কাকলি মুখোপাধ্যায়
ওঁরা প্রান্তবাসী। জীবনের উপান্তে এখন ওঁদের ঠিকানা বৃদ্ধাবাস। কোভিড–সন্ত্রাসে ওঁদের দিন কেমন কাটছে?‌ বয়সের কারণে তঁাদের জীবনের ঝুঁকি যেহেতু আরও বেশি, কলকাতা ও উপকণ্ঠের বৃদ্ধাবাসগুলি তঁাদের কথা ভেবে প্রয়োজনীয় সব রকম ব্যবস্থা নিয়েছে। বৃদ্ধাবাসগুলির কর্তৃপক্ষ সে–রকমই জানাচ্ছেন।
কোভিড–‌পরিস্থিতি সামাল দিতে টানা ‘‌লকডাউন’‌ চলছে নবনীড় বৃদ্ধাশ্রমে। বাইরের লোকের যাতায়াত নিষিদ্ধ। বন্ধ নতুন আবাসিক নেওয়ার প্রক্রিয়াও। নবনীড়–এর সাধারণ সম্পাদক শর্মিষ্ঠা বিশ্বাস জানালেন, এই পরিস্থিতিতে ওঁদের সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে একটু কঠিন সিদ্ধান্তই নিতে হয়েছে। রান্না থেকে শুরু করে বয়স্কদের দেখাশোনার জন্য যঁারা আছেন, তঁারা আবাসনেই থাকছেন। টানা প্রায় পঁাচ মাস। বাড়ি যেতে দেওয়া হচ্ছে না। কারণ ওঁদের পরিবর্তে এ–‌মুহূর্তে বাইরে থেকে কাউকে আনা ঠিক হবে না। নতুন ভর্তিও বন্ধ রাখা হয়েছে। যে–‌ক’‌জন আবাসিক প্রবীণ ছুটি নিয়ে বাড়ি গিয়েছিলেন, তঁারা আসতে চাইছেন। তঁাদের জন্য ১৪ দিন আলাদা থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আপাতত আত্মীয়–পরিজনদের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা সারছেন বয়স্করা। তবে টানা এত দিন আপনজনকে না দেখতে পাওয়ার জন্য উদ্বেগ তো রয়েইছে। অনেকে এসে জোরাজুরি করলে মেন গেটের কাছে দূরত্ব–‌বিধি বজায় রেখে আলাদা একটা ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। এত কড়াকড়ি শুধুমাত্র বয়স্কদের সুরক্ষার জন্যই। এ সময়ে ওঁদের যাতে সামান্য ঠান্ডাও না লাগে, সেদিকে কড়া নজর রাখা হচ্ছে।‌
প্রবীণ আবাসিকদের নিরাপত্তার জন্য বহিরাগতের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দিয়েছে শান্তিনীড় বৃদ্ধাশ্রমও। বৃদ্ধাশ্রমের মৈত্রেয়ী দাশগুপ্ত জানালেন, প্রবীণদের সুরক্ষার জন্যই এই সিদ্ধান্ত। বয়স্কদের দেখাশোনার জন্য যঁারা থাকেন, তঁাদের আশ্রমেই থাকার ব্যবস্থা। পরিবারের সঙ্গে দেখা–‌সাক্ষাৎ বন্ধ। ফোনে কিংবা ভিডিও কলে পরিজনদের সঙ্গে কথা সারছেন আবাসিক প্রবীণ–প্রবীণারা। যদি কারও সামান্য জ্বরও আসে, সঙ্গে সঙ্গে তঁাকে আলাদা করে দেওয়া হচ্ছে। আলাদা রেখে চিকিৎসা করা হচ্ছে। শান্তিনীড়–‌এর টালিগঞ্জ শাখায় রয়েছেন ৩৪ জন আবাসিক। তঁাদের নিরাপদে রাখাই এখন প্রায়োরিটি।
কোভিড–‌পরিস্থিতিতে পুরোপুরি সিল করে দেওয়া হয়েছে ‘‌স্নেহদিয়া’। বাইরের লোকের যাতায়াত নিষিদ্ধ। জানালেন হিডকো–‌র চেয়ারম্যান দেবাশিস সেন। তঁার কথায়, প্রবীণ আবাসিকদের সুরক্ষা সবচেয়ে জরুরি। ওখানে হাউসকিপিং স্টাফ, রান্নার লোক যঁারা আছেন, তঁাদের এখন সেখানেই থাকা–খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। নার্স, ডাক্তারদের একটি টিমও ওখানে থাকছে। তঁাদেরও থাকা–খাওয়ার আয়োজন রয়েছে। কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে বাইরে থেকে যাতে ডাক্তার নিয়ে আসতে না হয়, সেজন্য এই উদ্যোগ। সপ্তাহে এক দিন করে দায়িত্বে–‌থাকা একজন আধিকারিক যাচ্ছেন দেখাশোনার জন্য। যঁারা নতুন ভর্তির জন্য আসছেন, তঁাদের ১৪ দিন গেস্ট হাউসে আলাদা রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ১৪ দিন পর নিয়ম মেনে পরীক্ষা করে রিপোর্ট দেখে তবেই স্নেহদিয়া–‌‌র ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে। আপাতত স্কাইপ, হোয়াট্‌সঅ্যাপ ভিডিও কলেই স্বজন–‌পরিবারদের সঙ্গে ‘‌সাক্ষাৎ’‌ সারছেন আবাসিকেরা।
প্রবীণ–প্রবীণাদের নিরাপত্তায় আপাতত নতুন সদস্য নেওয়া বন্ধ রেখেছে সন্ধ্যামিতা বৃদ্ধাশ্রমও। আবাসিকদের সুরক্ষা নিয়ে কোনও রকম খামতি রাখতে নারাজ কর্তৃপক্ষ। বৃদ্ধাশ্রমের তরফে হিমাদ্রি মাইতি জানান, মার্চ থেকে এখানে বাইরের লোকের যাতায়াত পুরো বন্ধ। এখানে বয়স্করা থাকেন। তঁাদের নিরাপত্তা সবচেয়ে জরুরি। নতুন কোনও সদস্যকে এখন নেওয়াও হচ্ছে না। খুব জরুরি না–হলে পরিবারের সঙ্গে দেখা–‌সাক্ষাৎ করতে দেওয়া হচ্ছে না। এজন্য আগে ফোন করে জানাতে হবে। দিন/‌সময় বলে দেওয়া হবে। সেইমতো ঘরের সামনে বারান্দায় জায়গা করে দেওয়া হবে। রান্না বা দেখাশোনা যঁারা করেন, তঁােদর এখানেই থাকা–খাওয়ার আয়োজন করা হয়েছে। ওষুধপত্র আনা হলেও, সেগুলি ভাল করে স্যানিটাইজ করে নেওয়া হচ্ছে। কারণ ওঁদের সুস্থ রাখাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভিডিও কলেই যোগাযোগ রাখছেন পরিবারের সদস্যরা।’‌

জনপ্রিয়

Back To Top