মলয় সিনহা: সবুজ, বরফে ঢাকা সাদা পাহাড়ের আকর্ষণে ঘর থেকে পালিয়ে গিয়েছিল মাত্র ষোলো বছরের মেয়েটি। ছোট্ট থেকেই স্বপ্ন সে উঠবে পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু পাহাড়টায়। ছোটবেলায় বইয়ে বারবার তেনজিং নোরগে আর এডমন্ড হিলারির এভারেস্ট অভিযানের গল্পটা পড়ত। এমনকি বাবা–মায়ের কাছে বায়নাও করত সে পাহাড় দেখবে। একই সঙ্গে ছিল এভারেস্ট দেখার আবদার। মেয়ের পাহাড়ের প্রতি আকর্ষণ দেখে অতিষ্ঠ বাবা–মা নেপালের পোখরায় বেড়াতে নিয়ে যান। নিজের চোখে অন্নপূর্ণার তুষারাবৃত শৃঙ্গের সৌন্দর্য দেখে পিয়ালী আত্মহারা হয়ে যায়। সেই শুরু। মনে মনে স্থির করে নেয়, একদিন সে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গে উঠবে। সেই স্বপ্নের খুব কাছে সে। সব ঠিকঠাক চললে আগামী মে মাসে এভারেস্ট অভিযান করবেন পিয়ালি বসাক।
পাহাড়কে ভালবেসেও স্বপ্নপূরণ মসৃণ ছিল না পেশায় প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষিকা পিয়ালির। পর্বতারোহী হাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও পারিবারিক আর্থিক প্রতিকূলতা নানা সমস্যার সৃস্টি করেছে। কিন্তু হার মানেননি চন্দননগরের জেদি মেয়েটি। অদম ইচ্ছাশক্তিতে নিজেকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। পারিবারের আর্থিক অবস্থার কারণে পিয়ালি স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে ২০০৬ সালে বাড়ি থেকে পালিয়ে দার্জিলিং হয়ে নেপাল পর্যন্ত চলে গিয়েছিল। উদ্দেশ্য নেপালে গাইডের কাজ করে রোজগার করে বাবা–মাকে সাহায্য করা এবং পাহাড়কেও কাছ থেকে দেখা। বাড়িতে ফিরলেও  অর্থাভাবে স্বপ্ন হারিয়ে যাওয়ার যোগাড় হয়েছিল। পিয়ালি জানান, ‘‌আমার স্যার (‌অপূর্ব চক্রবর্তী)‌ সেই সময় পাশে এসে দাঁড়ান। তাঁর সহযোগিতায় হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে (‌এইচএমআই)‌ কোর্স করতে পেরেছিলাম।’‌ ২০১০ ‌এইচএমআই থেকে অ্যাডভ্যান্স কোর্সও করেন পিয়ালি। সেই বছর থেকে ২০১৫ পর্যন্ত চলে নানা ছোট–বড় পর্বত অভিযান। উল্লেখযোগ্য মুলকিলা টেন, তিন চেন কাং, কামেট অভিযান। পাশাপাশি চলে চাকরি খোঁজার পালা। ২০১৪ সালে সিঙ্গুরের একটি সরকারি প্রাইমারি স্কুলে চাকরি পান তিনি। আর্থিক পরিস্থিতি সামাল দিতে টানা তিন বছর চন্দননগর থেকে সিঙ্গুর— সাইকেলে প্রত্যেকদিন ৫০ কিলোমিটার যাতায়াত করতেন। এরপর ২০১৭ সালে চন্দননগরে কানাইলাল বিদ্যামন্দির প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এলে কিছুটা সুবিধা হয়। 
পিয়ালি নিজের চেষ্টায় ২০১৮ সালে উত্তর নেপালের মানসলু শৃঙ্গ (‌৮১৫৬)‌ অভিযানে সফল হন। এবার পালা মাউন্ট এভারেস্ট। টুসি দাস আর ছন্দা গায়েনের পর বাংলার অসামরিক তৃতীয় বাঙালি মহিলা হিসাবে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গে পা রাখতে চলেছেন পিয়ালি। এভারেস্ট–প্রস্তুতি নিয়ে পিয়ালি জানান, ‘‌অভিযানের জন্য নেপাল সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব নথি পেয়ে গেছি। ‌এখন শুধু টাকার জোগাড়ের চেষ্টা করছি।’‌ তিনি আরও জানান, ‘‌অভিযানের জন্য দরকার ২৫ লাখ টাকা। সবার চেষ্টায় সামান্য কিছুটা জোগাড় হলেও। বাকি অনেকটাই।’‌ সরকারি বা বেসরকারি সবার কাছে যাচ্ছেন তাঁর অভিযানের খরচের টাকার জোগাড় করতে। পিয়ালীর আশা, মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি সবার মতো তাঁর পাশেও দাঁড়াবেন। আকাশচুম্বী উদ্ধত ওই মাউন্ট এভারেস্ট শৃঙ্গে পা রাখার জেদে পিয়ালি অবিচল। বিশাল অঙ্কের টাকার চাপ জয় করার দৃঢ় প্রত্যয় তাঁর চোখে–মুখে। কারণ স্বপ্নের তো মরণ হয় না।‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top