াবহ বিস্ফোরণে মৃত্যু হল ৬ শ্রমিকের। জখম হয়েছেন কমপক্ষে ১০ জন। বৃহস্পতিবার সকালে মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছে কালিয়াচক থানার সুজাপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের স্কুলপাড়া এলাকায়। ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কের ধারে কারখানাটি। বিস্ফোরণের পর কারখানার মালিক আলিফ শেখ পালিয়ে গিয়েছেন। কারখানার কাটিং মেশিন গরম হয়ে যাওয়ায় এই বিস্ফোরণ বলেই মনে করা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কারখানাটি বেআইনি। 
বিস্ফোরণ প্রসঙ্গে নবান্নে মুখ্যসচিব আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‌জেলা প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। মৃতদের ২ লক্ষ ও আহতদের ৫০ হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।’‌ বিস্ফোরণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মালদায় পৌঁছে মৃত ও আহতদের পরিবারের হাতে ২ লক্ষ টাকা এবং ৫০ হাজার টাকার চেক তুলে দেন রাজ্যের মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম।
যথারীতি এই ঘটনার পর বিজেপি রাজনীতি করার সুযোগ ছাড়েনি। মালদা উত্তর কেন্দ্রের সাংসদ খগেন মুর্মু বলেন, ‘‌বেআইনিভাবে এ রকম বহু প্লাস্টিকের কারখানা চলছে। বোমা বিস্ফোরণ হয়েছে। চোখে ধুলো দিতে কাটিং মেশিন বিস্ফোরণের কথা বলা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনআইএ–র সাহায্য নিয়ে প্রকৃত ঘটনার তদন্ত করা হোক।’‌ এনআইএ তদন্তের দাবি তোলায় বিজেপি–কে বিঁধেছেন ফিরহাদ হাকিম। তিনি বলেন, ‘‌বিজেপি সব কথাতেই এনআইএ তদন্তের দাবি তোলে। অথচ এই পরিস্থিতির পর ওদের দলের কাউকেই দেখা যায়নি। মুখ্যমন্ত্রী সঙ্গে সঙ্গে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন। কলকাতা থেকে হেলিকপ্টারে মালদা এসেই পরিবারগুলির হাতে টাকা তুলে দিয়েছি। এই মর্মান্তিক ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে তাঁদের সমবেদনা জানানো উচিত। এনআইএ–র কাজ দেশের সুরক্ষা। অনেক বড় তাদের ব্যাপ্তি। তাদের প্রতি শ্রদ্ধা আছে। কারখানায় দুর্ঘটনার তদন্ত করা এনআইএ–র কাজ নয়।’
সন্ধেয় রাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তর থেকে জানানো হয়, মালদার সুজাপুরে প্লাস্টিক কারখানায় আজকের দুর্ঘটনা আসলে উৎপাদনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত। কোনও কোনও মহল থেকে দায়িত্বজ্ঞানহীন ভাবে যে বেআইনি বোমা কারখানার কথা বলা হচ্ছে, দুর্ঘটনার সঙ্গে তার কোনও সম্পর্কই নেই। জরুরি তদন্তের পর জেলাশাসক এবং পুলিশ সুপার ঘটনাস্থল থেকে রাজ্য প্রশাসনের কাছে তেমনই খবর পাঠিয়েছেন। ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। একজন প্রবীণ মন্ত্রী ঘটনাস্থলে উড়ে গেছেন। এ সময় সঠিক তথ্য দেওয়া উচিত। ক্ষতিগ্রস্তদের ও তঁাদের পরিবারের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
বিজেপি সাংসদের বক্তব্য উড়িয়ে দিয়ে তৃণমূল সাংসদ তথা দলের জেলা সভাপতি মৌসম নুর বলেন, ‘‌পুলিশ–প্রশাসন যেখানে বলছে কারখানার কাটিং মেশিন থেকে বিস্ফোরণ ঘটেছে, সেখানে বিজেপি সাংসদ বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছেন।’‌ এদিন ঘটনাস্থলে তদন্তে যান জেলাশাসক রাজর্ষি মিত্র, পুলিশ সুপার অলোক রাজোরিয়া–‌সহ প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্তারা। আসছেন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরাও। মৃতরা হলেন রাজীব খান (১৮), মুস্তাফা শেখ (৪০), আজিজুর রহমান (১৩) আবদুল রহমান (২৮)। মৃত আরেকজনের পরিচয় জানা যায়নি। জখমরা হলেন আবু শাহেদ (৪৫), মুসা শেখ (৫০), প্রমীলা মণ্ডল (৪৫), জুলি বেওয়া (৩৫) এবং জুলেখা বিবি (২৫), আবু শায়েব খান (‌৫৫)‌। মৃত এবং আহতদের বাড়ি সুজাপুর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায়। 

বিস্ফোরণের সময় প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকা কেঁপে ওঠে। তীব্রতা এতটাই ছিল যে, কারখানার আশপাশে কয়েকটি বাড়ির চাল পর্যন্ত উড়ে যায়। বিস্ফোরণের পর ওই কারখানার প্রতিটি সামগ্রী দুমড়ে–মুচড়ে যায়। ভেঙে পড়া ইট ও লোহার পিলারের তলায় চাপা পড়ে থাকেন বহু শ্রমিক। রক্তাক্ত অবস্থায় শ্রমিকদের উদ্ধারের পর মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি শুরু করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ঘটনাস্থলে যায় কালিয়াচক থানার বিশাল পুলিশবাহিনী এবং দমকলের ইঞ্জিন। মালদার পুলিশ সুপার অলোক রাজোরিয়া বলেন, ‘‌ওই প্লাস্টিক কারখানায় ২০ জন শ্রমিক কাজ করছিলেন। এদের মধ্যে ৫ থেকে ৭ জন মহিলা। আহতদের চিকিৎসা চলছে মালদা মেডিক্যালে। অনেকের চোখে ও মাথায় আঘাত রয়েছে।’‌ 
এদিন মালদা বিমানবন্দরে নেমে সরাসরি কনভয় নিয়ে ফিরহাদ চলে যান সুজাপুরের স্কুলপাড়া এলাকায়। সেখানে মৃত এবং আহতদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন। ফিরহাদ হাকিমের সঙ্গে ছিলেন সাংসদ মৌসম নুর–‌সহ জেলা পুলিশ প্রশাসনের কর্তারা। পরিবারের হাতে ক্ষতিপূরণের অর্থ তুলে দিয়ে মালদা মেডিক্যালে আহতদের সঙ্গে দেখা করেন ফিরহাদ।


এই সেই কারখানা। এখানেই ঘটেছে বিস্ফোরণ।
নিহতদের পরিবারের হাতে ক্ষতিপূরণের চেক তুলে দিচ্ছেন মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম।
হাসপাতালে আহতদের দেখতে হাজির সাংসদ মৌসম নুর। ছবি:‌ প্রতিবেদক

‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top