অমিতাভ সিরাজ, সঞ্জয় বিশ্বাস: উন্নয়ন এবং শান্তি।এই দুই শব্দবন্ধেই পাহাড় রাজনীতিতে আরও একবার নতুন মাত্রা সংযোজন করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। কেননা, তাঁর কাছে পাহাড়ের উন্নয়নই শেষ কথা। আট মাস পর আজ দার্জিলিঙে পা রেখে কার্যত ‘‌শান্তি’‌র দূত হয়ে বার্তা দিলেন দিদি। বললেন, ‘‌পাহাড়ের উন্নয়নে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সবরকম সহযোগিতা করবে রাজ্য সরকার। দার্জিলিঙের হাসিমুখ দেখতে চাই আমি।’‌ মমতা যখন এ কথা বলছেন, তখন তাঁর পাশে রয়েছেন জিটিএ–র চেয়ারম্যান বিনয় তামাং, ভাইস চেয়ারম্যান অনীত থাপা এবং জিএনএলএফ সভাপতি, সুবাস ঘিসিং–পুত্র মন ঘিসিং। রয়েছেন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস, ইন্দ্রনীল সেনও। এছাড়াও জিটিএ–র বহু সদস্য, রাজ্য প্রশাসনের আধিকারিকেরা। সোমবারই মুখ্যমন্ত্রী উত্তরবঙ্গ ছাত্র–যুব সম্মেলনে যোগ দিতে এসেছিলেন। সেখানেই তিনি জানিয়ে দেন আজ, মঙ্গলবার পাহাড়ে আসবেন। সুকনা বনবাংলো থেকে দুপুর ১টায় তিনি বেরিয়ে পড়েন রোহিণীর দিকে। সেখানেই ছোট অনুষ্ঠান। কিন্তু রাজনৈতিক তাৎপর্য অনেক বড় ছিল। রোহিণী মোড় থেকে এক রাস্তা চলে গেছে পাঙ্খাওয়াড়ি, মিরিকের দিকে। অন্যদিকে কার্সিয়াং যাওয়ার পথ। কাঁচা, ভাঙাচোরা যে রাস্তার নাম ছিল রোহিণী রোড, তাকেই ঝাঁ–চকচকে করে নতুন নামকরণ দিলেন মুখ্যমন্ত্রী, ‘‌সুবাস ঘিসিং মার্গ’‌। প্রয়াত জিএনএলএফ সভাপতি সুবাস ঘিসিংয়ের নামে এই রাস্তার নাম করায় বেজায় খুশি স্থানীয়রাও। তৃণমূল নেত্রী আসবেন শুনে রাস্তার দু’‌ধারে সকাল থেকেই অপেক্ষা করছিল শুধু সমতলবাসী নয়, পাহাড়ের মানুষেরাও। মমতা পৌঁছতেই তাঁকে অভ্যর্থনা জানান বিনয় তামাং। পরে রাস্তার নামকরণের ফলক উন্মোচন করে মমতা আরও বলেন, ‘‌আমি ভাগ নিতে আসব না। পাহাড়ের উন্নয়নই আমাদের লক্ষ্য। সবাইকে নিয়ে মিলেমিশে কাজ করব। একসঙ্গে থাকতে হবে। পাহাড়ি–গোর্খা–আদিবাসী, সংখ্যালঘু–সংখ্যাগুরু যেই হোক— সবার জন্যই উন্নয়ন।’‌ রাস্তার নতুন নামকরণে জিটিএ প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানান মুখ্যমন্ত্রী। একই সঙ্গে জিএনএলএফ নেতা মন ঘিসিংকেও। