‌দীপেন গুপ্ত, আবির রায়, পুরুলিয়া ও দুর্গাপুর, ৫ মার্চ- এবার লক্ষ্য দিল্লি!‌ ‘‌লালকেল্লা’‌ দখল। 
ঘোষণা স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির। দেশজুড়ে ‌বিজেপি–‌র ‘‌ধর্মান্ধ’‌ রাজনীতির বিরুদ্ধে সোমবার আরও একধাপ এগিয়ে আক্রমণাত্মক সুর চড়ালেন তৃণমূল নেত্রী।
পুরুলিয়ায় মমতা এদিন বলেছেন, ‘‌ওদের টার্গেট বাংলা। আর আমাদের টার্গেট লালকেল্লা। আমাদের জন্য নয়, দেশের জন্যই আমাদের টার্গেট দিল্লি।’‌ 
ত্রিপুরার বিধানসভা ভোটের ফল প্রকাশের পরই মমতা অভিযোগ তুলেছিলেন, বিজেপি অর্থবল ও পেশি প্রদর্শনে জয়ী হয়েছে সেখানে। সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিষ ছড়াচ্ছে দেশজুড়ে। মোদির বিরুদ্ধে মমতার চড়া সুরের পারদ এদিন আরও উঁচুতে উঠেছে। মোদি–‌বিরোধী দলগুলির কাছেও তাই রাজনৈতিক বার্তা দিয়ে মমতা বলেছেন, ‘‌বাংলা নিজে কিছু নেবে না। বাংলা যা করবে, সবাইকে নিয়ে দেশ জয় করবে। সকলকে সঙ্গে নিয়ে দিল্লি জয় করব। বাংলায় আমরা কোনও ভাবে রক্তের হোলি খেলতে দেব না। বাংলা দাঙ্গা করে না, কাউকে করতেও দেবে না।’‌
দক্ষিণবঙ্গে জেলা সফরে বেরিয়ে এদিন দুর্গাপুরে এসে ‘‌সৃজনী’‌ প্রেক্ষাগৃহে প্রথমে প্রশাসনিক বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী। পরে দুর্গাপুর থেকে হেলিকপ্টারে পুরুলিয়ায় আসেন তিনি। সেখানে প্রশাসনিক জনসভায় প্রকল্পের উদ্বোধন, ভিত্তিপ্রস্তর ও সরকারি পরিষেবা প্রদানের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি প্রকল্পেরও উদ্বোধন ও শিলান্যাস করেন। শিমুলিয়া ময়দানে ওই জনসভায় বক্তব্য পেশ করতে গিয়ে নাম না–‌করে কেন্দ্রের মোদি সরকারকে তুলোধোনা করেন মমতা। তাঁর কথায়, ‘‌ওদের টার্গেট বাংলা। আমাদের টার্গেট দিল্লি। ’‌
মমতার কথায়, ‘‌‌আগে কাউকে দেখা যেত না। এখন কেউ কেউ এসে নানা কথা বলছে। নানা রটনা করছে। যারা কাজ করে, তাদের তো বলবেই। আমরা কাজ করি। বাংলা কারোর কাছেই মাথা নত করবে না। আগে বাংলার মতো কাজ করে দেখাও। তারপর বাংলার দিকে তাকাবে। বাংলা মানুষকে পথ দেখায়। এটা নেতাজির বাংলা, নজরুলের বাংলা। বাংলার কন্যাশ্রী থেকে যুবশ্রীর দিকে দেখে শিখুক। গরিব মানুষের ব্যাঙ্কের টাকা লুঠ করে ওরা। আর সেই টাকাতে নির্বাচনে জিতে বাজিমাত করবে— দুটো একসঙ্গে চলতে পারে না। গরিবি মানুষের অপরাধ নয়। কিন্তু গরিবের টাকা লুঠ করা, সেটা অপরাধ। দাঙ্গা করাটাও অপরাধ।
