আলোক সেন
বাঁকুড়া, ২৪ নভেম্বর

আলু, পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে মঙ্গলবার বাঁকুড়ায় প্রশাসনিক বৈঠকে কেন্দ্রকে তোপ দাগলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। বললেন, ‘‌কেন্দ্রের আইনের ফলে আলু, পেঁয়াজ চলে যাচ্ছে কালোবাজারিদের হাতে। কেন্দ্র কয়েক মাস আগে একটা আইন করেছে কৃষকদের জন্য। সেই আইনের ফলে দেশের সর্বনাশ হচ্ছে। আলু, পেঁয়াজ, চালের দাম দিন দিন অগ্নিমূল্য হচ্ছে। কিন্তু তাতে কৃষক কিংবা সাধারণ মানুষ কারোরই কোনও উপকার হচ্ছে না। ওই পণ্যগুলি চলে যাচ্ছে কালোবাজারিদের হাতে। টাকা লুটে নিচ্ছে তারাই।’‌
মুখ্যমন্ত্রী জানান, তিনি প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছেন, বলেছেন, যাতে ওই পণ্যগুলির দাম নিয়ন্ত্রণে থাকে, হয় আপনি দেখুন, নতুবা আমাদের দেখতে দিন। সেই চিঠির কোন উত্তর তিনি পাননি। তিনি বলেন, ‘আগে চাল এবং আলু চাষিদের কাছ থেকে সরাসরি কেনা হত। তাতে চাষিরাও অর্থ পেতেন। মানুষও সুবিধাজনক দামে কিনতে পারতেন। এই আইনের ফলে সর্বনাশ হবে।’‌ এই সময় রাজ্যের বিভাগীয় আধিকারিক মুখ্যমন্ত্রীকে জানান, আলুর দাম বেড়ে গেলে তাঁরা বাজারে হানা দিয়েছিলেন। ব্যবসায়ীরা তাঁদের জানিয়েছেন, ৫ জুনের পর থেকে আপনাদের আর এ ব্যাপারে কথা বলার এক্তিয়ার নেই। এই কথা শুনেই অসন্তুষ্ট মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‌রাজ্য সরকারের এক্তিয়ার আছে কিনা পরে দেখা যাবে।’‌
বৈঠকে মুখ্যসচিব আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হরিকৃষ্ণ দ্বিবেদী, রাজ্য পুলিশের আইজি সঞ্জয় সিং এবং জেলাশাসক এস অরুণ প্রসাদ, জেলার সমস্ত এসডিও, বিডিও, বিধায়ক, পঞ্চায়েতের কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী এক–‌একটি দপ্তর ধরে সেই দপ্তরের কাজের খতিয়ান সংশ্লিষ্ট জেলা আধিকারিকের কাছে জানতে চান। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‌বাঁকুড়া জেলার জন্য একটি বিশেষ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। তা হল মাটির সৃষ্টি। এই জেলায় এবং পুরুলিয়ায় প্রচুর পতিত জমি রয়েছে, যেখানে চাষের কাজ হয় না। সেই জমিকে চাষের উপযুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছি। জেলার ১৭১৬ একর জমিকে এই প্রকল্পের জন্য নেওয়া হয়েছে। ২৪টি কো–অপারেটিভ সোসাইটি এবং ফার্মার গ্রুপকে এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ইতিমধ্যে অনেকটা কাজ এগিয়েছে। ৫৫টি ফলের বাগান গড়ে তোলা হয়েছে। তাতে নানা ফলের গাছ লাগানো হয়েছে।’‌
রাস্তা প্রসঙ্গে বলেন, ‘‌স্বাধীনতার পর থেকে এই জেলায় ৬৫–৭০ হাজার কিমি রাস্তা তৈরি হয়েছিল। আমরা গত ৮ বছরে নতুন করে প্রায় আড়াই লক্ষ কিমি রাস্তা তৈরি করেছি।’‌ বনবিভাগের কাজের প্রসঙ্গে বলেন, ‘‌এখন থেকে হাতির হানায় মানুষের মৃত্যু হলে, পরিবারের একজন চাকরি পাবে। সেই সঙ্গে পরিবারটি ৪ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণও পাবে। ক্ষতিপূরণের কাজ যাতে বকেয়া পড়ে না থাকে, তা তাঁদের দেখতে হবে। অনগ্রসর কল্যাণ দপ্তরের আধিকারিকদের নির্দেশ দেন, কাস্ট সার্টিফিকেট দেওয়ার একটি কাজও যেন পড়ে না থাকে। নারী এবং শিশু কল্যাণ দপ্তরের আধিকারিকদের কাজে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বলেন, ‘‌সামান্য যে কাজটুকু পড়ে আছে তাও আপনারা শেষ করে দিন। 

