আজকালের প্রতিবেদন- রাজ্যের সব জেলায় করোনা হাসপাতাল হবে। বেসরকারি নার্সিংহোম, হাসপাতালগুলিতেও করোনা চিকিৎসা কেন্দ্র করার সিদ্ধান্ত নিল রাজ্য সরকার। এই রোগ মোকাবিলার সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীদের বিমার অঙ্ক ৫ লাখ থেকে বাড়িয়ে ১০ লাখ করা হল। সেই সঙ্গে এই বিমার আওতায় আনা হল পুলিশ, ক্যুরিয়ার কর্মী, অ্যাম্বুল্যান্স চালক, ড্রাগিস্ট, কেমিস্ট, বিশেষ পরিষেবা দিচ্ছেন হাসপাতালের রন্ধন কর্মী, আয়া, আশা, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী, সাফাইকর্মী, বিশেষ পরিবহণের চালক–কর্মীদেরও। এঁদের পরিবারের সদস্যরাও এই বিমার সুযোগ পাবেন। ১৫ এপ্রিলের পরিবর্তে ১৫ মে পর্যন্ত এই সুবিধা পাওয়া যাবে। সোমবার নবান্নে সব জেলার জেলাশাসক, পুলিশ সুপার, সব জেলার সিএমওএইচ–দের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে এই সিদ্ধান্তের কথা জানান মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। তিনি বলেন, মে মাস পর্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। এ রাজ্যের দায়িত্বে থাকা বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্করকে ২ লক্ষ কিট দিতে বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী।
বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী জানান, ‌প্রতিটি জেলায় লোকালয় থেকে দূরে রয়েছে এমন বেসরকারি হাসপাতালগুলিকে চিহ্নিত করে সেখানকার চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী ও পরিকাঠামো ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কোন হাসপাতাল ব্যবহার করা যাবে তা মুখ্যমন্ত্রী বলে দেন। যেমন— সত্যম রায়চৌধুরীর টেকনো গ্লোবাল হাসপাতাল এবং সল্টলেকে সুবোধ মিত্র ক্যান্সার হসপিটাল। বারাসতের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে, টেকনো গ্রুপের ক্যাম্পাসেও কোয়ারেন্টিন সেন্টার হবে।
পশ্চিম মেদিনীপুরের জন্য মুখ্যমন্ত্রী দ্রুত বিশেষ প্যাকেজ দেওয়ার কথা বলেন মুখ্যসচিব রাজীব সিনহাকে। ইতিমধ্যেই মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজে করোনা ভাইরাস পরীক্ষা করার জন্য আইসিএমআর অনুমতি দিয়েছে। পাশের জেলাগুলি থেকেও যাতে এখানে এসে নমুনা পরীক্ষা করা যায় তার জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি মনে করিয়ে দেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একটি ভুলে মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। কোনও জেলা হাসপাতালকে করোনা কেন্দ্র করা যাবে না। এতে সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্য পরিষেবা দিতে সমস্যা হবে। একই হাসপাতালে করোনা ও সাধারণ রোগের চিকিৎসা হলে সংক্রমণ ছড়ানোর সম্ভাবনা প্রবল। তাই লোকালয় থেকে দূরেই করোনা কেন্দ্রের জন্য হাসপাতাল বেছে নিতে হবে। সব কমিউনিটি সেন্টার, বিয়েবাড়িতে কোয়ারেন্টিন কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে।
আদিবাসী অধ্যুষিত ঝাড়গ্রামের ওপর নজর দিতে বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। অলচিকি ভাষাতে গ্রামে গ্রামে করোনা নিয়ে সচেতন করতে বলেছেন। সীমান্তবর্তী জেলা বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, বীরভূম, বর্ধমান, কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, দক্ষিণ দিনাজপুর ও উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিতে বিশেষ নজর দেওয়ার জন্য অজয় নন্দা এবং অজয় কুমারকে বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে পাঠানোর জন্য ডিজি বীরেন্দ্রকে নির্দেশ দেন মুখ্যমন্ত্রী। সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে কেউ যেন কোনও ভাবে ঢুকতে না পারে তার নির্দেশ দিয়েছেন। বাঁকুড়া, বীরভূম, পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান, পুরুলিয়া জেলাগুলির মধ্যে কাজের সমন্বয় রাখতে আইএএস রাজেশ সিনহাকে নোডাল অফিসার করা হয়েছে। উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজেও করোনা ভাইরাসের নমুনা পরীক্ষার অনুমতি দিয়েছে আইসিএমআর। 
