আজকালের প্রতিবেদন, গঙ্গাসাগর: ‘‌এসেছি সাগরমেলা, পৃথিবীর সেরা মেলা। আছো যত ভক্তগণ চরণধূলি দাও না আমার। আছো যত শ্রোতাগণ চরণধূলি দাও না আমার। তোমরা দান করিলে দানি হবে, হবে তোমার পূর্ণমান। এসেছি সাগরের মেলায় গো।’‌ বাউলের সুরে মাতোয়ারা সাগরতটের চার নম্বর রাস্তা। মধ্য পঞ্চাশের প্রমীলা মণ্ডলের গলায় এই সুর–‌তাল বেঁধে দিয়েছিল মঙ্গলবারের সকাল। প্রমীলার পাশে কার্তিক বাউল। কার্তিক সঙ্গ দিচ্ছেন প্রমীলাকে। তবে কয়েক ঘণ্টা আগেও কেউ কাউকে চিনতেন না। গানের টান দু‌জনকে মিলিয়ে দিয়েছে। আলাপ হওয়ার পর জানতে পেরেছেন তাঁরা একই এলাকার বাসিন্দা।
দুজনেই নদিয়ার শান্তিপুরের বাসিন্দা। সাগরমেলাতে দু‌জনেই প্রথবার এলেন। তবে দু‌জনের মধ্যে অমিল আছে। কার্তিক সাধু। প্রমীলা গৃহী। গেরুয়া বসনের কার্তিকের পাশে সাদা পোশাকের প্রমীলা। নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে ঝোলার ভেতর থেকে রংচটা ভিজিটিং কার্ড বের করেন প্রমীলা। নিজের ছবি ও নাম লেখা কার্ডটা দেখানোর সময় প্রসন্নতা ছড়িয়ে পড়ে রোদে পোড়া চেহারার প্রমীলার চোখেমুখে। শান্তিপুরের নিকুঞ্জনগর গ্রামে থাকেন প্রমীলা। গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের পাঠ চোকানোর পর বিয়ে দেওয়া হয়েছিল তাঁর। স্বামী মারা গেছেন অনেক বছর আগে। চার ছেলে‌মেয়ে, গোটা দশেক নাতি–‌নাতনি নিয়ে ভরা সংসার। সংসারের বাইরে আছে এক গোপাল। গোপাল সেবার পাশাপাশি বাউল, কীর্তনে পটু প্রমীলা। রাজ্য সরকারের স্বীকৃত বাউল শিল্পী তিনি। জয়দেবের মেলার পাশাপাশি বিভিন্ন মেলায় ঘুরে গান গেয়ে কিছু উপার্জন তাঁর লক্ষ্য। যাতে সংসারটা একটু ভাল চলে। মণ্ডল পরিবারের সকলে যেন খেয়ে–‌পরে বাঁচতে পারে। সংসারের জোয়াল টানার ফাঁকেও প্রমীলা নিজেই গান বাঁধেন।
এবার সাগরমেলাতে আসার পরেই গান বেঁধে ফেলেছেন। সেই গানের সুরে মাতোয়ারা সাগরতট। বাঙালি, অবাঙালি পুণ্যার্থীরা প্রমীলাকে দিয়ে যাচ্ছেন চাল, শাড়ি টাকা। এই উপার্জনটুকু তঁার কাছে বড় পাওনা। আগামী কয়েক দিন মেলাতে থেকে ফিরবেন বাড়িতে। প্রমীলা বলেন, ‘‌গানবাজনার নেশা ছোট থেকে। বিয়ের পরও ছাড়িনি। স্বামী মারা গেল। ভরা সংসার। তখন গানকেও আরও বেশি করে আঁকড়ে ধরলাম। সরকারি স্বীকৃতিও পেয়েছি। এবার সাগরে এসেছিলাম গানবাজনা করব বলে। কিন্তু ফেরার জন্য টাকার অভাব হয়ে পড়ল। তখনই গান বাঁধলাম সাগরের ওপর। কার্তিক বাউলকে পেয়ে গেলাম। বসে পড়েছি। প্রচুর মানুষ আশীর্বাদ করছেন।’‌ প্রমীলার সঙ্গে কথা বলার ফাঁকে পুণ্যার্থীর ভিড় বাড়তে শুরু করেছে সাগরতটে। মানুষের ভিড় দেখে প্রমীলা এবার গেয়ে ওঠেন, ‘‌দরিয়ার মাঝিরে নাও বাঁচাইলি রে, এবার চল দেশে চলে যাই।’‌ লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থীর কোলাহলের মাঝে মিলিয়ে যায় প্রমীলার উদাত্ত কণ্ঠ।

জনপ্রিয়

Back To Top