এর আগে এদিন দুপুরে দুর্গাপুরে ওই প্রশাসনিক বৈঠকেও পুলিস–‌প্রশাসনকে সতর্ক করে দিয়ে মমতা কড়া ভাবে বলেন, ‘‌বিজেপি এখানে দাঙ্গা লাগানোর চেষ্টা করছে। ওদের উসকানি, ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে তাই আরও নজরদারি বাড়াতে হবে পুলিসকে। সম্প্রতি আরও চক্রান্ত শুরু হয়েছে। দুটো ছেলেকে টাকা দিয়ে মাংস ফেলে আসতে বলছে। কখনও মন্দিরে আবার কখনও মসজিদে ফেলে দেওয়া হয়েছে। আমার হিন্দু, মুসলমান কাউকে দেখার দরকার নেই। যে অন্যায় করবে তা অন্যায়। পাড়ায় পাড়ায় পুলিসকে কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম করতে হবে। প্রতিটি থানায় আইসি–দের নজর রাখতে হবে কারা এগুলো করছে। উত্তর ২৪ পরগনায় দু জায়গায় হয়েছে। এটা যড়যন্ত্র। ইচ্ছাকৃত করছে। দুটো ছেলেকে হাতে ২০ হাজার টাকা ধরিয়ে দিচ্ছে। দিয়ে বলছে, এক কেজি মাংস কিনে ফেলে দিয়ে আয়। তারপর দুটি কমিউনিটির মধ্যে দাঙ্গা লাগিয়ে দিয়েছে। এটা আরএসএসের কাজ। বিজেপি করছে।’‌ মমতা এদিন আরও বলেছেন, ‘‌হাবড়ার ঘটনায় বিজেপি–র লোকেরা ধরা পড়েছে। এখানে তৃণমূল ধরা পড়লে তাদের নামও বলতাম। এটা নজরে রাখতে হবে। গ্রিন পুলিস রয়েছে, সিভিক পুলিস আছে। ইন্টেলিজেন্স সোর্স আছে আপনাদের। ক্লাবগুলো রয়েছে। তা সত্ত্বেও বুঝতে পারছেন না, কারা করছে এসব। নজর রাখুন ভাল করে। সব সময় সিসিটিভি কাজ হয় না। ইন্টেলিজেন্স দিয়ে কাজ করতে হয়। স্থানীয় মানুষকে সামিল করুন। দরকার হলে মোবাইলে পুলিসকে ছবি তুলে দিক। যারা করবে, হাতেনাতে তাদের ধরতে বলুন।  যে ধরবে, তাকে পুরস্কৃত করুন এক হাজার টাকা দিয়ে। এদিন মুখ্যমন্ত্রী জেলার ১০০ দিনের কাজ ভাল হওয়ায় প্রশংসা করেছেন পঞ্চায়েত কর্তাদের। আসানসোল, কাঁকসা, পাণ্ডবেশ্বর এবং অন্ডাল এলাকার বিভিন্ন কাজ নিয়ে আলোচনা করেন। বিডিওদের আইসিডিএস সেন্টারগুলোর খোঁজখবর নিতে বলেন। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‌কাঁকসা খুব গরিব এলাকা। আদিবাসীরা আছেন। একটু নজর রাখবেন। এএসপি নিয়ে আন্দোলন করুন সবাই।’‌ মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, ‘‌পঞ্চায়েত নির্বাচনের জন্য কোনও উন্নয়নের কাজ ফেলে রাখা যাবে না। সময়মতো, ধারাবাহিক ভাবে কাজ চালিয়ে যেতে হবে। নির্বাচন আসছে বলে তিন মাস কাজ বন্ধ, তা চলবে না। নভেম্বর পর্যন্ত সমস্ত পঞ্চায়েত এলাকার কাজ করে যেতে হবে। থামলে চলবে না। পুরুলিয়ার সভায় মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, কন্যাশ্রীর ৪৫ লক্ষ মেয়ে বিভিন্ন সুযোগ–‌সুবিধা থেকে সাইকেল, সব পেয়েছে। ৭০ লক্ষ সাইকেল দিয়েছি। লোকশিল্পীরা পেয়েছেন সন্মান। এছাড়াও শিল্পীরা ভাতা পাচ্ছেন, কৃষকদের আর জমির খাজনা দিতে হয় না। রাজ্য সরকার সারা বছর গরিব মানুষকে ২ টাকা কেজি দরে চাল–‌গম দিচ্ছে। আমাদের সরকার বিনেপয়সায় চিকিৎসা পরিষেবা দিচ্ছে।  ‌‌

পুরুলিয়ার জনসভায় মুখ্যমন্ত্রী। সোমবার। ছবি: আজকাল

জনপ্রিয়

Back To Top