উদ্দালক ভট্টাচার্য
‘‌ওদের গ্রামে অনেকদিন থেকেই যেতাম। পরিচয় হয়েছিল ওদের সঙ্গে। ভাবলাম পুজোয় এবার ওদের হাতে যদি নতুন জামা তুলে দেওয়া যায় তো কেমন হয়। তারপর থেকে আমরা নিজেদের উদ্যোগে কলকাতা ও তার আশেপাশের অনেক জায়গা থেকে জামাকাপড় জোগাড় করছি। পুজোয় ওদের নতুন জামা দেব বলে। তবে আমরা চাই, এমন এক সমাজ তৈরি করতে, যাতে আমাদের আর জামাকাপড় কিনে দিতে না হয়। ওরাই একদিন নিজেদের জন্য জামা কিনতে পারে।’ বলছিলেন বালির বাসিন্দা সপ্তর্ষি বৈশ্য। বয়স ২৩। কলেজ পাশ করে সদ্য চাকরিতে ঢুকেছেন। কিন্তু তাঁর চোখ জুড়ে উজাড় করা স্বপ্ন। শুধু তাঁর নয়, এমনই স্বপ্ন দেখছেন সপ্তর্ষির বন্ধু অর্কেন্দু, সূচেতা, দেবাঞ্জনা, প্রদর্শ, নুপুর, অলকানন্দারা। তাঁরা চান পুরুলিয়ার অন্যতম প্রাচীন জনজাতি বীরহরদের কাছে একটু খুশি, আনন্দ পৌঁছে দিতে। 
সপ্তর্ষি বলছিলেন, বাংলার প্রাচীন আদিবাসীদের মধ্যে বীরহরদের প্রাচীনতম বলা যায়। কমতে কমতে এই গোষ্ঠীর মানুষের সংখ্যা এখন এসে দাঁড়িয়েছে ৪০০ তে। বিপন্নতার মুখে দাঁড়িয়ে থাকা এই গোষ্ঠীর মানুষদের কোনও ইতিহাস, কোনও ঐতিহ্য আজ পর্যন্ত লিপিবদ্ধ হয়নি। কিন্তু এঁদেরও তো ঐতিহ্য আছে। এঁরাও মানুষ। তাহলে কেন এঁদের কে এই বঞ্চনার দিন কাটাতে হবে। ‘‌জানেন, এখনও এখানে সন্তান জন্মের পরে দাই মা ব্লেড নয় তো কঞ্চি দিয়ে সদ্যোজাতের নাড়ি কেটে দেয়। এরা সকালে ভাত রান্না হলে দুপুরে ফ্যান খায়, রাতে সেই দুপুরে রান্না হওয়া ভাত খায়। আর খিদে ভুলতে হাঁড়িয়া আর মহুলের নেশা করে।’‌ বলছিলেন সপ্তর্ষি। সরকারি উদ্যোগ হয়তো আছে, কিন্তু অনেকে জানেনই না কীভাবে সরকার তাঁদের সাহয্য করতে পারে।
কীভাবে এঁদের সঙ্গে যোগ তৈরি হল আপনাদের?‌ সপ্তর্ষি বললেন, ‘‌আমি পুরুলিয়ায় নানা সময়ে যাতায়াত করতাম। মূলত বলরামপুর ও বাঘমুন্ডি এলাকায় এই বীরহরদের বসবাস। ধীরে ধীরে নিয়মিত যাতায়াত করতে করতেই ওদের সঙ্গে একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। তবে বীরহরদের কথা প্রথমবার জানতে পারি স্বর্ণাভ দার কাছ থেকে। পুরুলিয়ার সিন্দরীতে শবর আদিবাসীদের জন্য যে ‘‌স্বপ্নের স্কুল বাড়ি’‌ তৈরি হয়েছে, তার মূল কাণ্ডারি ছিলেন স্বর্ণাভ দা।’‌
তারপর পুজোর জন্য নতুন জামাকাপড় কেনার পরিকল্পনা করে ফেসবুকে পোস্ট দেন সপ্তর্ষি। সেখানে বিপুল সংখ্যক মানুষের সাড়া তাঁদের মুগ্ধ করেছে। সপ্তর্ষির পোস্টে লেখা ছিল, ঠিক কোন কোন মানুষদের জন্য কী ধরণের জামাকাপড় প্রয়োজন। সবাই সেই মতোই জামাকাপড় পৌঁছে দিচ্ছেন সপ্তর্ষিদের হাতে। মনে রাখতে হবে, সপ্তর্ষিদের কোনও সংগঠন নেই। তাঁরা একক উদ্যোগে উত্তর থেকে দক্ষিণ, যে যেখানে পোষাক কিনে দিতে চাইছেন, সেখানে পৌঁছে যাচ্ছেন। পোষাক নিয়ে একজায়গায় জড়ো করছেন। আর সেখান থেকে সোজা সেই পোষাক পৌঁছে যাবে বিরহরদের কাছে। মহানন্দে এই গোটা কর্মকাণ্ডে নির্বাণ খুঁজে চলেছে এই দল।
লোকে বলে এই প্রজন্ম উচ্ছন্নে গেছে। লোকে বলে এই প্রজন্ম দায়িত্বহীন। কিন্তু যে দায়িত্ববান নাগরিক দলিত যুবককে পিটিয়ে মারে, যে দায়িত্ববান নাগরিক মুসলিমদের পাকিস্তানে চলে যেতে বলে, যে দায়িত্ববান নাগরিক রাস্তায় ভিক্ষুকদের দেখলে মুখে রুমাল চাপা দিয়ে বাড়ি ফিরে যায় বা যে দায়িত্ববান নাগরিক প্রবল রোদে বা ঝমঝমে বৃষ্টিতে রিক্সা চালকের সঙ্গে একটাকা বেশি ভাড়া দেওয়া নিয়ে ঝগড়া করেন, তিনি পারবেন তো এই একদল উচ্ছন্নে যাওয়া ছেলেমেয়ের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে?‌

 

 

ছবি:‌ সপ্তর্ষি বৈশ্য 
  ‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top