শিক্ষাশ্রী, কন্যাশ্রী, ঐক্যশ্রী প্রকল্পের টাকা বকেয়া ফেলে রাখা চলবে না।’‌ কৃষক বন্ধুদের প্রসঙ্গে বলেন, ‘‌তাঁদের আড়াই হাজার টাকা করে দুবার দেওয়া হয়। মে মাসে যে টাকাটা দেওয়া হত, সেটা জানুয়ারিতেই দিয়ে দেওয়া হবে। তাছাড়া চাষিদের শস্যবিমা পুরোটাই রাজ্য সরকার মিটিয়ে দেয়। তাঁদের মিউটেশন ফিও মকুব করে দেওয়া হয়েছে।’‌ ১০০ দিনের কাজের প্রসঙ্গে তিনি ইচ্ছুক সকল মানুষকে কাজ দেওয়ার কথা বলেন।
মুখ্য সচিব আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‌মুখ্যমন্ত্রীর সাধের জলস্বপ্ন প্রকল্পের কাজও দ্রুতগতিতে চলছে। এই প্রকল্পে ৪টি ব্লকে বাড়িতে বাড়িতে নলবাহিত জল পৌঁছবে। তফশিলি জাতিভুক্ত ৬০ বছর বয়সীরা পেনশন পাচ্ছেন। তাঁদের পেনশন নভেম্বর মাস পর্যন্ত দেওয়া আছে।’‌ তিনি আরও দু’‌মাসে পেনশন মিটিয়ে দেওয়ার কথা বলেন। এই জেলায় তফশিলি জাতিভুক্ত ৪৫,৮৮৭ এবং উপজাতি ২০,৮৯০ জন পেনশন পান। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‌রাজ্যের জেলায় জেলায় বাউরি কালচারাল ওয়েলফেয়ার বোর্ড গঠন করা হয়েছে। প্রত্যেক জেলা কমিটিকে পাঁচ কোটি করে টাকা দেওয়া হবে। বাঁকুড়া জেলার জন্য পুরসভার প্রাক্তন কাউন্সিলর দেবদাস দাসকে সভাপতি করে কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই জেলায় যেহেতু বাউরি কমিউনিটির বাস তুলনায় বেশি, তাই হেড অফিস করা হবে এই জেলাতেই। বাগদি কালচারাল বোর্ডের হেড অফিস হবে বর্ধমানে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, মতুয়া ওয়েলফেয়ার বোর্ডের জন্যও ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। ওই ৩১ জনের কমিটিতে চেয়ার পার্সন করা হয়েছে মমতাবালা ঠাকুরকে। সেচ দপ্তরের কাজের পর্যালোচনা করে তিনি অফিসারদের বলেন, মুকুটমণিপুরে কংসাবতী হেলিপ্যাডের কাছে ৭৬টি পরিবার রয়েছে পরিত্যক্ত বাড়িতে। বাড়িগুলি ক্রমশই ব্যবহারের অনুপযুক্ত হয়ে উঠছে, তিনি বাড়িগুলিকে সংস্কার করে দেওয়ার কথা বলেন। রানিবাঁধের বিধায়ক জ্যোৎস্না মান্ডি মুকুটমণিপুর জলাধারে ফের ফিশারিজের কাজ শুরু করার জন্য অনুরোধ করলে মুখ্যমন্ত্রী তাতে সম্মতি জানান। প্রাক্তন সভাধিপতি অরূপ চক্রবর্তী একটি সমস্যার কথা তুলে ধরে বলেন, বাঁকুড়া স্টেশন থেকে কাঠজুড়িডাঙা রেল লাইনের ধারে কিছু সংখ্যক মানুষ দীর্ঘদিন বসবাস করে আসছেন। গতকালই রেলদপ্তর তাঁদের জানিয়ে দিয়েছে, সেখান থেকে সরে যেতে হবে নতুবা তাদের ঘরবাড়ি ভেঙে গুড়িয়ে দেওয়া হবে। শুনেই ক্ষুব্ধ মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‌এইভাবে কাউকে উচ্ছেদ করা যায় না। আমরা আলাপ–‌আলোচনার মাধ্যমে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে তবেই উচ্ছেদ করি। এক্ষেত্রেও রেলের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। বিষয়টি দেখার জন্য তিনি জেলাশাসক এবং পুলিশ সুপারকে বলেন।’‌

জনপ্রিয়

Back To Top