পরিবহণ দপ্তরকে বিশেষ বাস পরিষবা চালু করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়। উত্তরবঙ্গের মুখ্য স্বাস্থ্য অধিকর্তা জানান, সাফাই কর্মীরা কাজ করতে চাইছেন না। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ, ২ মাসের জন্য মাসিক ১০ হাজার টাকা বেতনে যাঁরা কাজ করতে চান, তাঁদের দিয়েই সাফাইয়ের কাজ করাতে হবে। এই সাফাই কর্মীদের ১০ লক্ষ টাকার বিমার আওতায় নিয়ে আসার নির্দেশ দেন।
মুখ্যসচিবের লিখিত ছাড়া অন্য কোনও নির্দেশ মানার দরকার নেই বলে মুখ্যমন্ত্রী সব জেলাকে জানিয়ে দেন। চিকিৎসক ও নার্সদের থাকা–‌খাওয়ার সুব্যবস্থা করতে বলেন। প্রাতরাশে কী দেওয়া হবে তা–‌ও বলে দেন। তিনি চিকিৎসক, নার্স, অঙ্গনওয়াড়ি ও আশাকর্মী সহ স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রত্যেককে ধন্যবাদ জানান। বলেন, আমরা আপনার এবং আপনাদের পরিবারের পাশেও আছি। কাজ করতে গিয়ে কোনও রকম সমস্যার সম্মুখীন হলে আমাদের জানাবেন। 
ওষুধের যাতে কোনও অভাব না হয় তার জন্য সরবরাহকারী সমস্ত সংস্থাকে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। ওষুধের দোকান নিয়মিত খোলা রাখতে হবে। করোনা মোকাবিলায় চিকিৎসকদের টাস্কফোর্সের পরামর্শ মেনে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‌করোনা মোকাবিলার সঙ্গে যুক্ত সব কর্মীকে সুষম খাবারের ব্যবস্থা করা হবে, কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা হবে। পরিকাঠামোর অভাব থাকলে দ্রুত সমাধান করা হবে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে আশা কর্মীরা কীভাবে সচতন করবেন তার গাইডলাইন তৈরি করে দেওয়া হবে। ডাক্তারদের নির্দেশ মতো যাঁরা ১৪ দিন কোয়ারেন্টিনে থাকবেন না, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনত কঠিন ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিদেশ ও ভিনরাজ্য থেকে আসা সবাইকে কোয়ারেন্টিনে থাকার জন্য ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে জেলাশাসকদের। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বাড়িতে ঢোকার ক্ষেত্রে বাধা দিলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‌মুদির দোকান বাজার খোলা রাখা হয়েছে। বাড়িতে কোনও কিছু মজুতের প্রয়োজন নেই। শুধু সামাজিক দূরত্ব মেনে চলুন।’‌ লকডাউনের কারণে মানুষকে দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে বলে তিনি বার বার ক্ষমা চেয়ে নেন। আতঙ্কিত হতে বারণ করেন। বলেন, ‘‌ফুসফুস, কিডনি, হৃদরোগ, হাঁপানি, হাইপ্রেসার, শুগারের মতো রোগ থাকলে সাবধানে থাকতে হবে। জ্বর, সর্দি, কাশি হলেই আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই।’‌ চিকিৎসকদের উদ্দেশে তাঁর অনুরোধ, ‘‌জ্বর হলেই হাসপাতালে পাঠিয়ে দেবেন না। সবক্ষেত্রে নমুনা পরীক্ষা করাতে বলবেন না। কেউ আতঙ্ক ছড়াবেন না। রাজ্য সরকার সব ক্ষমতা নিয়ে আপনার পাশে রয়েছে। সামনের দুটো সপ্তাহ সাবধানে থাকতে হবে। মে মাস পর্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। আমিও খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু যখন দেখলাম এ রাজ্যে প্রথম আক্রান্ত–‌সহ তিনজন সুস্থ হয়ে উঠেছেন, তখন আশ্বস্ত হলাম। তাঁদের করোনা ভাইরাসের নমুনার রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে। আরেকটা পরীক্ষা ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে করে ছেড়ে দেওয়া হবে। তার মানে করোনা আক্রান্ত হলেও সুস্থ হওয়া যায়।’‌‌‌
 

জনপ্রিয়

Back To Top