শিখর কর্মকার: বেড়েছে ট্রেন। বাড়ছে যাত্রী ও টিকিট বিক্রি। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে বিনা টিকিটের যাত্রী। রেলের পরিসংখ্যানেই এই ছবি ফুটে উঠেছে। যদিও এর জন্য অনেকেই রেলের অব্যবস্থাকেই অনেকাংশে দায়ী করছেন। রেলকর্তাদের কারও মতে, বিনা টিকিটে যাত্রী ধরতে টিকিট পরীক্ষকদের ন্যূনতম কেস সংখ্যা বেঁধে দেওয়ায় এই ছবি নজরে আসছে। তাঁদের মতে, কিছু টিকিট পরীক্ষক ও রেল পুলিশের সহযোগিতায় বিনা টিকিটে যাত্রীর প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি। এই যাত্রীদের ধরা গেলে জরিমানা বাবদ রেলের আয় আরও বাড়ত।
বিনা টিকিটে ভ্রমণ এক শ্রেণির লোকের পুরনো ‘‌রোগ’‌। এক শ্রেণির টিকিট পরীক্ষকও চান না এই যাত্রীরা টিকিট কাটুন। আবার রেলের অব্যবস্থায় টিকিট কাটতে না পেরে বহু যাত্রী ট্রেনে চাপতে বাধ্য হন। একটা সময় ছিল, টিকিট পরীক্ষকদের কাছে ছাড় পেতেন কলেজ–‌বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা। মান্থলি শেষের পরও কয়েক দিনের ছাড় মিলত। এখন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে দল বেঁধে যোগ দিতে আসা বিভিন্ন দলের সমর্থকেরা ছাড়া সব যাত্রীর দিকেই শ্যেন নজর টিকিট পরীক্ষকদের। আগে ‘‌দয়ালু’‌ টিকিট পরীক্ষকেরা ধরা–‌পড়া তিন–‌চারজন বিনা টিকিটের যাত্রীর কাছ থেকে একজনের জরিমানার টাকা আদায় করতেন। এখন এ–‌রকম ঘটনা খুব একটা নজরে আসে না। জরিমানার অঙ্কও আগের তুলনায় বেড়েছে। এখন চলন্ত ট্রেনে বিনা টিকিটের যাত্রীকে ন্যূনতম ২৫০ টাকা ও ট্রেনটির পুরো যাত্রাপথের ভাড়া জরিমানা হিসেবে দিতে হয়। প্রিমিয়াম ট্রেনে জরিমানা দ্বিগুণ। জরিমানা দিতে না পারলে রেলের আইনে ৬ মাস পর্যন্ত জেল হতে পারে। 
২০১৭–‌১৮ আর্থিক বছরে সারা দেশে প্রায় ৩ কোটি বিনা টিকিটের যাত্রী ধরা পড়ে। এদের থেকে আদায়–‌করা জরিমানার পরিমাণ ১০০০ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। এই ধারা এখনও বজায় রয়েছে। গত পঁাচ বছরে পূর্ব রেলে বিনা টিকিটের যাত্রী অনেকটাই বেড়েছে। জরিমানা বাবদ টাকার পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।‌ ২০১৪–‌১৫ আর্থিক বছরে পূর্ব রেলে ১৯ লক্ষ ২৫ হাজার বিনা টিকিটের যাত্রী ধরা পড়ে। এদের থেকে আদায় হয়েছিল ৩৩ কোটি ৬০ লক্ষ টাকা। পরের আর্থিক বছরে ২০ লক্ষ ৮৭ হাজার বিনা টিকিটের যাত্রীর থেকে আদায় হয়েছিল ৩৬ কোটি ৭৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা। পরের বছরে ২১ লক্ষ ৯৫ হাজার বিনা টিকিটের যাত্রীর থেকে আদায় হয় ৩৯ কোটি ৬৮ লক্ষ টাকা। এর পরের বছর ৪৮ কোটি ১৩ লক্ষ টাকা আদায় হয় ২৪ লক্ষ ৪৫ হাজার বিনা টিকিটের যাত্রীর