আজকালের প্রতিবেদন- ‌বাংলার শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজো নিয়ে নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহদের তির্যক মন্তব্যের জবাব দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। মঙ্গলবার বাগবাজারে গৌড়ীয় মিশনের এক অনুষ্ঠানে এসে, নাম–‌না করে ওঁদের উদ্দেশে মমতার কটাক্ষ, ‘‌দিল্লিতে বসে বলে মমতা দুর্গাপুজো করতে দেয় না। আমাদের ৮ বছরের সরকার চলছে। আমাদের আমলে লাখলাখ দুর্গাপুজো হয়। লক্ষ্মী, সরস্বতী, ছটপুজো থেকে সব পুজো এখানে হয়। আমরা রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, বিদ্যাসাগরের মতো মনীষীদের জন্মদিন পালন করি। তাই হিন্দু ধর্ম ওঁদের কাছে শিখব না। কারও কেনা নয় হিন্দু ধর্ম।’‌ মমতা আরও বলেছেন, ‘‌বাংলাকে হিংসা করা হচ্ছে। ভয় দেখাচ্ছে। কিন্তু বাংলা স্বাধীনতা আন্দোলনে অগ্রগণ্য ভূমিকা নিয়েছিল। এটাই ইতিহাস। আমরা চেন্নাইয়ের তিরুপতি, মহারাষ্ট্রের গণেশ পুজো বা সন্তোষী মা, কামাখ্যা বা মা–‌দুর্গা সবাইকেই সম্মান করি।‌ ভারতবর্ষ মাতৃতান্ত্রিক দেশ। মা–‌বোনকে সম্মান করা শ্রীচৈতন্যই শিখিয়েছেন। তাঁর মানবতার বাণী আরও প্রচার করুন।’‌
এদিন ঐতিহ্যময় গৌড়ীয় মিশনের উদ্যোগে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু মিউজিয়ামের উদ্বোধন করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। মিশন জানিয়েছে, মিউজিয়ামের লক্ষ্য মহাপ্রভুর শিক্ষা ও সমাজ ভাবনা সম্পর্কে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা। ১৫০০ বর্গমিটার এলাকা জুড়ে মিউজিয়ামটি তৈরি হয়েছে। চারতলা বাড়িটিতে বেশ কয়েকটি গ্যালারি, অধ্যয়ন ও গবেষণার জন্য গ্রন্থাগার রয়েছে। উল্লেখ্য, ৬ বছর আগে এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি। মিউজিয়ামে ডিজিটাল পদ্ধতিতে গৌড়ীয় দর্শন, বৈদিক সৃষ্টিতত্ত্বের উপস্থাপনা, পাণ্ডুলিপির ডিজিটাল লাইব্রেরি ইত্যাদি রয়েছে। মমতা এদিন মিউজিয়ামের উদ্বোধন করার সময় উপস্থিত ছিলেন ড.‌ সরোজ ঘোষ, সৌরবিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞ ড.‌ শক্তিপদ গণচৌধুরি–‌সহ সৌর প্যানেল সংস্থার পক্ষে অবন সাহা প্রমুখ।
এর আগে বাগবাজার মাঠে এই উপলক্ষে এক বর্ণাঢ্য সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে উপস্থিত ছিলেন কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম, ডেপুটি মেয়র অতীন ঘোষ, প্রাক্তন রাজ্যপাল শ্যামল সেন, মন্ত্রী ডা.‌ শশী পাঁজা, সাধন পান্ডে, সাংসদ সুদীপ ব্যানার্জি, বিধাননগরের মেয়র কৃষ্ণা চক্রবর্তী–‌সহ গৌড়ীয় মিশনের অধ্যক্ষ ভক্তিসুন্দর সন্ন্যাসী মহারাজ, ড.‌ সরোজ ঘোষ, নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি প্রমুখ। এছাড়াও ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ ও আয়োজক সংস্থার বহু সন্ন্যাসী, মহারাজ।
