হিমাংশু দাস, রায়গঞ্জ: স্কুল যাওয়ার পথে ছাত্রের মৃত্যু। তা–‌ও আবার ডাম্পারের ধাক্কায়। শুক্রবার সকালে এই ঘটনায় উত্তাল হয়ে উঠল রায়গঞ্জ শহর। রায়গঞ্জের শিলিগুড়ি মোড় এলাকার ঘটনা। তারপরই চলল ইটবৃষ্টি, ভাঙচুর, পুলিসের লাঠিচার্জ–‌সহ কাঁদানে গ্যাস। সব মিলিয়ে অগ্নিগর্ভ চেহারা নেয় রায়গঞ্জের শিলিগুড়ি মোড়। প্রায় চার ঘণ্টা অবরুদ্ধ হয়ে যায় ৩৪ নং জাতীয় সড়ক। শিলিগুড়ি মোড়ে ৩৪ নং জাতীয় সড়কের পাশেই সুদর্শনপুুর দ্বারিকাপ্রসাদ উচ্চ বিদ্যাচক্র স্কুল। এই স্কুলেরই দশম শ্রেণির ছাত্র প্রতীক চ্যাটার্জি। প্রতীক এদিন কর্ণজোড়ার বাড়ি থেকে সাইকেল চালিয়ে স্কুলে আসছিল। সদর দরজা খোলা না পেয়ে ঘুরপথে ৩৪ নং জাতীয় সড়কের পাশের দরজা দিয়ে ঢুকতে যায় স্কুলে। সড়ক থেকে নিচে নামতেই ঘটে যায় ওই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। জাতীয় সড়ক ধরে দ্রুতগতিতে চলা একটি পার্শেল ডাম্পার ধাক্কা মারে প্রতীককে। সাইকেল থেকে ছিটকে পড়ে যায় প্রতীক। চলে যায় গাড়ির পেছনের চাকার তলায়। চাকায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারায় প্রতীক। মুহূর্তের মধ্যে ক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে ওই এলাকা। শুরু হয়ে যায় একের পর এক ভাঙচুর। প্রথমে ঘাতক ডাম্পার, এরপর এক এক করে অন্যান্য কয়েকটি লরিতেও ভাঙচুর চালায় ক্ষুব্ধ জনতা। ক্ষোভের রাশ এতটাই বেড়ে যায় যে এলাকার মানুষ হামলে পড়ে ট্রাফিক পুলিসের ওপরেও। শিলিগুড়ি মোড় এলাকায় থাকা ট্রাফিক পুলিসের কিয়স্ক–‌সহ চারটে মোটর সাইকেল ভাঙচুর করা হয়। মারধর করা হয় ট্রাফিকের দায়িত্বে থাকা পুলিস অফিসার ও সিভিক ভলান্টিয়ারদের। খবর পেয়ে রায়গঞ্জ থানা এবং পুলিস লাইন থেকে আসে প্রচুর পুলিস। নামানো হয় কমব্যাট ফোর্স। লাঠি উঁচিয়ে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে গেলে শুরু হয় ইটবৃষ্টি। ইটের আঘাতে বেশ কয়েকজন পুলিস কর্মী ও সাংবাদিকও জখম হন।

পরিস্থিতি বেগতিক দেখে নিয়ে আসা হয় জলকামান। কিন্তু ক্ষুব্ধ জনতার বিক্ষোভের সামনে বিকল হয়ে যায় সেই কামানও। এরপর জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাসের শেল ও রাবার বুলেট ছুঁড়তে বাধ্য হয় পুলিস। জেলা পুলিস সুপার শ্যাম সিং ও রায়গঞ্জের মহকুমা শাসক টি এন শেরপা ঘটনাস্থলে যান। বিক্ষুব্ধ জনতাকে শান্ত করার চেষ্টা চালান। পাশাপাশি পুরো ঘটনার তদন্তেরও আশ্বাস দেন। ঘাতক ডাম্পারটিকে আটক করা গেলেও, চালক ও খালাসি উভয়েই পলাতক। পুলিস মৃত ছাত্রের দেহ মর্গে পাঠালে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়। পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে এদিন দেখা যায় রায়গঞ্জের পুরপ্রধান সন্দীপ বিশ্বাস, উপপুরপ্রধান অরিন্দম সরকার–‌সহ বেশ কয়েকজন কাউন্সিলরকেও। ময়নাতদন্তের তদারকি করতে রায়গঞ্জ হাসপাতালে যান বিধায়ক মোহিত সেনগুপ্ত। ক্ষোভের সঙ্গে তিনি বলেন, মাত্র দু’‌জন অফিসার আর সিভিক ভলান্টিয়ার দিয়ে একটা জংশন সামলাচ্ছে পুলিস। ট্রাফিক ব্যবস্থা একেবারেই ভেঙে পড়েছে। স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, ট্রাফিক পুলিস  তোলা আদায়ে বেশি ব্যস্ত থাকে। এর একটা সুরাহা হওয়া উচিত। জেলা পুলিস সুপার শ্যাম সিং বলেন, একটা দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর মানুষ উত্তেজিত হয়। আমরা ঠান্ডা মাথায় পুরো ঘটনা সামলেছি। মৃতের বাবা ডা.‌ সুনীল চ্যাটার্জি কয়েক বছর আগে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। মা শুক্লা চ্যাটার্জি বাড়ি থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরের সুজাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। দুই মেয়ে আর ছেলে প্রতীককে রেখে রোজই সকাল সকাল বেরিয়ে যান। এদিনও তেমনটাই হয়েছিল। তফাত একটাই, প্রতীক আর কখনও বাড়ি ফিরবে না। 

(ইনসেটে) মৃৃত স্কুলছাত্র প্রতীক চ্যাটার্জি। ইটবর্ষণে ছত্রভঙ্গ পুলিস। রায়গঞ্জে। ছবি:‌ হিমাংশু দাস


 

জনপ্রিয়

Back To Top