কাছ থেকে। ২০১৮–‌১৯ আর্থিক বছরে ২৭ লক্ষ ৫৩ হাজার বিনা টিকিটের যাত্রীর থেকে আদায় হয়েছে ৬২ কোটি ৫৪ লক্ষ টাকা। এই আর্থিক বছরে দক্ষিণ–‌পূর্ব রেলে ৮ লক্ষ ৮৮ হাজার বিনা টিকিটের যাত্রীর থেকে আদায় হয়েছে ৪৫ কোটি ৩০ লক্ষ টাকা। আগের আর্থিক বছরে আটক বিনা টিকিটের যাত্রী–‌সংখ্যা ছিল ৭ লক্ষ ৬ হাজার ৮০৮। এদের থেকে আদায় হয়েছিল ৩৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। ডি সি মিত্র শিয়ালদা বিভাগের ডিআরএম থাকার সময় বিনা টিকিটের যাত্রী ধরতে ‘‌লাল গাড়ি’‌ চালু করেছিলেন। রেলের ম্যাজিস্ট্রেটকে নিয়ে টিকিট পরীক্ষকের দল হঠাৎ–‌হঠাৎ হানা দিতেন বিভিন্ন স্টেশনে। তৎক্ষণাৎ জরিমানা করা হত বিনা টিকিটের যাত্রীদের। জরিমানা দিতে না পারলে পাঠানো হত আদালতে। জুটত কারাবাসের বিধান। পরবর্তী সময় ‘‌চেতনা’‌ চালু করে এই কাজ করা হত। সে–‌সময় বিনা টিকিটের যাত্রী–‌সংখ্যা শিয়ালদা বিভাগে 
কিছুটা কমেছিল। 
বিনা টিকিটের যাত্রীরা সকলেই যে স্বভাবে টিকিট কাটেন না, তা নয়। ইচ্ছা থাকলেও অনেকে বাধ্য হন টিকিট না কেটে ট্রেনে চাপতে। শিয়ালদা, হাওড়া–‌সহ বিভিন্ন বড় স্টেশনে যাত্রী–‌চাপের তুলনায় টিকিট কাউন্টারের সংখ্যা অনেকটাই কম। এখানে কর্মীর অভাবে অধিকাংশ কাউন্টারই বন্ধ থাকে। ফলে কাউন্টারের সামনে নিত্য নজরে আসে লম্বা লাইন। টিকিট কাটতে অনেকটা সময় চলে যায়। ট্রেন ছাড়ার সময় এগিয়ে আসায় অনেকে বাধ্য হন বিনা টিকিটে ট্রেনে চাপতে। রেলের তরফে বড় বড় স্টেশনের বাইরে বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে টিকিট বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু আগে লোকাল ট্রেনের একটি টিকিটের জন্য ১ টাকা বেশি দিতে হত। সম্প্রতি ২ টাকা নেওয়া হচ্ছে। ৫ টাকা বা ১০ টাকার টিকিটের জন্য অতিরিক্ত ২ টাকা দিতে স্বাভাবিক ভাবে নারাজ যাত্রীরা। 
বিনা টিকিটের যাত্রীদের তুলনায় ন্যায্য ভাড়া না দিয়ে মাল বহনের জন্য জরিমানার পরিমাণ বেশি থাকায় টিকিট পরীক্ষকদের অনেকেরই নজর থাকে বিভিন্ন ধরনের মাল নিয়ে আসা যাত্রীদের দিকে। একটা সময় ছিল শিয়ালদা স্টেশনে ভাড়া না দিয়ে মাল নিয়ে আসা যাত্রীদের জন্য বিভিন্ন দেব–‌দেবীর ছাপা কার্ড বিলি করা হত। ফেরার সময় কার্ড ও বিনা টিকিটে মাল–‌সমেত ট্রেনে চড়ার ছাড়পত্রের জন্য নির্ধারিত মূল্য জমা করতে হত। এর একটি পয়সাও রেলের ঘরে আসত না। এখন অবশ্য ন্যায্য টিকিট ছাড়া মাল বহনের জন্য জরিমানা বাবদ মোটা টাকা আয় হচ্ছে রেলের। জরিমানা আদায় বাড়লেও, কমছে না বিনা টিকিটে ট্রেনে চাপার প্রবণতা।‌‌‌‌‌‌

স্টেশনে যাত্রীর টিকিট পরীক্ষা করছেন পরীক্ষক। ছবি: প্রতিবেদক

জনপ্রিয়

Back To Top