আলোক সেন ,বাঁকুড়া:
— আজ কত তারিখ?‌ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি।
— ৭ মার্চ। চটজলদি জবাব বাঁকুড়া পুরসভার চেয়ারম্যান মহাপ্রসাদ সেনগুপ্তের।
— কতদিন লাগবে ব্যবস্থা করতে?‌ ফের প্রশ্ন মুখ্যমন্ত্রীর।
— দু’‌সপ্তাহ ম্যাডাম। বললেন পুর চেয়ারম্যান।
‘‌ঠিক আছে, এই মাসের মধ্যেই যেন কাজ শেষ হয়ে যায়। পরের বার মিটিংয়ে এসে যেন না শুনি, কাজ হয়নি।’‌ বললেন মমতা।
মোট দু’‌ঘণ্টার প্রশাসনিক বৈঠক। বাঁকুড়া পুলিস লাইনে। কিন্তু কোথাও কি ‘‌কর্পোরেট’‌ ছোঁয়া?‌ আলোচনার বিষয় ছিল ডাঁই করে জমে–‌থাকা দাবিহীন মৃতদেহের সৎকার হচ্ছে না। ভালরকম মর্গ‌ও নেই। দলীয় বিধায়ক শম্পা দরিপার মুখে এ কথা শুনেই কমিটি গড়ে রীতিমতো ‌দিনক্ষণ ‘‌বেঁধে’‌ ওইভাবে কাজ শেষ করতে নির্দেশ দিলেন মমতা। 
কিছুদিন আগেই বারাসতে এরকমই এক প্রশাসনিক বৈঠকে সরকারি কাজে ‘‌লাল ফিতের ফাঁস’‌ নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। বলেছিলেন, ‘‌এভাবে কাজ আটকে থাকলে চলবে কী করে?’‌ আজ এখানে মুখ্যমন্ত্রীর ‘‌ঘড়ি ধরে’‌ কাজের ‌ওই নির্দেশ সে–কথাই মনে করিয়ে দিল। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের সমস্যা মেটানোর জন্য বিডিও–দের আরও তৎপর হওয়ার নির্দেশও দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
এদিন বৈঠকে শুরু থেকেই একের পর এক বিডিও–দের কাছ থেকে তাঁদের ব্লকের খোঁজখবর নেন মুখ্যমন্ত্রী। জানালেন, তাঁর কাছে প্রায়ই অভিযোগ আসে, কোনও কোনও বিডিও লোকজন দেখা করতে এলে অযথা বসিয়ে রেখে হয়রানি করেন। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‌প্লিজ, এটা আপনারা করবেন না। রাজ্যের সব বিডিও–কে বলছি, আপনাদের নিজ নিজ দায়িত্বের বিষয়ে আরও তৎপর হতে হবে। মানুষকে দ্রুত কাজ দিতে হবে। মনে রাখবেন, দূর–দূরান্ত থেকে মানুষ তাঁদের নানান সমস্যা নিয়ে, অনেক আশা করে আপনাদের কাছে যান। লক্ষ্য রাখতে হবে, তাঁরা যেন কোনওমতেই হয়রানির শিকার না হন।’‌ 
বাঁকুড়া জেলার কোথায় কী সমস্যা রয়েছে, চলমান প্রকল্পগুলি কী অবস্থায়— এ সব বিষয় নিয়েই প্রায় দু’‌ঘণ্টা এদিন পর্যালোচনা করেন মুখ্যমন্ত্রী। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মুখ্য সচিব মলয় দে, স্বরাষ্ট্র সচিব অত্রি ভট্টাচার্য এবং রাজ্য পুলিসের ডিজি সুরজিৎ করপুরকায়স্থ–‌সহ বিভিন্ন দপ্তরের সচিব ও আধিকারিকেরা। বাঁকুড়ার বিধায়ক শম্পা দরিপা বাঁকুড়া মর্গের ওই প্রসঙ্গ টেনে জানান, প্রায় হাজারখানেক দাবিহীন মৃতদেহ মর্গে পড়ে রয়েছে। এ কথা শুনেই উদ্বেগ প্রকাশ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জেলাশাসক, সিএমওএইচ, পুরসভার চেয়ারম্যান এবং বিধায়ককে নিয়ে কমিটি গড়ে দিয়ে বলেন, ‘‌যত দ্রুত সম্ভব ওই মৃতদেহগুলি সৎকারের ব্যবস্থা করতে হবে।’‌ বিষয়টি দায়িত্ব নিয়ে ব্যবস্থা করার জন্য তিনি চেয়ারম্যান মহাপ্রসাদ সেনগুপ্তকেও নির্দেশ দেন। এছাড়া বাঁকুড়া মেডিক্যালে একটি নতুন মর্গ তৈরি করতে বলেন তিনি। একইসঙ্গে বাঁকুড়া মেডিক্যালে রোগীর পরিজনদের জন্য একটি শেড বানানোর নির্দেশ দিয়েছেন পূর্ত দপ্তরকেও। 