মুখ্যমন্ত্রী তাঁর ভাষণের আগাগোড়াই শ্রীচৈতন্যের ভাবধারা ও দর্শনে মানুষদের উজ্জীবিত করার কথা বলেন। সেই সঙ্গে উত্তর কলকাতার বাগবাজারের ঐতিহ্যমণ্ডিত দুর্গাপুজোকে ঘিরে সংস্কৃতি ও সম্প্রীতির সহাবস্থানকে মনে করিয়ে দেয়। মমতা বলেন, ‘‌শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও সম্প্রীতির সেতুবন্ধনের জায়গা এটা। নেতাজি, রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, সারদা মা, শ্রীচৈতন্যের পদধূলি পড়েছে এখানে। বিশ্বসেরা এই সব মানুষের কর্মস্থান ছিল এই এলাকা। যা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। তাই, এই মিউজিয়াম তৈরি হওয়ায় আমি গর্বিত। আর সারা বিশ্বেও এটি সর্বপ্রথম। যা বাংলায় গড়ে উঠল।’‌ সর্বধর্ম সমন্বয় ও মানবতার লক্ষ্যে শ্রীচৈতন্যের জীবনদর্শন আজও সমাদৃত বাঙালির কাছে। সারা বিশ্বের মানুষও তাঁকে গ্রহণ করেছে। মমতা বলেন, ‘‌বড় মানুষ হওয়া সহজ নয়, মনটাও বড় হতে হয়। যিনি সবাইকে একসঙ্গে ভালবেসে চলতে পারেন, বড় মাপের মানুষ তিনিই হন। শ্রীচৈতন্যকে অনেক অপমান, অসম্মান সহ্য করতে হয়েছে। এজন্য তাঁকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। তা সত্ত্বেও মাথা উঁচু করে সামাজিক সংস্কার, অস্পৃশ্যতা, অখণ্ডতা, কোনও ভেদাভেদ নেই— এই আদর্শ শিখিয়েছেন। চামার, চণ্ডাল, ব্রাহ্মণ— কীসের তফাত। বলেছিলেন শ্রীচৈতন্য। তেমনই রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, রামকৃষ্ণদেব একই কথা বলেছিলেন।’‌ মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, ‘‌সারা বিশ্ব যখন উদ্বেলিত, ভারতবর্ষ জাতপাতে সন্ত্রস্ত, তখন নবদ্বীপ থেকে ভেদাভেদ ভুলে শান্তির বাণী প্রচার করেছিলেন শ্রীচৈতন্য। মানবিকতার শুরু এই বাংলা থেকেই। এটাই বাংলার গর্ব। ভারত বা অন্য কোনও প্রদেশকে তাই বাংলা কখনও হিংসা করে না। এটাই আমাদের সভ্যতা। সর্বধর্ম সমন্বয়ের শিক্ষা।’‌
মুখ্যমন্ত্রী এদিন গৌড়ীয় মিশনের উন্নতিকল্পে রাজ্য সরকারের তরফে ৫০ লক্ষ টাকা অনুদানের কথা ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে সুদীপ ব্যানার্জির সাংসদ তহবিল থেকে আরও ৫০ লক্ষ টাকা গৌড়ীয় মিশনকে সাহায্য করতে নির্দেশ দেন। এ ছাড়াও নতুন মিউজিয়াম ও গৌড়ীয় মিশনের বাড়ি নির্মাণে কলকাতা কর্পোরেশনের পক্ষে আরও ৮০ লক্ষ টাকা অনুদান দেওয়া হবে। সব মিলিয়ে ১ কোটি ৮০ লক্ষ টাকা পাবে গৌড়ীয় মিশন। মমতা জানিয়েছেন এদিনই আশুতোষ মুখার্জির বাড়িটিকে ‘‌হেরিটেজ’‌ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। তেমনই গৌড়ীয় মিশন চাইলে প্রাচীন এই ভবনটিও ঐতিহ্য তালিকায় রাখা হবে বলে জানিয়েছেন মমতা। পর্যটনের মানচিত্রেও এই মিউজিয়ামকে রাখতে পরামর্শ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।‌‌‌

 

 

 

প্রণাম তুলসীমঞ্চে। বাগবাজারে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু মিউজিয়ামে, মঙ্গলবার। ছবি: কুমার রায়

জনপ্রিয়

Back To Top