অনুপ গুপ্ত: আজ থেকে ঠিক একশো বছর আগে ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯২০ শ্রীশ্রী মা সারদা শেষ বারের মতো বিষ্ণুপুর থেকে দক্ষিণেশ্বরে গিয়েছিলেন গোমো হাওড়া ফাস্ট প্যাসেঞ্জার ট্রেনের যাত্রী হিসেবে। সেদিন মা সারদা বিষ্ণুপুর স্টেশনে একটি কাঁঠাল গাছের নীচে বসে অপেক্ষা করেছিলেন বেলা ১১.‌৫৮ মিনিটের ট্রেনটি ধরার অপেক্ষায়। দক্ষিণেশ্বর থেকে জয়রামবাটিতে যাওয়া–‌আসার পথে মা সারদা বিষ্ণুপুর স্টেশনে যে জায়গায় বসে ট্রেনের অপেক্ষায় থাকতেন, সেখানে একবার শ্রী মায়ের সঙ্গী গৌরী মা কয়েকজন অপেক্ষারত বিহারি মহিলা যাত্রীদের বলেছিলেন, ‘‌ইনি জানকী মাই’‌ এবং গভীর বিশ্বাস থেকে তারা ‘‌জানকী মাই কি জয়’‌ বলে জয়ধ্বনি দিয়েছিলেন। সেই কাঁঠাল গাছের নীচে ইদানীং একটি ছোট মন্দিরে মা সারদার ছবি প্রতিষ্ঠা করেন রেলের কর্মীরা। নিত্য ধূপ দিয়ে মাকে প্রণতি জানান। অপেক্ষমাণ যাত্রীরা মায়ের মন্দিরে হৃদয়ের শ্রদ্ধা জানান সর্বান্তঃকরণে।
ইতিপূর্বে আজকাল পত্রিকাতে এই সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন শ্রী মায়ের বিখ্যাত কৃষি বিজ্ঞানী বশী সেনের বিষ্ণুপুর বাড়িতে আসা–‌যাওয়ার সংবাদ পরিবেশিত হয়েছিল। এরপর এখানে কিছু বিদগ্ধ মানুষজন এ ব্যাপারে অবগত হয়ে যথেষ্ট উৎসাহিত হন। ২০২০–‌র ২৭ ফেব্রুয়ারি বিষ্ণুপুরের কিছু মানুষজন বিষ্ণুপুর স্টেশনে মায়ের ট্রেনে করে যাওয়ার শেষ যাত্রার একশো বছর পূর্ণ হওয়ার দিনটি পালন করতে স্টেশন প্রাঙ্গণে উপস্থিত হয়ে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মা সারদাকে শ্রদ্ধা জানাবেন এই দিনটিকে স্মরণীয় করে তুলতে। 
একদা স্থাপত্য, কৃষ্টি, শিল্পকলায় অগ্রণী বিষ্ণুপুর আজও ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। রাঢ় বঙ্গের ঐতিহ্যময় বিষ্ণুপুর যেন আধ্যাত্মিক উৎসের পীঠভূমি, যেখানে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ মৃন্ময়ী মন্দির দর্শন করেছেন বিভোর হয়ে, মা সারদার আগমন ঘটেছে বারবার। 
এসবের পাশাপাশি এবং প্রবল শিল্পকলার আধিপত্যে বিষ্ণুপুর তার এক মহান সন্তানের আবির্ভাব এবং তাঁর কর্মকাণ্ড সম্বন্ধে অনেকটাই উদাসীন থেকে গেছে। যিনি একদিকে বিজ্ঞানী এবং অপর দিকে আধ্যাত্মিক চেতনায় সমৃদ্ধ পুরুষ। যিনি স্বামীজির ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত, জগদীশচন্দ্র বসুর এক কালের সুযোগ্য সহকারী আর ভগিনী নিবেদিতার বিশেষ স্নেহধন্যে বিবিধ গবেষণার পুরোধা গবেষক বশীশ্বর সেন। দেশ–‌বিদেশের বিজ্ঞানীদের কাছে বশী সেন। কৃষি বিজ্ঞানে বিশেষ করে ভারতবর্ষের সবুজ বিপ্লবের অগ্রণী বশীশ্বর সেন, তাঁর আলমোড়ার বিবেকানন্দ গবেষণা কেন্দ্রে তৈরি করেছিলেন উচ্চফলনশীল ফসলের বীজ। যার ফলে স্বাধীনতার পরবর্তীকালে সিংহভাগ অভুক্ত ভারতবাসীর জন্যে তা ছিল বেঁচে থাকার রসদ। তাঁর অবদানকে স্বীকৃতি দিতে পদ্মভূষণ উপাধিতে তাঁকে সম্মানিত করেছিলেন ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি ড.‌ রাজেন্দ্র প্রসাদ। দক্ষিণেশ্বর থেকে জয়রামবাটি যাওয়া–‌আসার পথে মা সারদা কয়েকবার বিষ্ণুপুরের গড়দরজার কাছে বশী সেনের বাড়িতে থেকেছেন।
আজকালে পূর্ব প্রকাশিত এই বিষয়ে প্রতিবেদনটি পড়ার পর অনেক মানুষ বশী সেনের এই বাড়িটি দর্শন করেছেন। যে বাড়িটি এবং অন্যান্য স্থাবর সম্পত্তি বশী সেন সারদা ট্রাস্টের নামে হস্তান্তর করেন। হয়তো একদিন মা সারদার ইচ্ছে অনুযায়ী এখানে একটি পান্থশালা গড়ে উঠবে, শ্রীরামকৃষ্ণ, সারদা এবং স্বামীজির ব্যাপারে নিয়মিত চর্চা করার উদ্দেশ্যে একটি কেন্দ্রও তৈরি হবে। বশী সেনের গঠিত ট্রাস্টের অঙ্গীকার অনুযায়ী রাজ্য সরকার প্রয়োজনে বাড়িটি অধিগ্রহণ করতে পারে, তাহলে আশা করা যায় অচিরেই তা এক তীর্থক্ষেত্রে পরিণত হবে। অবশ্যই ট্রাস্টের দলিলের প্রতিলিপি মহকুমা শাসক দেখেই তা করবেন, যা প্রয়োজনে তাঁর দপ্তরে দেওয়া যেতে পারে। 
রাজ্য সরকারের একান্ত প্রচেষ্টায় সিস্টার নিবেদিতার বাড়িটি যেমন উদ্ধার হয়েছে, তেমনই স্বামী বিবেকানন্দের পৈতৃক ভিটার সংলগ্ন জমিটিও রাজ্য সরকার রামকৃষ্ণ মঠ মিশনের হাতে তুলে দিয়েছে। এখন শ্রী সারদা মায়ের পদধূলি বিজড়িত এই ঐতিহ্যময় বশী সেনের বাড়িটি অধিগ্রহণ করে মঠ ও মিশনের হাতে তুলে দিলে মলিন দশা থেকে বাড়িটি উদ্ধার পাবে এবং বিষ্ণুপুরের কাছে যা এক বিশাল সম্পদ হয়ে উঠবে। (‌লেখক:‌ প্রেসিডেন্ট, সোসাইটি ফর কমিউনিটি ইন্টারভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, কলকাতা)‌ ‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top