শ্রাবণী গুপ্ত: সবে বৈশাখের শেষ সপ্তাহ চলছে। গাছে ‘মুকুল' এলেও ফল পাকতে দেরি আছে। কিন্তু ভোট-পরবর্তী বঙ্গ রাজনীতিতে এখনও যথেষ্ট উত্তাপ রয়েছে। যুযুধান দুই শিবির তৃণমূল আর বিজেপি একে অপরকে নানা বিষয়ে বিদ্ধ করে চলেছে। এই অবস্থায় রাজনৈতিক মহলের সাম্প্রতিকতম প্রশ্ন, বিজেপির ‘মুকুল' কি ঝরছে? টুইট করে মুকুল নিজে কী বললেন?
এদিন দুপুরে টুইট করে মুকুল জানালেন, তিনি তাঁর রাজনৈতিক পথ থেকে সরছেন না। বাংলায় গণতন্ত্র কায়েম করতে তাঁর লড়াই চলবে। একই সঙ্গে অকারণে জল্পনা ছড়াতেও প্রকারান্তরে নিষেধ করলেন তিনি। এর পরেই জল্পনা আরও জোরালো হয়েছে, কেন হঠাৎ এই বিষয়ে টুইট করতে হল মুকুল রায়কে।

তাঁকে বাংলা রাজনীতির ‘চাণক্য' বলা হয়। বস্তুত যে যাই বলুন, তিনি দল বদলের পরেই ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে চোখধাঁধানো সাফল্য এসেছিল গেরুয়া শিবিরে। এমনটা মনে করেন অনেকেই। দীর্ঘ কয়েক দশক পরে এবছর ভোটে লড়েছেন এবং জিতেও এসেছেন কৃষ্ণনগর উত্তর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে। কিন্তু সূত্রের খবর, মুকুল রায় খুশি নন। বরং অসন্তুষ্ট, ক্ষুব্ধ। বিজেপির প্রতি নাকি মোহভঙ্গ হয়েছে তাঁর। কিন্তু সদ্য ভোট মিটেছে। কেন এখনই এহেন আলোচনা? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তা বুঝতে গেলে পরপর ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনায় চোখ বুলিয়ে নিতে হবে। 

ঘটনা ১: ভোট পরবর্তী পর্যালোচনার জন্য বিজেপি রাজ্য সভাপতি সহ বেশ কয়েকজন রাজ্য নেতাকে দিল্লিতে ডেকে পাঠিয়েছে শীর্ষ নেতৃত্ব। তালিকায় কৈলাস বিজয়বর্গীয়, মুকুল রায় ছাড়াও নাম রয়েছে তথাগত রায়ের। ভোটের ফল বেরোনোর পরে ‘দিলীপ, কৈলাস, অরবিন্দ, শিবপ্রকাশ' সম্পর্কে তির্যক মন্তব্য করার জন্য তথাগত রায়কে এই তালিকায় রাখা হয়। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে দিল্লি যেতে পারবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন মুকুল রায়। শুধুই অসুস্থতা নাকি এর পেছনে অন্য কোনও কারণ আছে তা নিয়ে গেরুয়া শিবিরে জল্পনা চলছে।

 

ঘটনা ২: নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণার ঠিক আগে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল এর অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠান পরবর্তী চা-চক্রে উপস্থিত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। ছিলেন মুকুল রায়ও। সেখানে উপস্থিত প্রায় সবার নজর কেড়েছিল মমতা-মুকুল সংক্ষিপ্ত অথচ আন্তরিক কথোপকথন। নরেন্দ্র মোদি ও খেয়াল করেছিলেন বিষয়টি। সূত্রের খবর, মুকুলকে দেখেই তৃণমূল নেত্রী জানতে চান, তিনি এত রোগা হয়ে গিয়েছেন কেন? তাঁর কি শরীর খারাপ? এমনকি মমতা নাকি মুকুলকে নিজের শরীরের প্রতি খেয়াল রাখতে বলেন। 

 

ঘটনা ৩: এরপরে নির্বাচনী প্রচার চলাকালীন তৃণমূল নেত্রীর মন্তব্য ছিল, ‘মুকুল ভালো, শুভেন্দু খারাপ'। যা নিয়েও পরে বিস্তর জলঘোলা হয়। এমনকি এও বলা হচ্ছে, গোটা প্রচার পর্বে মমতা ব্যানার্জি সম্পর্কে একটিও কটু মন্তব্য করেননি মুকুল। 

 

ঘটনা ৪: ২ মে ফল ঘোষণার পরে তৃণমূল নেত্রীর সাংবাদিক সম্মেলনে প্রশ্ন ওঠে, ভোটের আগে যারা দল ছেড়েছিলেন তারা ফিরতে চাইলে কী হবে? মমতার সংক্ষিপ্ত জবাব ছিল, ‘সবাই ওয়েলকাম'। তৃণমূল কংগ্রেসের একাধিক সিনিয়র নেতা বলছেন, দল ছেড়ে যাওয়া মুকুল ও অন্যান্যদের প্রতি নরম মমতা। কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রমণ চালিয়ে যাওয়ায় শুভেন্দুর জন্য দরজা বন্ধ। 

 

ঘটনা ৫: বিধানসভায় শপথ নিতে গেলেও দিলীপ ঘোষের ডাকা বৈঠক এড়িয়ে যান মুকুল রায়। আবার বিধানসভায় ঢুকেই প্রথমেই নাকি তিনি চলে যান তৃণমূল পরিষদীয় ঘরের দিকে। শপথ নেওয়ার পরে বেশ কিছুক্ষণ কথা হয় সুব্রত মুখোপাধ্যায় এবং সুব্রত বক্সীর সঙ্গে।

 

ওপরের এই নানা ঘটনার উল্লেখ করে  রাজনৈতিক মহল বলছে, শুভেন্দু অধিকারীর বিজেপিতে আসা এবং নির্বাচনী প্রচারে শীর্ষ নেতৃত্বের তরফে শুভেন্দুকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া মুকুল ভালভাবে নেননি। আর এখন বিজেপির বিধায়কদের মধ্যে ধারে এবং ভারে তাঁর গুরুত্ব বেশি হওয়া সত্বেও যেভাবে বিরোধী দলনেতা হিসেবে অন্য নেতাদের নাম উঠে আসছে তাতে তিনি বিরক্ত। মুকুল শিবির যদিও এখনই এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করছে না তবে ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দিচ্ছে, রাজনীতিতে অসম্ভব বলে কিছু হয়না। শুনিয়ে দিচ্ছে তাদের দাদার পুরনো ডায়লগ, রাজনীতিতে চিরস্থায়ী বন্ধু বা শত্রু বলেও কিছু হয়না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই শিবিরের এক নেতা যেমন বললেন, ‘দাদা এখনই তৃণমূলে গেলে দাদার বিরুদ্ধে যে মামলাগুলো চলছে কেন্দ্র তাতে চাপ বাড়াতে পারে। আর বিরোধী দলনেতা হিসেবে দাদাকে বেছে নেওয়া হচ্ছে কিনা সেদিকেও নজর রাখছেন উনি। পরে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা হবে'। তৃণমূল শিবির বলছে, ঘরে অনেকেই ফিরতে চান তবে এখনই নয়। কাঁচরাপাড়ার ‘দাদার শিবির' ও বলছে, এখনই নয়। এই ‘এখনই' শব্দটি এই মুহূর্তে যাবতীয় জল্পনার ভরকেন্দ্র।

জনপ্রিয়

Back To Top