এদিকে, জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ডাঃ প্রসূন দাসের কাছ থেকে জেলার স্বাস্থ্য সংক্রান্ত খোঁজখবর নেওয়ার সময় মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‌মনে রাখতে হবে, এই উন্নয়নের কাজকর্মগুলি আগামী নভেম্বর মাস পর্যন্ত একটানা করে যেতে হবে।’‌ সোনামুখী পুরসভার চেয়ারম্যান সুরজিৎ মুখার্জির অনুরোধে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন, ইন্দাস, পাত্রসায়র এবং সোনামুখি ব্লকের জন্য একটি বড় বাসস্ট্যান্ড গড়ে তোলা হবে। বাঁকুড়া–তারকেশ্বর রেল প্রকল্পের কাজ কেন আটকে আছে জানতে চাইলে জেলাশাসক জানান, কিছু লোক কাজে বাধা দিচ্ছে, যদিও তারা ইতিমধ্যে ক্ষতিপূরণ পেয়ে গেছে। মুখ্যমন্ত্রী মুখ্য সচিবকে নির্দেশ দেন, ওই রেল প্রকল্পের কাজ ত্বরান্বিত করার জন্য। তিনি খাতড়ার মহকুমা শাসককে বলেন, মুকুটমণিপুরে হোম ট্যুরিজম গড়ে তুলতে ব্যবস্থা নিতে হবে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‌পর্যটকদের কাছে খুবই আকর্ষণীয় মুকুটমণিপুর। এই জায়গা আরও পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন করতে হবে।’‌ একাধিক বিডিও এবং বিধায়কদের কাছ থেকে পানীয় জলের অবস্থার খোঁজখবর নেন মমতা। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‌একসময় এই জেলায় মাত্র ১৫ শতাংশ মানুষ নলবাহিত জল পেতেন। এখন সেই সংখ্যাটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬০ শতাংশ। আরও প্রায় ১১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। তার ফলে জেলায় আরও প্রায় ১৮ লক্ষ মানুষ এই বিশেষ সুবিধা পাবেন।’‌ ‌বাঁকুড়া ও পুরুলিয়া জেলার হস্তশিল্পের আরও উন্নতি করার সুযোগ আছে। তা কাজে লাগানোর পরামর্শ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। রানিবাঁধের বিডিও–কে ‌ঝিলিমিলিতে পর্যটনের আরও উন্নতিতে লক্ষ্য রাখতে বলেন। বিধায়ক জ্যোৎস্না মান্ডি হিড়বাঁধ এলাকায় একটি ফুড প্রসেসিং ইউনিট ও পলাশ ফুল নিয়ে একটি হার্বাল আবির তৈরির কারখানা গড়ার আবেদন জানান। মুখ্যমন্ত্রী বিডিও–দের কাছে এদিন আরও বলেন, ‘‌জাতিগত শংসাপত্র পেতে যাতে কোনওরকম দেরি না হয়, তা দেখতে হবে। ‌ক’‌দিন পরেই মাধ্যমিক পরীক্ষা। পরীক্ষার্থীদের যাতে কোনওরকম সমস্যা না হয়, তা সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দেখতে হবে।’‌ ছাতনার বিধায়ক জয়ন্ত চ্যাটার্জির অনুরোধে মুখ্যমন্ত্রী চ‌ণ্ডীদাস মহাবিদ্যালয়ের ‘‌বাউন্ডারি ওয়াল’‌–‌এর জন্য সাংসদ মুনমুন সেন তাঁর সাংসদ এলাকা উন্নয়ন তহবিল থেকে টাকা দেবেন বলে জানান মমতা। ‌

জনপ্রিয়

Back To Top