সব্যসাচী ভট্টাচার্য, শিলিগুড়ি: ফের ধর্ম নিয়ে রাজনীতির কঠোর সমালোচনা করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। শিলিগুড়ির বাঘাযতীন পার্কে শনিবার দার্জিলিং লোকসভা কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী অমর সিং রাইয়ের সমর্থনে এক জনসভার মঞ্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‌ধর্ম নিয়ে আমরা রাজনীতি করতে নামি না। প্রয়োজন পড়ে না।’‌ 
এদিনই ছিল রামনবমী। সেই উপলক্ষে রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় অস্ত্রমিছিল করে বিজেপি। দলের রাজ্য সভাপতি তথা মেদিনীপুর লোকসভা কেন্দ্রের প্রার্থী দিলীপ ঘোষকে দেখা গেছে প্রকাশ্যেই কাঁধে গদা এবং হাতে তলোয়ার নিয়ে আস্ফালন করতে। 
সেই প্রসঙ্গ টেনে এনেই বিজেপি–কে কড়া রাজনৈতিক আক্রমণ করেন মুখ্যমন্ত্রী। রামনবমীর কথা উল্লেখ করেই তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের কিছু নিয়ম আছে। ‌আমি পার্টি মিটিংয়ে আসছি এই (‌তৃণমূলের)‌‌ ব্যাজ পরে। কিন্তু এটা পরে মন্দির– মসজিদ–গুরুদ্বারে যাই না। পাছে মডেল কোড অফ কনডাক্ট লঙ্ঘিত হয়। আজ কেউ কেউ গদা, তরোয়াল নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছে ভোট চাইতে! রাজনীতির সঙ্গে এর কী সম্পর্ক?‌ গদা দিয়ে কার মাথা ফাটাবেন?‌ তরোয়াল নিয়ে কার গলা কাটবেন?‌ মনে রাখবেন এটা বাংলা। বাংলায় এভাবে ভোট হয় না।’ 
জনসভা থেকে বিজেপি–‌র উদ্দেশে তঁার তীব্র শ্লেষ, ‘‌শুধু ধর্মের পতাকা নাড়ালে হবে না। ধর্মকে বেচে খাবেন না। গেরুয়া হল ত্যাগ–তিতিক্ষার প্রতীক। কিছু সৃষ্টিছাড়া, বঁাধনহারা, ধান্দাবাজ গেরুয়ার নাম করে ভেতরে কালো আর সামনে গেরুয়া লাগিয়ে নিচ্ছে।’‌ 
শিলিগুড়িতে দঁাড়িয়ে সিপিএম–‌‌কংগ্রেসকেও একহাত নিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, ‘‌সিপিএমের নেতাদের জিজ্ঞেস করুন! কী দিইনি শিলিগুড়িকে?‌ আগে কেউ ফিরেও তাকাত না। এখানকার রাস্তাঘাট থেকে রেলের রিক্রুটমেন্ট বোর্ড করে দিয়েছি। নতুন নতুন ট্রেন, বেঙ্গল সাফারি পার্ক, ভোরের আলো, সবটাই আমরা করে দিয়েছি। কোনটা হয়নি?‌ বাগডোগরায় নাইট ল্যান্ডিং, ভারত–‌‌ভুটান–‌‌বাংলাদেশ–‌‌নেপাল রাস্তা, বিমানবন্দর সম্প্রসারণের জন্য জমি—‌ সবটাই করে দিয়েছি।’‌ দার্জিলিং মোড়ের উড়ালপুল নিয়ে কেন্দ্র দেরি করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। 
নাম না করে শিলিগুড়ির মেয়র অশোক ভট্টাচার্যকে কটাক্ষ করেন, ‘‌এখানে মেয়র–‌‌এমএলএ বসে আছেন। শুধু চিঠি লেখা ছাড়া কোনও কাজ করেন না। করলে ট্র্যাফিক সমস্যার অন্তত সমাধান হত।’‌ বাম–‌‌কংগ্রেসকে ভোট না দেওয়ার আর্জি জানিয়ে মমতা বলেন, ‘বামপন্থীদের ভোট দিলেও তারা একটা সিটে জিতবে না।’‌ কেরলের প্রসঙ্গ টেনে এনে তিনি বলেন, ‘‌আপনি কেরলে লড়ছেন লড়ুন। আমার কোনও আপত্তি নেই। আমি কেরলে আপনাদের ভোট ভাগ করতে যাচ্ছি না। এখানে আপনি দয়া করে আমার ভোট ভাগ করতে যাবেন না।’‌ আর কংগ্রেস প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য, ‘‌আপনারা সাইনবোর্ড হয়ে গেছেন। গট আপ ম্যাচ খেলা বন্ধ করুন।’‌ এরপরেই তঁার আর্জি, ‘‌কংগ্রেসকে ভোট দিয়ে ভোট নষ্ট করবেন না।’‌
 জাতীয় ক্ষেত্রে তৃণমূল বিজেপি–বিরোধী লড়াইয়ে স্বার্থত্যাগ করছে জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‌তৃণমূল জাতীয় দল। আমি অনেক রাজ্যে লড়াই করতে পারতাম। কিন্তু আমি তা করিনি। আঞ্চলিক দলের মধ্যে যে যেখানে শক্তিশালী, তারা এগিয়ে আসুক। দিল্লিতে তৃণমূল সবার সঙ্গে মিলেমিশে সরকার বানাবে।’‌ 
উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় সভা করে পাহাড়ে গিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। দার্জিলিং লোকসভা কেন্দ্রে দলীয় প্রার্থীর সমর্থনে  ও কার্শিয়াংয়ে দু’টি সভা করে তিনি এ পর্যায়ের শেষ সভাটি করেন শিলিগুড়িতে। এই সভা থেকেই মুখ্যমন্ত্রী জানিয়ে দেন, সোমবার পয়লা বৈশাখ। পুজো দিতে তাঁকে একদিনের জন্য কালীঘাটে ফিরতে হবে। পয়লা বৈশাখের দিনই তিনি ফের প্রচারে বেরিয়ে পড়বেন মালদা–‌‌মুর্শিদাবাদে প্রচারের জন্য। এদিন সন্ধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী কলকাতায় ফেরেন। সভায় উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস, গৌতম দেব প্রমুখ। দুপুরের প্রখর রোদ উপেক্ষা করেও মুখ্যমন্ত্রীর ভাষণ শুনতে ঠায় দঁাড়িয়ে ছিলেন মাঠভর্তি কর্মী–সমর্থক। এদিনের সভা থেকে যুবসমাজের জন্যও বার্তা দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, ‘উৎকর্ষ বাংলা’ প্রকল্প যে আন্তর্জাতিক সম্মান পেয়েছে, তা তিনি যুবসমাজকে উৎসর্গ করছেন। তাঁর কথায়, ‘আমি পরপর তিনটে প্রজন্ম তৈরি করছি। তারাই একদিন দেশ চালাবে। তারাই নতুন সমাজ গড়বে। তাই আমি এই সম্মান তাদের উৎসর্গ করলাম।’

 

 

 

শিলিগুড়ির বাঘাযতীন পার্কে জনসভায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। শনিবার। ছবি: শৌভিক দাস

জনপ্রিয়

Back To Top