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের আগে বিনয় তামাংও পাহাড়ের মানুষ যে শান্তি এবং উন্নয়ন চান, তা স্পষ্ট করে দেন ভাষণে। বিনয় বলেছেন, ‘‌সুবাস ঘিসিং আমার রাজনৈতিক গুরু ছিলেন। তাঁর নামে রাস্তার এই প্রস্তাব অনেক দিন আগেই দেওয়া হয়েছিল। কার্যকর হওয়ায় মুখ্যমন্ত্রীকে ধন্যবাদ।’‌ এরপরেই ‘‌সহমর্মী’‌ জিএনএলএফ সভাপতি মন ঘিসিংয়ের উদ্দেশে বিনয় বলেছেন, ‘‌সবাইকেই একসঙ্গে পাহাড়ের উন্নতিতে এগিয়ে আসতে হবে। শান্তিতে কাজ করতে হবে।’‌ সহমত পোষণ করেন মন ঘিসিংও। তাঁর কথায়, ‘‌মুখ্যমন্ত্রী আমার বাবার নামে রাস্তার নামকরণ করে আমাকে সম্মানিত করেছেন। আমরা খুশি। পাহাড়ের উন্নয়নের কথা সবচেয়ে আগে ভাবতে হবে।’‌
প্রসঙ্গত, জুন মাসে রাজ্য মন্ত্রিসভার বৈঠক বসেছিল দার্জিলিঙে। কিন্তু তারপরেই চূড়ান্ত রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন বিমল গুরুংরা। তাঁদের ওই হিংসাত্মক রাজনীতি পাহাড়ের মানুষ যে মেনে নিচ্ছেন না, তাও এদিন বোঝা গেল। রোহিণী থেকে এরপরেই মুখ্যমন্ত্রী চলে আসেন দার্জিলিঙে। কনকনে ঠান্ডা। ঘন কুয়াশায় ছেয়ে ছিল পাহাড়। তারই মধ্যে এই আসার পথে কার্সিয়াং, টুং, সোনাদা, ঘুম থেকে দার্জিলিঙের ভানু ভবন অডিটোরিয়াম পর্যন্ত দু’‌ধারে কাতারে কাতারে মানুষের ভিড়। মাঝে মাঝেই মুখ্যমন্ত্রীর কনভয় থেমে যায়। মমতাকে ফুল, মালা দিয়ে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায় পাহাড়বাসী। বেজেছে নেপালি বাদ্য। অনেকেরই হাতে ছিল প্ল্যাকার্ড। তাতে লেখা— ‌‘‌থ্যাঙ্ক ইউ’‌। আসার পথে জোড়বাংলায় মুখ্যমন্ত্রী একটি শিশুকে ক্যাডবেরি দেন। দার্জিলিঙে পৌঁছে গোর্খা রঙ্গমঞ্চের কাছে গাড়ি থেকে নেমে পড়েন মুখ্যমন্ত্রী। সেখান থেকে কিছুটা হেঁটে ভানু ভবনের সামনে দাঁড়ান। তাঁকে ঘিরে তখন অজস্র মানুষের ভিড়। জননেত্রী মিশে যান সাধারণের মধ্যে। সেখানেই তাঁকে ‘‌খাদা’‌ (‌উত্তরীয়)‌ পরিয়ে সংবর্ধনা জানানো হয় জিটিএ এবং বিনয় তামাংদের মোর্চার পক্ষ থেকে। এছাড়াও বিমল গুরুংয়ের এক সময়ের ঘনিষ্ঠ ৮ জন মোর্চা নেতা মুখ্যমন্ত্রীকে স্বাগত জানান। এঁদের মধ্যে ছিলেন জ্যোতিকুমার রাই, সতীশ পোখরে, এল এম রামা, অমৃত ইয়াঞ্জন প্রমুখ। পাহাড়ের তৃণমূল নেতা–কর্মীরাও অভ্যর্থনা জানায় তৃণমূল নেত্রীকে। বুধবার ম্যালে হিমালয়ান তরাই ডুয়ার্স ফেস্টিভাল অনুষ্ঠানে পুরস্কার বিতরণ করবেন মুখ্যমন্ত্রী।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top