আজকালের প্রতিবেদন- তিনি জানেন, ভোটকৌশলের প্রশ্নে তাঁর দলের ভাবনা এখন দ্বিখণ্ডিত। এও জানেন, কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে ভোটে হারলেও এ রাজ্যের পার্টির সিংহভাগের বেশি তাঁর দিকেই ঝুঁকে। তবু সম্মেলনের মঞ্চে কট্টরপন্থী প্রকাশ কারাত, বৃন্দা কারাতদের উপস্থিতিতে একবারও ভোট–‌জোট–‌রাজনীতির কথা তুললেন না। সে–বিতর্ক কি এপ্রিলের পার্টি কংগ্রেসের জন্য তুলে রাখলেন?‌ ২৫তম রাজ্য সম্মেলনে উদ্বোধনী ভাষণে সীতারাম ইয়েচুরি শুধু মনে করিয়ে দিলেন দলের মূল শত্রু বিজেপি ও তার ভয়ঙ্কর নীতির কথা। আর দল মনে করে, প্রধান কাজ বিজেপি–কে সর্বত্র হারানো। বললেন, বিকল্প নেতা নয়, বিকল্প নীতির ভিত্তিতে জোট গড়েই বিজেপি–কে উৎখাত করতে হবে। সোমবার সকালে প্রমোদ দাশগুপ্ত ভবনে শুরু হল ২৫তম রাজ্য সম্মেলন। পতাকা উত্তোলন করে প্রকাশ্যে কিছুটা বলেন তিনি। এরপর প্রেক্ষাগৃহে ৫০০–র বেশি প্রতিনিধির সামনে তাঁর ৪৫ মিনিটের উদ্বোধনী ভাষণ। তিনি কিন্তু একবারও কংগ্রেস বা জোট প্রসঙ্গ তোলেননি, বললেন রাজ্যে ও দেশের সামনে চারটি বিপদের কথা, যা বাম রাজনীতিরও বিপদ। যে বিপদ স্থায়ী হলে অস্তিত্ব বিপন্ন হবে বামপন্থীদের, পিছিয়ে যাবে সমাজতন্ত্রের লড়াই। ৮ মার্চ পর্যন্ত চলবে রাজ্য সম্মেলন। বিকেলে রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র পেশ করেছেন রাজনৈতিক খসড়া প্রতিবেদন। তা নিয়ে শুরু হবে আলোচনা। জানা গেছে, এই খসড়া প্রতিবেদনটি মূলত সীতারাম ইয়েচুরির সুরেই। এ রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি–র মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক মেরুকরণ চলছে। এদের হারাতে না পারলে রাজ্যের ও বামপন্থার ভবিষ্যৎ নেই। এই লড়াইয়ে বৃহত্তর বামঐক্যকে বাম ও গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ জোটের দিশা দেখানোর কথাই বলা হয়েছে এই খসড়া রিপোর্টে। সীতারাম ইয়েচুরি এদিন বলেন, এপ্রিলে আমাদের ২২তম পার্টি কংগ্রেস। প্রথম পার্টি কংগ্রেসের অনেক আগে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সম্মেলন শুরু হয়েছে। বাংলাই বাম আন্দোলনকে দিশা দেখিয়েছে। এই ২৫তম রাজ্য সম্মেলনও দিশা দেখাক। চারটি বিপদের কথা তুলে ধরেন তিনি। নয়া উদারবাদ, উগ্র সাম্প্রদায়িকতা, গণতন্ত্র ও সংসদীয় ব্যবস্থার অপব্যবহার আর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অধীনতা— এই চার বিপদ দেশের মানুষকে অভূতপূর্ব সঙ্কটের মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়েছে। বামপন্থার কাছেও তা বিপদ। অবিভক্ত পাঞ্জাব, বাংলাদেশ–সহ একাধিক উদাহরণ তুলে সীতারামের যুক্তি, সাম্প্রদায়িকতা বা দাঙ্গা যেখানেই হয়েছে সেখানেই পিছিয়ে গেছে বামপন্থা ও সমাজবাদের লড়াই। এই চার বিপদকে কোন পথে প্রতিরোধ করা যাবে ২৫তম রাজ্য সম্মেলনের প্রতিনিধিরা তা খুঁজে বের করুন। দেশের শাসক দলকে চরম ফ্যাসিবাদী শক্তি বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই বিজেপি–কে রুখতেই হবে। যাতে বিজেপি–র বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ভোট পড়ে তা–ই আমাদের করতে হবে। ভোটকৌশলের জন্য এই রাজনৈতিক লাইনই অনুমোদন করেছে কেন্দ্রীয় কমিটি। কী কৌশল হবে তা নিয়ে পার্টি কংগ্রেসে আলোচনার সুযোগ রয়েছে। এখানে আলোচনা হোক রাজ্যের পরিস্থিতি নিয়ে। তিনি বলেন, এ রাজ্যের পরিস্থিতিও একই রকম। তৃণমূল কংগ্রেস এখানে প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করছে— এই অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, বিজেপি আর তৃণমূল এ রাজ্যে একে অপরকে পুষ্ট করছে। দুই দলকে হারাতে না পারলে রাজ্যের মঙ্গল হবে না। কোন পথে এই লক্ষ্যে পৌঁছনো যাবে সেই পথ দেখাক রাজ্য সম্মেলন। তিনি বলেন, এ রাজ্যের ভারসাম্যে পরিবর্তন আনলেই তা দেশের ভারসাম্য বদলাতে পারবে। আর এ কাজ করতে হলে সবার আগে দরকার দলের নিজস্ব শক্তি ও সাংগঠনিক ক্ষমতা বৃদ্ধি।
২৫তম রাজ্য সম্মেলনকে ঘিরে রাজ্যের অধিকাংশ পার্টি অফিসেই সাজসজ্জা, মিছিল, সেমিনার ইত্যাদির আয়োজন হয়েছে। কলকাতায় দুটি পৃথক মঞ্চ হয়েছে বিকল্প সংস্কৃতিকে তুলে ধরতে। একটি ধর্মতলায় লেনিন মূর্তির নিচে, অন্যটি রবীন্দ্র সদন চত্বরে রাণুছায়া মঞ্চে। রাণুছায়া মঞ্চে এদিন পলিটব্যুরো সদস্য বৃন্দা কারাত বলবেন নারীবৈষম্য ও আন্দোলন নিয়ে। বিভিন্ন এলাকায় চলছে পথনাটিকা।

সিপিএমের ২৫তম রাজ্য সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিমান বসুর সঙ্গে কথা বলে ঘড়ি ধরে সময় মিলিয়ে পতাকা উত্তোলন করতে যাচ্ছেন সর্বভারতীয় সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি।আছেন সূর্যকান্ত মিশ্র, প্রকাশ কারাত, এম এ বেবি, দীপক সরকার, মিনতি ঘোষ ও শ্রীদীপ ভট্টাচার্য। প্রমোদ দাশগুপ্ত ভবনে, সোমবার। ছবি: কুমার রায়

জনপ্রিয়

Back To Top